বাড়িতে বাড়িতে শুধূ চলে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ও আনন্দ-ফুর্ত্তি। ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচনসহ বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাবার দাবার আগত অতিথিদের পরিবেশন করা হয়।

পাহাড়-হ্রদ আর অরণ্যের শহর রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণের মহান উৎসব, পাহাড়িদের প্রাণের উৎসব ‘বৈসাবি’। প্রতিবছর বৈসাবি উৎসব আসে। পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণের ছোঁয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবির শনিবার ছিল দ্বিতীয় দিন।

এ উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বাড়িতে বাড়িতে শুধু চলে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ও আনন্দ-ফুর্তি। ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচনসহ বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাবার দাবার আগত অতিথিদের পরিবেশন করা হয়। প্রায় অর্ধ শত প্রকারের তরিতরকারী দিয়ে রান্না হয় এ পাঁচন। এদিন ধনী-গরিব পাহাড়ি-বাঙালি সবাইয়ের জন্য সবার দ্বার উন্মুক্ত থাকে। এ মূল বিজুর দিনে হৈ-চৈ করে ঘুরে বেড়ানো আর খাওয়া-দাওয়া আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় করা হয়। এ ছাড়াও বিশেষ উপায়ে তৈরি দোচোয়ানী (পাহাড়ী মদ) পরিবেশন করা হয়।

পার্বত্য শহর রাঙামাটি এখন যেন উৎসবের শহর। নানান সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর পুরো শহর। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমাজে প্রচলিত আছে এ দিন দশটি বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দোচোয়ানী খেলে সারা বছর সুস্থ থাকে।

পাহাড়ি তরুণী বোবলী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, পার্বত্য শহর রাঙামাটি এখন যেন উৎসবের শহর। বিজু উৎসবটা মূলত তিনদিন ধরে পালন করে থাকি। বিজুর দিন বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে আসেন। আমরা নানা পিঠার আয়োজন করে থাকি। বৈসাবি উৎসবে আমরা অনেক আনন্দ করি। সারাবছর যেন এ রকম দিন থাকে এ প্রত্যাশা রাখি।

রাঙামাটির আসামবস্তীর লেমুছড়ি পাড়ার পদ্মশ্রী চাকমা বলেন, বিজু আসলে আমাদের পাহাড় নতুন প্রাণ খুঁজে পায়। পাহাড়ি-বাঙালি এক সাথে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠে। যদি সারাবছর পাহাড়ে বিজু থাকতো তাহলে আমাদের পাহাড়ে সকল বৈষম্য দূরীভূত হতো।

এদিকে, রাঙামাটি সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, পাহাড়ের এই বৈসাবি উৎসবকে একেক সম্প্রদায় একেক নামে অভিহিত করে। তিনি বলেন, নতুন বছরে আমরা যেন আমাদের সমৃদ্ধির পথে যেন এগিয়ে চলি। বাংলাদেশ যেন উন্নত দেশে পরিণত হয়। এর জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করি।

বাড়িতে বাড়িতে শুধু চলে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ও আনন্দ-ফুর্তি। ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচনসহ বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু খাবার দাবার আগত অতিথিদের পরিবেশন করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত এগার ভাষাভাষি ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু-বিহু-সাংক্রান। এ উৎসবটি নানান নামে অভিহিত করা হলেও এর নিবেদন ও ধরন কিন্তু একই। তাই এ উৎসবটি শুধু আনন্দের নয়, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, ঐক্য ও মৈত্রী বন্ধনের প্রতীকও বটে।

শনিবার সারাদিন বাড়ি বাড়ি বেড়ানো, রবিবার বিশ্রামের গোজ্যাপোজ্যার দিন বা নববর্ষ আর ১৫ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই জল উৎসবের মাধ্যমে শেষ হবে পাহাড়ে প্রাণের উৎসব বৈসাবি। পুরনো বছরের সব দুঃখ, বেদনা, গ্লানি, ব্যর্থতা ধুয়ে-মুছে এখন শুধু উৎসব মেতে ওঠার দিন। সব কাজ সেরে সব চিন্তা ঝেড়ে শুধু উৎসব আর আনন্দে কাটার দিন।

অপরদিকে, রাঙামাটির সংসদ পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, সদস্য ঊষাতন তালুকদার, চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, নিজ নিজ বাসভবনে সার্বজনীন আপ্যায়নে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করেছেন।

রবিবার বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাঙামাটিতে গৃহীত হয়েছে সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিকালে ঐতিহ্যবাহী বলিখেলা, দিনব্যাপী বৈশাখী মেলাসহ বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা।

বিজয় ধর, রাঙামাটি/জেবি