আসন্ন ঈদ উল আজাহার আনন্দ নেই তিস্তাপাড়ের ছিন্নমুল পরিবারের মানুষদের।

ঈদ আনন্দের পরিবর্তে নদী ভাঙন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

বিগত দিনে সঞ্চিত অর্থে কোরবানী দিলেও এ বছর করোনায় কর্মহীন মানুষগুলো অর্থসংকটে পড়ে কোরবানির পশু ক্রয় করতে পারছেন না।

এরই মাঝে বন্যা আর নদী ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। তাই ঈদের প্রস্তুতি নেই নদী পাড়ের বন্যা কবলিত মানুষদের মধ্যে। রয়েছে ভাঙন আতংক।

নদীর পাড়ের গ্রামগুলোতে হাতে গুনা কয়েকজন কোরবানির জন্য পশু ক্রয় করলেও অধিকাংশ পরিবারের ঈদ হবে করোবানিহীন। ঈদের দিনে ডাল ভাতও জোটবে না অনেকের ভাগ্যে।

চলমান করোনা ভাইরাসের কারনে কর্মহীন হয়ে পড়ে এসব শ্রমজীবি মানুষ। সেই সাথে যোগ হয়েছে বন্যা। এরই মাঝে জুন মাসের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত থেমে থেমে কয়েক দফায় বন্যায় প্লাবিত হয় লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার মানুষ।

চলতি মাসে ৫ বার ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে জেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

গত সপ্তাহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও দুর্ভোগ কমেনি তিস্তার বামতীরের মানুষের। তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেলেও নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছেন।

করোনার মাঝে টানা বন্যায় খাদ্যসংকটে পড়েন তিস্তাপাড়ের মানুষ। তাই ঈদের আমেজ চোখেই পড়ে না তাদের মাঝে।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) তিস্তা নদীর বামতীর লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কুটিরপাড় গ্রামের মৃত সহির উদ্দিনের স্ত্রী কাচুয়ানী বেওয়ার(৮০) নিকট ঈদ প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক মাস থাকি বানের পানিত ডুবি আছি। কায়ো খবর নেয় নাই। নদীর সাথে বাড়ি কোনবেলা (কখন যে) ভাঙ্গি যায়। সেই চিন্তায় নিন্দ(ঘুম) হয় না। হামার (আমাদের) কি আরো ঈদ আছে বাহে?। ঈদ এবার বানের পানিত বাসি গেইছে।

তিস্তার পানি কমে যাওয়ায় তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে তিস্তার বামতীরে। তিস্তার হিংস্রো স্রোতে বসত ভিটা, আবাদি জমিসহ স্থাপনা বিলিন হয়েছে রাক্ষুসী তিস্তায়।

সরকারী হিসাব মতে এ পর্যন্ত লালমনিরহাটের ২৩৭ পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্থ এসব পরিবার পুনর্বাসনে পরিবার প্রতি ৭ হাজার টাকা বিতরন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি নদী ভাঙনে এক হাজারেরও বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।

নদী ভাঙনের শিকার এসব পরিবার ঘর বাড়ি সড়ায়ে রাস্তা বা বাঁধের পাশে রেখেছেন। কেউ আবার জমি ভাড়া নিয়ে দুই/একটি ছায়লা ঘর করে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

অনেকেই জমির অভাবে ঘর তৈরী করতে পারছে না। ফলে রাস্তার পাশে নিদারুন কষ্টে দিন কাটছে এসব পরিবারের।

তিস্তার বামতীর সদর উপজেলার চর গোকুন্ডা, খুনিয়াগাছ, আদিতমারীর কুটিরপাড়, চন্ডিমারী, বালাপাড়া, বাহাদুরপাড়া, কালীগঞ্জের আমিনগঞ্জ, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, সানিয়াজান, সিংগিমারী, হলদিবাড়ি চর ও পাটগ্রামের বহুল আলোচিত দহগ্রামে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন আতংকে রয়েছে এসব এলাকার নদীপাড়ের হাজারো পরিবার।

এসব পরিবারে ঈদের আনন্দ মলিন হয়েছে বন্যা আর ভাঙন আতংকে।

চন্ডিমারী গ্রামের অজিয়ার রহমান বলেন, নদীর ভাঙনে ঘর খুলে রাস্তায় ৪দিন ধরে ফেলে রেখেছি। খাওয়া ও রান্নার উপায় নেই। সেখানে কোরবানি কি? আর ঈদের আনন্দই বা কি? কেউ যদি মাংস দেয় তাহলে খাওয়া হবে। না দিলে ঈদের দিনেও ভর্তা ভাত জোটবে কি না জানি না।

কুটিরপাড় গ্রামের আবুল কাসেম জানান, প্রায় এক মাস ধরে পানিবন্দি রয়েছেন। পানিতে থেকে হাতে পায়ে ঘা হয়েছে। করোনায় কর্মহীন হওয়ায় অর্থ কষ্টের মাঝে বন্যায় জমানো টাকা সব শেষ।

শতকষ্টের মাঝেও গত বছর কোরবানি করেছেন। কিন্তু এ বছর কোরবানি করতে পারছেন না। প্রতিবেশিরা দিলে কোরবানির মাংস খাওয়া হবে অন্যথায় কোরবানির মাংসের স্বাদ লাগবে না তার পরিবারের মুখে।

ঈদের জন্য সরকারী ভাবে চাল বিতরন করা হলেও গত মাসের বন্যায় ১০ কেজি চাল পাওয়ায় ঈদের বিশেষ চাল তিনি পাননি বলে জানান।

এমন অবস্থা শুধু আবুল কাসেম বা অজিয়ারের নয়। তিস্তাপাড়ের অনেক পরিবার জীবনে এবারই প্রথম কোরবানিহীন ঈদ করবেন।

অন্যের দেয়া মাংসের অপেক্ষায় থাকবে তাদের পরিবার। তবে তিস্তাপাড়ে কোরবানি দেয়া পরিবারের সংখ্যা একেবারে নেই বললেই চলে। তাই এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যে জুটবে না কোরবানির মাংস।

পরিবারের ছেলে মেয়েদের সান্তনা দিতে কেউ কেউ বাজার থেকে সাধ্যমত মাংস কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সেই সাধ্যও নেই অনেকের। সব মিলে তিস্তাপাড়ে এবারের বিবর্ন ঈদ।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, বন্যা আর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়াও আসন্ন ঈদ উল আজাহার জন্য দুস্থদের মাঝে পরিবার প্রতি ১০ কেজি হারে ৭৬৭ মেঃটন জিআর চাল বিতরন করা হয়েছে।

  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    18
    Shares