চা বাগান

ভারতীয় চোরাই চায়ের আগ্রাসন ও চায়ের বাম্পার ফলনের পরেও চরম সংকটে পড়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার লস্করপুর ভ্যালীর ১৭টি চা বাগান।

চায়ের বাজারে নিলাম মুল্য মারাত্বক ভাবে কমে যাওয়ার কারণে ইতোমধ্যে ভ্যালীর এসব বাগান কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।

এছাড়া মওসুমের শেষের দিকে এসেও মুল্য কমে যাওয়ার কারণে প্রতিটি চা বাগানে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ কেজি পর্যন্ত চা আটকা পড়েছে। ফলে বাগানগুলো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেনা। এ অবস্থায় চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে এ অঞ্চলের চা শিল্প।

হবিগঞ্জের দক্ষিনাঞ্চলের চুনারুঘাট ও মাধবপুর সীমান্ত দিয়ে গত প্রায় এক বছর ধরে দেশে বিপুল পরিমান ভারতীয় নিম্নমানের মনের চা প্রবেশ করে। এসব চা পাতা জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের বাজারে যাচ্ছে।

অপরদিকে চলতি মওসুমে নভেম্বর পর্যন্ত ভ্যালীর ১৭টি চা বাগানে ১ কোটি ২০ লাখ কেজির বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে। যা গত কয়েক বছরের মধ্যে বেশি। একদিকে ভারতীয় চোরাই নিম্নমানের চায়ের অবাধ প্রবেশ এবং অন্যদিকে চায়ের রেকর্ড পরিমান উৎপাদনের কারণে চায়ের মুল্য একেবারে পড়ে গেছে।

২০১৮ সালে ভ্যালীর চায়ের নিলামে গড়মুল্য ছিল ২শ ৬০ টাকা। চলতি বছর নিলাম বাজারে এ মুল্য দাড়িযেছে ১শ ২০ থেকে ৫০ টাকায়। ফলে চলতি বছর প্রতি কেজি চায়ে বাগান কর্তৃপক্ষ মুল্য কম পাচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা। মওসুমের নভেম্বর মাসের শেষে এসে বাগানগুলোতে বিপুল পরিমান চা তৈরী চা আটকা পড়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বায়াররা নিলামে চা পাতাই কিনছেন না।

অনেকে ক্রেতা গত ৬ মাস পুর্বে যে চা পাতা কিনেছিলেন এখনও তাদের গুদামে এসব চা পাতা পড়ে আছে। এহেন অব্স্থায় চায়ের ক্রেতারা চা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ তারা চা বিক্রি করতে পারছেন না। এ অবস্থায় বায়ার হাউজগুলো আর চা পাতা না পাঠাতে বাগানগুলোকে জানিয়ে দিয়েছে।

ভ্যালীর বিভিন্ন চা বাগান সুত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে ১৭টি চা বাগানে কমপক্ষে এখন পর্যন্ত অর্ধ কোটি কেজি তৈরি চা পাতা আটকা পড়েছে। কোন কোন বাগানে এসব তৈরি পাতা রাখারও জায়গা হচ্ছে না। অনেক বাগানে যত্রতত্র এসব পাতা রাখার কারণে তৈরি চা নষ্ট হয়ে ক্ষতির মধ্যে আছে বাগান।

চা বাগান ব্যবস্থাপকদের মতে, প্রতিকেজি চা পাতায় গড়ে ১০০ টাকা কম পাচ্ছেন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ১০০ টাকা কমে প্রতিকেজি চা পাতা বিক্রি করতে হচ্ছে।

এতে প্রতিটি চা বাগানের বিপুল পরিমান ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে উপজেলারর চন্ডিছড়া চা বাগানে এখনও প্রায় ৫ লাখ কেজি চা পাতা অবিক্রিত রয়েছে। তারা এখন তৈরি চা পাতা রাখারও জায়গা পাচ্ছেন না।

