বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ কবিরুল ইসলাম।

দিনাজপুর জেলার সর্ব উত্তরের উপজেলা বীরগঞ্জ। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই উপজেলার আয়তন ৪৩১ বর্গ কি: মি:। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ এলাকা ছিল ৭নং সেক্টরের অধীন। প্রথমে এই সেক্টরের কমান্ডার মেজর নজমুল হক এবং পরে লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর হাবিলদার মো. তাফিজুর রহমান বীরগঞ্জের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অধ্যাপক কালিপদ রায়ের প্রদত্ত তথ্যমতে দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন বীরগঞ্জের ৪ জন বীর সন্তান বুধারু বর্মন, রমেন সেন, আমীর আলী ও মতিলাল বর্মন এবং যুদ্ধাহত ছিলেন খীতিশ চন্দ্র রায়। বীরগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা মোট ১৬০ জন, যারা দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন ।

এর মধ্যে অন্যতম সাতোর ইউনিয়নের সিংহজানী গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে গেরিলা যোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কবিরুল ইসলাম। যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর। সেই সময় তিনি দিনাজপুর কলেজের ইন্টারমেডিয়েটের ছাত্র।

কলেজ জীবনে রাজনীতি না করলেও তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ এর ভাষণ তাকে অনুপ্রাণিত করে যুদ্ধে যেতে। তার সাথে কথা হয় স্বাধীনতা ঘোষণা, যুদ্ধে গমন, ইয়ুথ ট্রান্সিট ক্যাম্প গঠন, ট্রেনিং এবং সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ নানা বিষয়ে। এমন কি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাম্পেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অধীনে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও আছে তার। পাঠকের জন্য নিম্নে তা তুলে ধরা হলো।

প্রারম্ভ- ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর সারা দেশের ন্যায় ঠাকুরগাঁ এবং দিনাজপুরের ই পি আর ক্যাম্পের বাঙালি জোয়ানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং স্থানীয় সৈয়দপুর ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর আগমন ঠেকাতে বীরগঞ্জের সন্নিকটে ভাতগাঁ ব্রিজে প্রতিরোধ তৈরি করে। এ সময় বীরগঞ্জের বর্তমান নির্মাণ ট্রেডার্সের বিপরীতে অবস্থিত গামা চৌধুরীর মিল থেকে খাদ্য সরবরাহ করা হতো। সেই সময় বীরগঞ্জের মো. তরিকুল ইসলাম, আব্দুল বারী, আব্দুল হক, আব্দুল খালেক, আব্দুল বাসেত, মো. আজিজুল মিয়াঁ, বিভিন্নভাবে জোয়ানদের সাহায্য করেন। কিন্তু ১৮ই এপ্রিল সৈয়দপুর থেকে আগত পাকিস্তান বাহিনীর প্রবল গোলা বর্ষণে সেই প্রতিরোধ ভেঙে যায় এবং পাকিস্তান বাহিনী আশেপাশে অনেক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ফলে সবাই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অনেকের সাথে কবিরুল ইসলামও উত্তর দিনাজপুরের মালনের শরণার্থী শিবিরে গমন করেন।

ইয়ুথ ট্রান্সিট ক্যাম্প- মালনে শরণার্থী শিবিরে অবস্থানের সময় কবিরুল ইসলাম খোঁজা শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য কারা ট্রেনিং দিচ্ছেন? এমন সময় তার সাথে সাক্ষাত হলো পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন এম এন এ (মেম্বার অব ন্যাশনাল এসেম্বলি) ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আজিজুর রহমান অ্যাডভোকেটের সাথে। ওনার নির্দেশনায় এবং বি এস এফ এর তত্ত্বাবধানে তখন বাহরাইলে প্রতিষ্ঠিত হলো ইয়ুথ ট্রান্সিট ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পের ইনচার্জ হলেন কবিরুল ইসলাম। ওই ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য যুবকদের রিক্রুট করা হতো এবং পরে আরো ভালো প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ শিবিরে পাঠানো হতো।

