ট্র্যাভেলস এজেন্সিতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান।

ইতালি যাওয়ার পথে সাগরে ট্রলার ডুবিতে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ১৬ তরুণের প্রাণহানির ঘটনার পর সিলেটের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ সময় ট্রাভেলস এজেন্ট ব্যবসার আড়ালে মানবপাচারের দায়ে সিলেটের ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। ১৩ মে সোমবার দিনভর জেলা প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলেটের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিতে এ অভিযান চালায়।

এ সময় বৈধ কাগজপত্র না থাকা, বিদেশে পাঠানোর নামে অবৈধপথে মানবপাচারসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ২৪টি ট্রাভেল এজেন্সিকে পৌনে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়।

গত বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সিলেটের ছয় যুবক নিহতের পর মানবপাচারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ট্রাভেলস এজেন্সির নামে অবৈধভাবে বিদেশ লোক পাঠানোর ব্যবসা নিয়ে আলোচনা হয়।

এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে সিলেট জেলা প্রশাসন। ১৩ মে সোমবার ৫ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচটি টিম গঠন করে অবৈধ ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হয়।

অভিযানে ২৪টি ট্রাভেলস এজেন্সিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয় ও মোট চার লাখ ৭৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড শপিং সিটি থেকে তিন জন মানবপাচারকারী আটক করা হয়। তাদেরকে একমাসের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল চৌধুরী।

ট্র্যাভেলস এজেন্সিতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান।

এদিকে, আম্বরখানা এলাকায় অভিযান চালান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইরতিজা হাসান। অভিযানে আবু সাইদ এন্টাপ্রাইজকে ৩০ হাজার টাকা, ট্রাভেল টাইমকে ২৫ হাজার টাকা, জিলানী এয়ার ইন্টারন্যাশনালকে ৫ হাজার টাকা, মিরাজ এয়ার ইন্টারন্যাশনালকে ২০ হাজার টাকা, জে স্কয়ার কনসালটেন্সিকে ২০ হাজার টাকা, রেঞ্জার ইন্টারন্যাশলকে ২০ হাজার টাকা ও নিউ জান্নাত ট্রাভেলসকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

একই সঙ্গে ট্রাভেলস কর্মচারী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ১৫ দিনের ও নাজমুল ইসলাম খানকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের নেতৃত্বে উপশহর এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

এ অভিযানে রোজভিউ কমপ্লেক্সের আবিদ ওভারসিজকে ২০ হাজার টাকা, আসসালাম হজ্জ এবং ওমরাকে (প্যারাডাইস) ১৫ হাজার টাকা, আলকেফাকে ২০ হাজার টাকা, খাজা এয়ার ইন্টান্যাশনাল সর্ভিসকে ২০ হাজার টাকা ও হোয়াইট ট্রাভেলসকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার উপকূলবর্তী ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে নিহত ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এদের মধ্যে ১৯ জনই সিলেট বিভাগের। এরআগে সিলেটর ৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গিয়েছিলো।

নিহতরা হলেন- সিলেটের জিল্লুর রহমান, সিলেট বিয়ানীবাজারের রফিক ও রিপন, সিলেট গোলাপগঞ্জের মারুফ, ফেঞ্চুগঞ্জের লিমন আহমেদ, আব্দুল আজিজ, আয়াত ও আহমেদ, সিলেট দক্ষিণ সুরমার জিল্লুর, সিলেটের আমাজল, সিলেটের কাসিম আহমেদ, সিলেট বিশ্বনাথের খোকন, বেলাল, রুবেল, সিলেটের মনির, সুনামগঞ্জের মাহবুব, নাদিম, মৌলভীবাজারের ফাহা, মৌলভীবাজার কুলাউড়ার শামিম, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার জয়াগ গ্রামের নাসির, ঢাকার টঙ্গীর কামরান, মাদারীপুর জেলার সজিব, শরীয়তপুরের পারভেজ, কামরুন আহমেদ মারুফ, কিশোরগঞ্জ জেলার আল-আমিন, জালাল উদ্দিন প্রমুখ।

নৌকাডুবি থেকে বেঁচে যাওয়া শিশির বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে ফোনে জানান, বেঁচে যাওয়া ৬ জনের বাড়ি শরিয়তপুর জেলার নরিয়া থানার চারুগা গ্রামে। তারা হলেন, রাজিব, উত্তম, পারভেজ, রনি, সুমন ও জুম্মান।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন বিভাগের দায়িত্বরত পরিচালক ইমাম জাফর শিকার বলেন, তিউনিসিয়া রেড ক্রিসেন্টে প্রাদেশিক প্রধান ডা. মাঙ্গি সিলাম এর মাধ্যমে জীবিত ৪ বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য মতে ২৭ জন বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এছাড়াও ৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ৫ জনের মৃতদেহ সোমবার সকাল পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি নেভি ক্যাম্পে রয়েছে। তিনি বলেন, বেঁচে যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি, একজন মিসরীয় ও একজন মরক্কোর নাগরিক রয়েছে।

এদিকে নৌকাডুবিতে নিহত ও জীবিত বাংলাদেশিদের তথ্য আদান প্রদানের জন্য চালু করা হয়েছে দু’টি হটলাইন নম্বর : ৮৮-০২-৪৯৩৫৪২৪৬ ও ০১৮১১৪৫৮৫২১। ৪৯৩৫৪২৪৬ এই নম্বরটি অফিস চলাকালীন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এবং ০১৮১১৪৫৮৫২১ নম্বরটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জাতীয় সদর দফতর, ৬৮৪-৬৮৬, বড় মগবাজার অথবা ৬৪টি জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটে আহত ও নিহতের স্বজনরা সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ ও রেড ক্রিসেন্টের সেবা নিতে পারবেন।

ট্র্যাভেলস এজেন্সিতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান।

এ ব্যাপারে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন খান বলেন, শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ট্রাভেল এজেন্সি। এসব ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। চোরাই পথে মানুষকে পাঠিয়ে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। তাই অভিযান জোরদার করা হয়েছে। যতদিন এসব অপকর্ম বন্ধ না হবে, ততদিন অভিযান চলতে থাকবে।

তিনি বলেন, নগরের উপশহর, বন্দরবাজর, আম্বরখানা, জল্লারপাড়, জিন্দাবাজার এলাকায় পাঁচটি টিম অভিযান চালিয়েছে। প্রতিটি টিমে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাদের সহযোগিতা করেছেন আটাব নেতারা।

প্রসঙ্গত, ৯ মে দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে ইতালি প্রবেশ করতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে প্রাণ হারান সিলেটের ১৬ জন যুবক। এর মধ্যে সাতজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাদেরকে ইতালি পাঠানোর জন্য ৮ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন রাজা ম্যানশনের ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামক এজেন্সির মালিক এনামুল হক। এ ঘটনার পরই অবৈধ ট্রাভেলসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস