হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কলেজছাত্রী।

‘প্রেমেরই কারণে বন্দি হয়েছি/মরণেও ভয় নাই/এই প্রেম মরে না কোনো দিন/মানুষ বাঁচে না চিরদিন’ এই গানই যেন বাস্তব পরিণতি পেয়েছে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের এক কলেজ ছাত্রীর জীবনে। তার মায়ের সন্দেহ ছিল শত্রুর পরিবারের ছেলের সঙ্গে তার মেয়ে প্রেম করছে।

আর তাই মেয়ের মন থেকে ভালোবাসা ছাড়াতে স্বপ্নে দেখা এক ব্যক্তির পরামর্শে কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে আড়াই বছর ঘরে আটকে রাখলেন এক মা। বন্দিদশায় তার হাত-পায়ের আঙুলগুলো গেছে কুঁকড়ে। জীর্ণশীর্ণ শরীর, রক্তশূন্যতা, চর্মরোগসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত মেয়েটি মরতে বসেছিল। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ২নং বিনোদনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।

চিকিৎসা খরচ ও সুস্থ হবার পর মেয়েটির পড়ালেখার খরচ চালাবেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান। এমন অমানবিক আচারনের জন্য মায়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

দিনাজপুর জেলার দক্ষিনে অবস্থিত নবাবগঞ্জ উপজেলা বিনোদনগর ইউনিয়নে নয়াপাড়া গ্রামের রোস্তম আলীর মেয়ে কলেজ পড়–য়া মেধাবী ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার সুমি। পরিবারের পাচঁ সন্তানের মধ্যে আদরের দ্বিতীয় সন্তান সুমি আক্তার। সে নাববগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলো।

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা চলা অবস্থায় সেলাই প্রশিক্ষক রাকিউল ইসলামের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে সুমি। সর্ম্পকটি মেনে নিতে চায়নি মেয়েটির পরিবার। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন ছিলো মেয়েটির। প্রেমের কারনে সেই স্বপ্নের সামনে বাধাঁ হয়ে দাড়ায় মেয়েটির পরিাবরের সদস্যরা। আর এ কারনে সুমির জীবনে দীর্ঘ তিন বছর কেটে যায় আলো-বাতাসহীন স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে।

৬ ফেব্রুয়ারি বুধবার সন্ধ্যায় খবর পান দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। পরে তার হস্তক্ষেপে মেয়েটিকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ছাত্রীটির মা বলছেন, কবিরাজ ও স্বপ্নে দেখা এক ব্যক্তির পরামর্শে মেয়েকে ওইভাবে ঘরে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন।

বন্দিদশা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই তরুণী বলেন, ‘রংপুরের একটি স্কুলে মানবিক বিভাগ থেকে তিনি ২০১১ সালে এসএসসি ও নবাবগঞ্জের একটি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে তার।’

ইউএনও মো. মশিউর রহমান বলেন, দুই বছরের বেশি সময় আটকে রাখার খবর পেয়ে ওই ছাত্রীর মাদ্রাসা শিক্ষক বাবাকে ডেকে পাঠান। ছাত্রীর বাবা ইউএনওকে জানান, ছাত্রীর মা একক কর্তৃত্বে ছাত্রীটিকে আটক রেখেছেন। এরপর ইউএনও পুলিশ পাঠিয়ে ছাত্রীটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

মশিউর রহমান বলেন, এই সভ্য সমাজে কোনো পরিবার তার সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানকে এভাবে বন্দি করে রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে নিয়ে যেতে পারে, তা ভেবে অবাকই হচ্ছেন। ছাত্রীটির যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয় তিনি বহন করবেন। ছাত্রীটিকে সুস্থ করে আবারও লেখাপড়া শুরু করাবেন।

মেয়েটিকে উদ্ধারে যাওয়া নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতিকুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারে গেলে প্রতিবেশীরা জানায়, দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে ওই ছাত্রীটিকে আটকে রাখা হয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিবেশী জানান, ওই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ আছে এমন পরিবারের এক ছেলের সঙ্গে ওই মেয়ের প্রেমের সম্পর্কের সন্দেহে তাকে শাস্তি দিতে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দা জানায়, বাবা-মা ও দুই ভাই তিন বোন নিয়ে তাদের পরিবার। ওই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ আছে, এমন এক পরিবারের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সন্দেহে প্রায় আড়াই বছর থেকে ওই ছাত্রীকে তার পরিবার আটক রেখেছিল। বাড়িতে বিদ্যুত থাকলেও যে ঘরে মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়, সেই ঘরে কোনো বিদ্যুত সংযোগ ছিল না। এমন কি ঘরের দরজা-জানালা সব সময় তালা মেরে রাখা হয়েছে।

ছাত্রীটির মুখ, পা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হাতের আঙুলগুলো কুঁকড়ে গেছে। কিছুতেই বসে বা দাঁড়াতে পারছে না। কথা বলতে গেলে শরীর কাঁপুনি দিচ্ছে। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে তার শরীর থেকে।

এদিকে হাসপাতালে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় চিকিৎসক খাইরুল ইসলাম তপনের। তিনি জানান, বন্দিজীবন থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়েটির (২২) শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়ার সময়ে যে অবস্থা ছিল তা বর্ণনা করার মতো নয়। এখন তাকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কারণে তার শারীরিক কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মেয়েটি এখন উঠে দাঁড়াতে পারছে একটু একটু করে কথাও বলতে পারছে। হাতে এবং পায়ে পুরোপুরি এখনো শক্তি ফিরে পায়নি। তবে তিনি এখন শঙ্কামুক্ত।

তিনি বলেন, মেয়েটির যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছেন।
হাসপাতালের ডা. আল আমিন কাজি জানান, মেয়েটিকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। শারীরিক সুস্থতার জন্য ভিটামিন খাওয়ানো হচ্ছে। তবে তার অবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন অপচিকিৎসায় ও বদ্ধ ঘরে থাকায় ছাত্রীটির রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সূর্যের আলোয় না আসায় এবং হাঁটাচলা না করায় দেখা দিয়েছে হাড় ক্ষয়রোগ। পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে চর্মরোগ, আর মুখে ফাংগাস। ছাত্রীটি শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এভাবে কিছুদিন থাকলে যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারত ছাত্রীটির। এখন তাকে সুস্থ করতে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক সেবিকা বলেন, ওই তরুণী তাকে জানিয়েছেন, গত ছয় মাস থেকে তাকে গোসল করতে দেওয়া হয়নি।

নবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা ছাত্রীটির খালাতো বোন বলেন, ‘গত এক বছর ধরে চেষ্টা করেও তিনি তার খালাতো বোনের (ছাত্রীটির) সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।’

নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের ওসি সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘মেয়েটি একটি ছেলেকে ভালোবাসতো। ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে না দেয়ায় মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ কারণে পরিবারের লোকজন তাকে বাইরে যেতে দিত না, মেয়েটিও বাড়ি থেকে বের হতো না। এক পর্যায়ে তাকে ঘরবন্দি করে পরিবার। এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগও করেনি আমাদের কাছে। এরপরও মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে ’

আজকের পত্রিকা/মাহবুবুর রহমান/আব্দুল আজিজ/দিনাজপুর