শিল্পীর কল্পনায় মঈনুদ্দিন চিশতী ও বাঁয়ে ইমরান ফিরদাউস। ছবি : সংগৃহীত

২২ জুন থেকে রাজধানীর বেগম রেস্তোঁরা ও গ্যালারিতে ‘লাইট ফ্রম দ্য কসমস’ নামে চলছে আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্প-সংস্কৃতি গবেষক ইমরান ফিরদাউসের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

প্রখ্যাত সুফী সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী হাসান (রহ.)’ কে উৎসর্গ করা হয়েছে এই প্রদর্শনী।

প্রদর্শনী চলবে ২২ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত যে কেউ চাইলে ঘুরে আসতে পারেন এই প্রদর্শনী থেকে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংগীতশিল্পী শেখ মনিরুল আলম টিপু। প্রদর্শনীটি কিউরেট করছেন শিল্পী রনি আহম্মেদ।

২০০৩ সালের ১৪ মার্চ সাধক-কবি আবদুল খালেক দেওয়ান মারা যান। তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর দেওয়ান বাড়িতে আশেক-ভক্ত-পাগল-অনুরাগীবৃন্দের সমাগম ঘটে। ২০১৬ সালে খালেক দেওয়ানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ওরসের খণ্ডিত চিত্র স্থান পাচ্ছে এই আয়োজনে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংগীতশিল্পী শেখ মনিরুল আলম টিপু। ছবি : সংগৃহীত

কেন এ ধরনের প্রদর্শনী? এ সম্পর্কে ইমরান ফিরদাউস ব্যাখ্যা দেন এভাবে,

“এমন সুন্দর দেহ মসজিদ ঘর
খালি ফেলে তুমি কভু রেখো না
এ দেহ পিঞ্জরে খোদারে বসিয়ে
তুমি কাতরে করো প্রার্থনা” সাধক বাউল আবদুল খালেক দেওয়ান

সাধক বাউল আবদুল খালেক দেওয়ান বাঙলা ভাবজগতের অন্যতম বুজুর্গ ব্যক্তি। ঢাকার কেরানিগঞ্জের বামুনসুর গ্রামে ১৯১০ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাধক আলফু দেওয়ানের মাধ্যমে বাঙলার ভাবগানের ধারায় দেওয়ান ঘরানার সূত্রপাত হয়। সূফী সাধক হজরত আলেফ চান শাহ ওরফে আলফু দেওয়ান (১২৪৬-১৩৩৬) মরমীবাদের চর্চাকারী ছিলেন। তিনি লাহোরের হযরত লস্কর শাহ দরবেশ এর মুরিদ ছিলেন। পীর কেবলার মরমীবাদের সবক আলফু দেওয়ান বুকের নিভৃতিতে লালন করেছেন সযতনে। স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে দীর্ঘতর কঠিন সময় সাধনায় নিমগ্ন থেকেছেন আসামের দুর্গম পাহাড়ের গুহায়। মরমী গানের রচনা ও পরিবেশনায় কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। এই সিলসিলায় সাধক খালেক দেওয়ান পিতা আলফু দেওয়ান ও বড় ভাই মালেক দেওয়ানের কাছে পালাগানের তালিম নেন। আলফু দেওয়ান চারণ কবিদের মতো মঞ্চে দাঁড়িয়েই গান রচনা করতে পারতেন। পিতার পথ অনুসরণ করে মঞ্চে দাঁড়িয়েই গান রচনা ও নতুন সুর সংযোজন করে সাথে সাথে গেয়ে যেতে থাকেন খালেক দেওয়ান। তবে, খালেক দেওয়ানের গানের সুরে ভিন্ন মেজাজ আছে। তাঁর গানগুলোর মধ্যে দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির যে প্রেমের সম্পর্ক তা তুলে ধরেছেন।যেমন, “পিরিতির নাই ঘর বাড়ি রে/ পিরিতির জ্বালা বুকে নিয়ে, আমি দেশ বিদেশে ঘুরি…”। খালেক দেওয়ানের লেখা ইসলামি গানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব রয়েছে। যেমন ধরা যাক এই পঙক্তিটি,‘মক্কা-মদিনা যেথা হইতে হাজির, তোমারই নামে আমি রাহি মুসাফির’- সরল বাক্যে মারফতি এমন নিগূঢ় তত্ত্ব কথার নমুনা বাঙলা ভাবজগতে বিরল। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে তিনি একজন শব্দ সৈনিক হিসেবে গান লিখে এবং পরিবেশন করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

রাজধানীর বেগম রেস্তোঁরা ও গ্যালারিতে চলছে এই প্রদর্শনী। ছবি : সংগৃহীত

সাধক খালেক দেওয়ানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর দেওয়ান বাড়িতে আশেক-ভক্ত-পাগল-অনুরাগীবৃন্দের সমাগম ঘটে। ঢাকার কেরানিগঞ্জের বামুনসুর গ্রামে দেওয়ান বাড়ির মাজার অবস্থিত। দরবেশের ওরশকে কেন্দ্র করে সারা রাত জুড়ে চলে বাউল গানের আসর; যার সমাপ্তি ঘটে ফজরের ওয়াকতের পর সঙ্গীত-বাদ্যের মাতম দিয়ে। পালাগানের সম্রাট সাধক খালেক দেওয়ান আজ আর নেই। ২০০৩ সালের ১৪ মার্চ এসাধক কবি নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি জমান। ২০১৬ সনে সাধক খালেক দেওয়ানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ওরশের খণ্ডিত চিত্র স্থান পেয়েছে এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীর আলোকচিত্রে জমে থাকা খণ্ডিত মুহূর্তগুলো বলে যায় মরমী ইসলাম আর ইসলামের মারেফতির প্রতি মানুষের আগ্রহ, উদ্দীপনা আর সংযুক্তার কথা। মোবাইল ক্যামেরায় তোলা এই আলোকচিত্রমালা মূলত নজর করেছে প্রচলিত ইসলামের সমান্তরালে জারি থাকা অন্যতর মারেফতি ইসলামের আচার-রীতি-প্রথার লালন ও পালনের প্রতি।’

আলোকচিত্রী ইমরান ফিরদাউস বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে ফরাসি চলচ্চিত্র-নির্মাতা গাসপার নোয়ের ওপর পিএইচডি করছেন।

আজকের পত্রিকা/সিফাত