যশোরের তৈরি মুখোশ। ছবি : সংগৃহীত

১৯৮৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে নানা রকম ভিজুয়্যাল কাজ, বাহারি পোশাক আর বিভিন্ন হাতে তৈরি পণ্য দিয়ে বর্ণিল এক শোভাযাত্রা করে তাক লাগিয়ে দেন যশোরবাসীকে। এরপর তিনি মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন আসছে পহেলা বৈশাখেও আয়োজন করবেন এমন ব্যতিক্রমী শোভাযাত্রার। আর যশোরের সে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন যশোর প্রতিনিধি এইচ আর তুহিন। 

মাহবুব জামাল শামীম বরাবরই সৃজনশীল একজন মানুষ। শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করার লক্ষ্যে যশোরে তিনি ‘চারুপীঠ’ নামে এক ব্যতিক্রমী সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি সবসময় বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে করেছেন ভিন্ন ভিন্ন কাজ। ১৯৮৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে নানা রকম ভিজুয়্যাল কাজ, বাহারি পোশাক আর বিভিন্ন হাতে তৈরি পণ্য দিয়ে বর্ণিল এক শোভাযাত্রা করে তাক লাগিয়ে দেন যশোরবাসীকে। এরপর তিনি মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন আসছে পহেলা বৈশাখেও আয়োজন করবেন এমন ব্যতিক্রমী শোভাযাত্রার।

মুখোশে রং করছেন এক চারুশিল্পী। ছবি : সংগৃহীত

চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মাহবুব জামাল, হিরন্ময় চন্দ, ছোট শামীমসহ কয়েকজন উদ্যোগ নিলেন পহেলা বৈশাখে বর্ণিল শোভাযাত্রা করার। যেই ভাবা সেই কাজ; বাঙালি সংস্কৃতিকে থিম করে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গ্রামীণ সব উপকরণ, বিশালাকার পুতুল আর মুখোশ তৈরির কাজে। আর এভাবেই ১৯৮৫ সালে দেশের মধ্যে যশোরেই প্রথম আয়োজিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার।

এরপর ধীরে ধীরে এ শোভাযাত্রার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে যখন মাহবুব জামাল যখন ঢাকার চারুকলায় ভর্তি হলেন, তখন পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা আয়োজনের কথা বলা হয়। এরপর চারুকলার শিক্ষার্থীরা মিলে তৈরি করলেন মুখোশ, আনলেন দেশীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন পণ্য আর মন ভরা উদ্দীপনা নিয়ে সবাই নেমে পড়লেন নববর্ষকে বরণ করতে। তখন ওই শোভাযাত্রা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি ছিল। পরে ১৯৯৬ সাল থেকে তা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত হতে থাকে।

সফল এ শোভাযাত্রায় সকল বর্ণ-ধর্মের মানুষের প্রচুর সাড়া পাওয়ায় প্রতি বছরই আয়োজিত হয় এ শোভাযাত্রা। এরপর ধীরে ধীরে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার রীতি ছড়িয়ে পড়ে বরিশাল, ময়মনসিংহ এমনকি ভারতেও। এখন দেশের সব জায়গাতেই পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

নিজস্ব সংস্কৃতি আর সত্তা সব জাতিরই থাকে স্মরণ করার মতো কিছু সাংস্কৃতিক ইতিহাস। যা কাল থেকে কালান্তরে প্রচলিত হতে হতে বয়ে চলে নদীর মতো। যেমন পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রা। দীর্ঘকাল ব্যাপী না হলেও, তিন দশকে এই আয়োজন একটি সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে এ উৎসবটি এখন জড়িয়ে গেছে বাঙালির জীবনে, যাপনে।

মাহবুব জামাল শামীম বলেন, তিনি, হিরন্ময় চন্দ ও গোলাম দস্তগীরসহ কয়েকজন চারুকলার বিকাশ, মানবজীবনের উন্নয়ন ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠায়, শিল্পচর্চার মাধ্যমে শিল্পের নতুন পথের সন্ধান করছিলেন তারা। তারা বেছে নিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্ম শিশুদের।

এ উদ্দেশ্যে যশোরে গড়ে তুললেন চারুশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ‘চারুপীঠ’। কিন্তু অর্জিত শিল্প ভাবনার সামাজিকায়নের কী হবে? ভাবলেন, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সবারই আলাদা উৎসব আছে। এমন একটি উৎসব চাই যেটা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিজের উৎসব বলে মনে করবে।

জয়নুলের ফোক ভাবনা আর সুলতানের গণমানুষের চেতনা মাথায় রেখে ১৯৮৫ সালে বাংলা নতুন বছর বরণের আয়োজন করে চারুপীঠ। চৈত্রের শেষ রাতে একুশের মতো আলপনা আঁকা হলো যশোর শহরের রাস্তাজুড়ে। ফুল, পরী, পাখি ও বাঘের মুখোশ তৈরি হলো। পহেলা বৈশাখে মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে এলো। সানাইয়ের সুরে, ঢাকের বোলে নেচে-গেয়ে সেই শোভাযাত্রা প্রদক্ষিণ করে যশোর শহর। সব শ্রেণির মানুষ এসে যোগ দিলেন সেই শোভাযাত্রায়। জন্ম নিল এক উৎসবের। নাম দেয়া হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। কয়েক বছর পর এই আয়োজন শুরু হলো ঢাকাতেও।