ন্যাশনাল টি কোম্পানীর এ চা বাগানে প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। একই ভাবে ভ্যালীর দেউন্দি টি কোম্পানীর চা বাগানের চা পাতাও গড়ে ৮০ টাকা কমে গেছে। এ বাগানে প্রায় ১ লাখ কেজি চা পাতা আটকা রয়েছে। এতে তাদের ক্ষতির পরিমান হতে পারে এক কোটি থেকে। একই ভাবে ভ্যালীর সবচেয়ে বড় উৎপাদনের বাগান ডানকান ব্রাদার্সের নালুয়া ও আমু চা বাগানে চলতি বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১২ লাখ কেজির উপরে। কিন্তু চলতি নভেম্বর পর্যন্ত এসব বাগানে ৪০ ভাগ পাতা অবিক্রিত রয়ে গেছে।

জানা গেছে নালুয়া ও আমু চা বাগােেনেই প্রায় ১০ লাখ কেজি চা পাতা এখনও বিক্রি হয়নি। এদুটি বাগানের চায়ের গড় মুল্যও গত বছরের চেয়ে কমপক্ষে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কমে গেছে। এ হিসেবে এদুটি বাগান ৭ থেকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।

এভাবে ভ্যালীর ১৭টি চা বাগানে কমপক্ষে ৫০কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।

চলতি মওসুমে এসব চা বাগানে উৎপাদন রেকর্ড পরিমান হলেও বাগানগুলো ক্ষতির মধ্যে পড়ার প্রধান কারণ ভারতীয় চা পাতার আগ্রাসন।

তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারী থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চুনারুঘাট ও মাধবপুর সীমান্ত দিয়ে প্রায় এক কোটি কেজি চা পাতা দেশে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি এ নিয়ে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়াসহ গনমাধ্যমে ভারতীয় চায়ের অবাধ প্রবেশের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও কাজ হয়নি।

স্থানীয় বিজিবি কিংবা পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও তারা মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে যে পরিমান ভারতীয় চা পাতা আটক করেছে তা পাচার হয়ে আসার তুলনায় খুবই নগন্য।

চুনারুঘাট উপজেলার ৫টি পয়েন্ট দিয়ে এবং মাধবপুর উপজেলার ৪টি পয়েন্ট দিয়ে এসব চা পাতা দেশে প্রবেশ করছে। সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে এসব চা পাতা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সের ছেলেরাসহ ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের যুবকরা। চোরাচালানের ক্ষেত্রে তারা কেউই পিছিয়ে নেই। আর এসব পাচারকারীদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক বৃহৎ শক্তি। তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে বিশাল সিন্ডিকেট। যারা পুরো চোরাচালান নিয়ন্ত্রন করছে।

অভিযোগ উঠেছে সীমান্তরক্ষী থেকে শুরু করে যাদের এসব প্রতিরোধ করার কথা তারাই সিন্ডিকেট করে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। চা পাতা চোরাচালান এখন উপজেলায় হয়ে উঠছে জনপ্রিয় ব্যবসা।

এ অবস্থায় ভারতীয় নিম্ম মানের চা পাতার কবলে পড়ে দেশীয় চা শিল্প পড়েছে হুমকীর মুখে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে কোন কোন চা বাগান। সরকারর গোয়েন্দা বিভাগ ইতোমধ্যে এবিষয়ে সরকারের উচ্চ মহলে বিস্তারিত জানিয়েছে।

এ বিষয়ে লস্করপুর ভ্যালীর চেয়ারম্যান ও চন্ডিছড়া চা বাগান ব্যবস্থাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, ভারতীয় চোরাই চা পাতা দেশে প্রবেশ করার কারণে চা শিল্প ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। চা বিক্রি না হওয়ায় চা বাগানগুলো ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে পারছে না। চলতি মওসুমে ভ্যালীর প্রতিটি বাগানেই ৩ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত প্রত্যেক বাগানেই উৎপাদনের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ তৈরি চা আটক রয়েছে। ইতোমধ্যে বায়ার হাউজ থেকে চা না পাঠাতে জানানো হয়েছে, কারণ চা বিক্রি হচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি চায়ে এবার ৮০ থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে ১শ ৩০টা পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে এ ভ্যালীর চা শিল্প চরম সংকটে পড়েছে।

দেউন্দি চা বাগানের ডেপুটি ব্যবস্থাপক ফরহাদ হোসেন বলেন, যে ভাবে দেশে ভারতীয় চোরাই চা পাতা প্রবেশ করেছে, তাতে চা শিল্প হুমকির মধ্যে পড়েছে।