প্রশিক্ষণ- ইয়ুথ ট্রান্সিট ক্যাম্প থেকে ১২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীসহ কবিরুল ইসলাম যোগ দেন কুলিক ফরেস্টে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। কিন্তু ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে ওই ক্যাম্প স্থানান্তর করা হয় কালীগঞ্জের ফতেহপুর নামক জায়গায়। কিন্তু ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে ফতেহপুরের ওই ক্যাম্পও প্রশিক্ষণের অনুপযোগী হয়ে পরে। তখন তারা প্রশিক্ষণের জন্য পানিঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্পে গমন করেন।

পানিঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্পে ৪ টি কোম্পানির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ চলে। প্রতিটি কোম্পানিতে ১৬০ জন করে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কোম্পানিগুলো হলো- আলফা, ব্রেভো, চার্লি ও ডেল্টা। কবিরুল ইসলাম ব্রেভো কোম্পানিতে ক্যাপ্টেন সুদীপ্ত মুখার্জির অধীনে ৩৮ দিন গেরিলা যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং ৭নং সাব সেক্টরের হেড কোয়ার্টার থুকরাবাড়িতে ফেরত আসেন। তারপর তাদের ৩ দিনের একটি বিশেষ ট্রেনিংয়ের জন্য বি এস এফ এর হেড কোয়ার্টার কর্ণজোরায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার সাথে ছিলেন পীরগঞ্জের উপল চন্দ্র সরকার ও কৃষ্ণ চন্দ্র রায়।এখানে ট্রেনিংয়ের পর তাদেরকে আবার থুকরাবাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

সম্মুখ যুদ্ধ (১)- বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণের পর থুকরাবাড়িতে জুনের ১৩ তারিখে হাবিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে অপারেশনের জন্য তারা সোনামতি বি ও পি (বর্ডার অপারেশন পোস্ট) তে গমন করেন এবং ঐ তারিখেই রাত ১০ টায় বালিয়াডাঙ্গি থানার ঠক বস্তি গ্রামে অপারেশনে মোট ২৪ জন মুক্তি যোদ্ধা সবার সাথে গাদা রাইফেল ও সর্বসাকুল্যে ১ টি ছয় ইঞ্চি মর্টারগানসহ গমন করেন। ভোর রাতে উক্ত স্থানে অবস্থানের পর সকাল ১০ টায় পাকিস্তান বাহিনীর সাথে সামনাসামনি গোলাগুলির এক পর্যায়ে ডিফেন্স পার্টির ৪ জন পাট ক্ষেতে অবস্থান নেন, এক পর্যায়ে তার পাশের সহযোদ্ধা রানীসংকৈল থানার আব্দুল খালেকের গলায় একটি গুলি এসে লাগে। সবাই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। তিনি শহীদ হন কবিরুল ইসলামের কোলেই এবং তাকে বাংলাদেশ সীমান্তে কবর দেওয়া হয়।

ওই যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীরও অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয় এবং তারা বালিয়াডাঙ্গিতে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সম্মুখ যুদ্ধ (২)- কবিরুল ইসলাম অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পীরগঞ্জের যাবরহাট নামক জায়গায় সম্মুখ যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সাথে অংশগ্রহণ করেন। পাকবাহিনীর প্রতিরোধের জন্য মুক্তিবাহিনী পীরগঞ্জ থানার যাবরহাট আসলে পাকিস্তান বাহিনীর সাথে প্রবল গোলাগুলির এক পর্যায়ে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ২ ইঞ্চি মর্টারের সেল পায়ে লেগে আহত হন এবং তাকে কর্ণজোরায় চিকিৎসান্তে ৭নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার তরঙ্গপুরে পাঠানো হয়। যাবরহাট যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

পরিশেষে এই টুকুই বলা যায় যে, এমনই ছোট বড় অসংখ্য যুদ্ধের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। যে স্বপ্ন নিযে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা কবিরুল ইসলামরা যুদ্ধ করেছেন, তা আমরা কোনোভাবেই ম্লান হতে দেব না, স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই হউক আমাদের অঙ্গীকার।

আজকের পত্রিকা/হাসান জুয়েল,বীরগঞ্জ,দিনাজপুর/জেবি