তিনি আরও জানান, চারুকণ্ঠ শিল্পীরা এলেন ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে এমএফএ করতে। সঙ্গে শহীদুল ইসলাম, সুভাশীষ মজুমদার, মাহবুবুর রহমান, ফিরোজ রায়হান, শামীম ইকবাল রিপন ও মনিরুজ্জামান শিপু মিলে চারুকলাকে আনন্দমুখর, কর্মমুখর করার পরিকল্পনা করলেন।

১৯৮৮ সালে জয়নুল উৎসবে মাহবুব জামাল শামীম ও তার দলবল সমমনা সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ঢাক বাজিয়ে ঘোড়া নিয়ে নেচে-গেয়ে সবাইকে অবাক করে দেবেন। হলোও তাই। ঢাকের বোলে, দশটি কাগজের তৈরি ঘোড়ার নৃত্যে সবাই এক হয়ে গেল। তৎকালীন ছাত্ররা মিলে যোগ দিলেন তাতে। সাবেক ছাত্ররাও অনেকে এগিয়ে এলেন। সিদ্ধান্ত হলো চারুকলার শিল্পীরা তাদের তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে থাকবে বৈশাখী আয়োজনের অগ্রভাগে। সবার অংশগ্রহণে এটি হবে একটি জাতীয় উৎসব।

এ সময় চারুশিল্পী সংসদ এগিয়ে এসে অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তুলে নেয় কাঁধে। সেই সময়ের চারুশিল্পী সংসদের অন্যতম শিল্পী রফিকুন নবী।
এদিকে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিভাগ ইউনেস্কো বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বাঙালির মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে উৎপত্তিস্থল যশোরে আরও উৎসবমূখর হয়ে উঠেছে।

যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এর সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইংরেজি ১৯৮৫ সালে এটির শুরু যশোরে। অনন্য সংগঠন চারুপীঠ যশোরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম, হিরন্ময় চন্দ্র, গোলাম দস্তগির মিঠু, শাহিন ও সোহেল প্রাণন প্রমুখ।

যশোরের তৈরি মুখোশ। ছবি : সংগৃহীত

প্রথম বছরে খুব একটা মানুষ এতে অংশ না নিলেও মঙ্গল শোভাযাত্রাটি মানুষের হৃদয়ে যে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়, তারই ধারাবাহিকতায় পরের বছর থেকে যশোরবাসী সম্মিলিতভাবে এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। আস্তে আস্তে এটা ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি অভিযোগ করেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ইতিহাস বিকৃতির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক হিসেবে ঢাকা চারুকলাকে সামনে আনার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে না পারলে এই বিকৃতি রোধ করা যাবে না।

চারুপীঠ যশোর এর অধ্যক্ষ এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার জনক মাহবুব জামাল শামীম আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে শিল্পবিবর্জিত, গুণহীন, জড়তা, বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে প্রাণখোলা-গুণী-রসিক-শিল্পীত জাতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৫ সালে যশোর শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা রূপায়ন ও প্রচলন করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে। এটি শিল্পের একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়; যাতে আবহমান বাংলার নৃত্য, বাদ্যসহ দৃশ্যমান শিল্পের আঙ্গিক আর লোক ঐতিহ্যের মোটিভ খোঁজা শুরু হয়, শুরু হয় শেকড়ের সন্ধানে যাত্রা।

চারুপীঠ অধ্যক্ষ আরো বলেন, বাংলা ১৩৯৩ থেকে ১৪০০ শতাব্দী বরণ উৎসব পর্যন্ত সাত বছর চারুপীঠের নেতৃত্বে যশোরের সমস্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরলস সাধনায় সার্থক সামাজিক উৎসবরূপে মঙ্গল শোভাযাত্রা অবিশ্বাস্য সফলতায় পৌঁছে।

১৪০০ সালে মুকুট, মুখোশ, পাপেট, মাপেটসহ লোক ঐতিহ্যের নানা ঢঙের হাজার হাজার আইটেম পারফর্ম করে। এতে অংশ নেয় পার্শ্ববর্তী জেলা, উপজেলা, গ্রামগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ। সকলের অপরূপ প্রদর্শনে ঝলমলে হয়ে ওঠে চিরায়ত বাংলার রূপ। এত বিশাল আয়োজন, এত বিচিত্র রঙের সমাহারসমৃদ্ধ শোভাযাত্রাটি হয়ে ওঠে মাঙ্গলিক দিকনির্দেশক।

শোভাযাত্রার আকৃতি ছিলো লম্বায় প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ; যার তুলনা করা যায় শুধু ব্রাজিলের কার্নিভেলের সঙ্গে। জাতি-ধর্ম-গোত্র-বর্ণনির্বিশেষে বাংলার আবালবৃদ্ধবণিতার জন্য এটি হয়ে ওঠে একটি রাজসিক উৎসব। যার মাধ্যমে বাঙালি নগর আর গ্রামের কৃষ্টিকে মেলানোর মাধ্যম হিসেবে নিতে চায়, ঘটাতে চায় সকল শিল্প মাধ্যমকে।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব/