এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

গ্রাফিক্স : আজকের পত্রিকা

প্রিয় পাঠক, লেখার শুরুতেই মনে পড়লো প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদের একটি উক্তির কথা। তিনি তার একটি লেখনিতে লিখেছেন, পৃথিবী জুড়ে প্রতিটি নরনারী এখন মনে করে তাদের জীবন ব্যর্থ; কেননা তারা অভিনেতা বা অভিনেত্রী হতে পারেনি’।

হয়তো আপনারা বলবেন আমি কেনো এই উক্তি এখানে উল্লেখ করলাম।

এভাবেই কুপানো হয় রিফাতকে, পাশে স্ত্রী মিন্নি। ছবি : সংগৃহীত

দিনদুপুরে প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা। স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রীর আপ্রাণ চেষ্টা। এনিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা। কেউ ঘাতকের হাতে নিহত স্বামীর জন্য সহানুভূতি দেখালেন, আবার কেউ স্বামী হারা বউয়ের জন্য চোখের জল ফেললেন।

কেউ কেউ অতিউৎসাহী হয়ে পুলিশসহ প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। কেনো আসামি ধরা পড়ছে না। সারাদেশ যখন এই এক আলোচনায় মাতোয়ারা ঠিক ৫ দিন পর সিনেমার ভিলেন পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রশাসন এ ঘটনা সংক্রান্ত দায়েরী মামলায় সকলকেই আইনের আওতায় আনে।

কিন্তু এরপরও আলোচনা থামে না। ফেসবুক, ইউটিউবসহ গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নতুন নতুন গল্প তৈরি হয়। বলা হয় ভিলেন মারলো নায়ককে, আর ভিলেন মরলো পুলিশের সাথে গোলাগুলিতে। তবুও প্রশ্ন করা বন্ধ হলো না।

এক শ্রেণির মানুষ যারা আগে থেকেই এই গল্পের ভবিষ্যত দেখতে পেয়েছিলেন তারা নায়িকাকে সন্দেহ করতে লাগলেন। বলা শুরু করলেন খলনায়ক যতটা না দোষী, গল্পের নায়িকা ততটাই। কেননা, গল্পের নায়িকা ভিলেনের সাথে মিলে ঘটনার পরিকল্পনা করেছে।

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি

যারা এরকম ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন, তাদেরও সমালোচনা করেছেন অনেকে। কিন্তু না, সময় যতো অতিবাহিত হচ্ছিল, গল্পের কাহিনী ততই স্পষ্ট হচ্ছিল। কথায় বলে, অপরাধী অপরাধ করলে কোনো না কোনো প্রমাণ রেখেই যায়। এই সিনেমার গল্পও সেরকম। নায়িকা যতই ছলছাতুরি করে গল্পের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করুক না কেনো, তা ধরা পড়ে যায় আধুনিকের তথ্যপ্রযুক্তির সিসিক্যামেরায়।

গণমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশ হলে ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, যখন নায়ককে ভিলেন কুপিয়ে হত্যা করে তখন নায়িকার হাবভাব, চালচলন স্বাভাবিক দেখে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আবারও সন্দেহ দানা বাঁধে। উঠে সমালোচনার ঝড়। কিন্তু নায়িকা কৌশলে তা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু বোমা ফাটান ভিলেনের মা। তিনি বলেন, ছেলেতো হারিয়েছি, আমার হারানোর কিছু নেই। তিনি পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দিয়ে নায়িকা মহারাজ সাপ আখ্যা দেন। এ বিষয়টিও ভাইরাল হয়।

এদিকে ভিলেনের মায়ের বক্তব্য শুনে নায়কের বাবাও তার ভুল বুঝতে পারেন। তিনি তার পুত্রবধূর গ্রেফতার দাবি করেন। চতুর নায়িকা কোনো দিশা না পেয়ে মিডিয়া ডেকে শ্বশুরের মাথা খারাপ, মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বলে মোড় ঘুরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু না। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। দেশজুড়ে নায়িকার গ্রেফতারের দাবি উঠে।

জনদাবির কাছে নায়িকার সকল ছাতুরি বেশিক্ষণ ঠিকেনি। অবশেষে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠায়। কিন্তু প্রশাসনের সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় পুলিশ নায়িকাকে গ্রেফতার দেখায়। কাজে আসেনি মিন্নির অভিনয়। যে কারণেই লেখার শুরুতেই হুমায়ুন আজাদের এই উক্তিটা উল্লেখ করেছি।

পাঠক, এতক্ষণ ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইলাম। আপনারা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন আমি কোনো সিনেমার গল্পের কথা বলেনি। বাস্তবজীবনের এক ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী বলে গেছি। হ্যাঁ, পাঠক বলছিলাম, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যার গল্প।

যা নিয়ে সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। যে হত্যা নিয়ে ফেসবুকসহ যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে ‍উঠেছিল। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সকলেই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তও বিচার দাবি করেছিলেন। সেই রিফাত হত্যার আগে পরে ও মাঝখানের কতগুলো বিষয় নিয়েই আজকের লেখা।

রিফাত ও মিন্নির ছবি

পুলিশ রিফাত হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নিকে গ্রেফতার করেছে । ১৬ জুলাই মঙ্গলবার দিনে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে গ্রেফতার করা হয়।

সকালে বরগুনার বাসা থেকে মিন্নি ও তার বাবাকে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাতে মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এর আগে, বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার বাদি নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ও মামলার প্রধান সাক্ষী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি পরস্পর দোষারোপ করে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

একই সময়ে বন্দুকযদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের মা শাহিদা বেগমও মিন্নিকে জড়িয়ে বিবৃতি দেওয়ায় রিফাত হত্যার ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, মামলার মূল রহস্য উদঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এ মামলার ১ নম্বর সাক্ষী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে (২০) ১৬ জুলাই মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০ টায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ লাইনসে আনা হয়। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং সুদীর্ঘ সময় ধরে তথ্যাদি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। আর তাই মামলার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাত ৯ টায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সচেতন মহলে যখন প্রশ্ন উঠে আইন সকলের জন্য সমান। তা নারী হোক আর পুরুষই হোক। যে অপরাধী তাকে যেনো আইনের আওতায় আনা হয়, ঠিক সেই মুহুর্তে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ফেঁসে গেলো রিফাতের স্ত্রী। পুলিশও তাকে ছেড়ে না দিয়ে আইনের আওতায় এনে গ্রেফতার দেখালো। এ জন্য অনেকে সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনকে ধন্যবাদও জানান।

তাদের মতে, নারী-পুরুষ যেহেতু সমান অধিকার, সেহেতু পুরুষ একা কেনো দোষী হবে, শাস্তি পাবে। নারী যদি জড়িত থাকে তাকেও শাস্তি  পেতে হবে।

পাঠক, আমি পুরো নারী সমাজকে কটাক্ষ করে বা অপমান করে এ কথা বলেনি। বলেছি, এ কারণে এই একটিমাত্র নারীর কারণে গোটা নারী সমাজ কলংকিত হওয়ার পথে ছিলো। আমি প্রশাসনকে ব্যক্তিভাবে ধন্যবাদ জানাই, মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেফতার করে পুরো নারী সমাজকে কলংকিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

পাঠক এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কেনো এ হত্যাকাণ্ড হলো। এর পেছনে কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তরে আমি যেটা বলতে চাই, সেটা হলো ত্রিভূজ প্রেম। ইতোপূর্বে যা গণমাধ্যমে এসেছে। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, মিন্নির সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো।

এটি একটি প্রেম ঘটিত সমস্যা। আর এ প্রেমঘটিত সমস্যার কারণেই দুইটা জীবন অকালে ঝরে গেছে। আমি বুঝি না, ছেলেমেয়েরা কেনো প্রেমের মতো প্রেম না করে কেনো একাধিক প্রেম করে।

কেনো তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে একাধিক প্রেমকে বিদায় দেয় না। সমাজে দেখা যায়, একটা মেয়ে, একটা ছেলে একসাথে একটা, দুইটা, তিনটা, এমনকি পাঁচটা প্রেমও করে থাকে।

রিফাত ও মিন্নির বিয়ের ছবি

ঠিক তেমনি নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিও দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতো বলে গণমাধ্যমে এসেছে। একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রিফাতের হত্যাকারী নয়ন বন্ডের জন্মদিনে আনন্দ উদযাপন করছেন মিন্নি শরীফ। এই ভিডিওর আগে ছবি ভাইরাল হয়েছিলো। তখন এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা হয়। কেউ কেউ বলেন, এটা রিফাতের সাথে মিন্নির বিয়ের আগের ঘটনা। বিয়ের আগে একটা মেয়ের একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক থাকতেই পারে। তাতে অনেকে দোষ দেখছেন না। এখানে প্রশ্ন হলো, বিয়ের আগে সম্পর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু বিয়ের পর এ সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানো কি দোষের নয়? হয়তোবা মিন্নি বিয়ের পরও তার পুরোনো সম্পর্ক বয়ে বেড়িয়েছেন।

বিষয়টি পরিস্কার হওয়ার আগেই সামনে এলো মিন্নি আর নয়ন বন্ডের কাবিন নামা। এতে দেখা যায়, মিন্নি নয়ন বন্ডের ২য় স্ত্রী। তাদের বিয়ের বিষয়টি কাজি নিজেও স্বীকার করেছেন গণমাধ্যমের কাছে।

নয়ন বন্ডের ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বিয়ের প্রথম স্বাক্ষী রিফাত শরীফ, হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় আসামি বাকিবুল হাসান রিফাত ওরফে রিফাত ফরাজি। গত বছরের ১৫ অক্টোবর আছরের নামাজের পর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের দেনমোহর হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। তবে দেনমোহরের কোনো নগদ পরিশোধ ছিল না।

বিয়ের কাজী মো. আনিসুর রহমান ভুইয়া বলেন, বিয়ে করার জন্য নয়ন ও মিন্নিসহ ১৫ থেকে ২০ জন লোক আসে আমার অফিসে। এসময় নয়ন ও মিন্নি তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রমাণস্বরূপ এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে আসে। এরপর আমি মেয়ের বাবার সঙ্গে কথা জানতে চাইলে তারা বলে, মেয়ের বাবা আসবে না, আপনি মেয়ের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর মিন্নির মা পরিচয়ে একজন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

তিনি আমাকে বলেন, বিয়ের বিষয়টি আমরাতো জানি। মিন্নির বাবা বিয়েটা এখন মানবে না। আপনি বিয়ে সম্পন্ন করেন। বিয়ের কিছুদিন পর ঠিকই মেনে নেবেন। এরপর আমি পাঁচ লক্ষ টাকা দেনমোহরে নয়ন ও মিন্নির বিয়ে সম্পন্ন করি। এ বিয়ের উকিল ছিলেন শাওন নামের একজন। শাওন ডিকেপি রোডের মো. জালাল আহমেদের ছেলে।

আমি আমার আগের লেখায় অনেকগুলো প্রশ্ন রেখেছিলাম। বলেছিলাম, এসব প্রশ্নের উত্তর মিন্নিকে দিতে হবে। আজ হোক বা কাল।

যেমন মিন্নি গণমাধ্যমকে বলেন, আমার বিয়ে হয়েছে একমাত্র রিফাত শরীফের সঙ্গে। এছাড়া আর কখনো কারও সঙ্গে বিয়ে হয়নি। যেহেতু বিয়েই হয়নি, ডিভোর্স হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। রিফাতই আমার স্বামী এবং এটাই সত্য।

প্রশ্ন হলো, এক মেয়ের কয়বার বিয়ে হয়েছে। আর বিয়ে যদি নাইবা হবে তবে কাবিন নামা আসলো কোথায় থেকে। তবে কি নয়ন বন্ড জালিয়াতির মাধ্যমে কাবিননামা তৈরি করেছে। না।

মিন্নি বলছেন, নয়ন নাকি তাকে জোর করে কাবিন নামায় স্বাক্ষর নিয়েছিলো।

প্রশ্ন হলো, জোর করে স্বাক্ষর নিলে তিনি জোর করে বিয়ের বিষয়টি কাউকে জানিয়েছিলেন কি? জানাননি তো!

রিফাতের বাবা। ফাইল ছবি

হয়তোবা তিনি না জানিয়ে নিহত রিফাতের অগোচরে নয়নকে ম্যানেজ করার পন্থা অবলম্বন করছিলেন। নয়ন হয়তো মিন্নিকে চাপ দিচ্ছিল রিফাতকে ছেড়ে তার কাছে চলে যাওয়ার। কিন্তু রিফাতের সাথে যেহেতু মিন্নির বিয়ে সামাজিকভাবে হয়েছে, সেহেতু তাকে মিন্নির পক্ষে ছাড়া সম্ভব নয়, বিধায় মিন্নি আর নয়ন মিলেই পথের কাটা রিফাতকে সরিয়ে দেয়ার প্ল্যান করেছিলেন।

আমি সরাসরি মিন্নিকে দায়ি করছি না।

আমি একথাগুলো সবই অনুমান নির্ভর হয়ে বলেছিলাম। কারণ বাস্তব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিয়েছিলো। আমি বলেছিলাম, অনেক কথাই সামনে আসবে, আসতে শুরু করেছে, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিন্নিকেই দিতে হবে। সুষ্ঠু বিচারের জন্য হলেও প্রশাসনের কাছে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

মিন্নি গণমাধ্যমের কাছে যেভাবেই বলুন না কেনো? তাতে যায় আসে না কারো। সবার একটাই চাওয়া ছিলো খুনের রহস্য উদঘাটনে প্রয়োজনে যদি মিন্নিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়, তবে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। আর অবশ্যই থানায় নিয়ে যথাযথ আইন মেনে। তবেই বেরিয়ে আসবে ইদুরের গর্তে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাগুলো।

কেননা, মিন্নি যে তথ্য গোপন করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়, ৭ জুন নিজের ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস থেকে। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তোরে ভুলে যাওয়ার লাগি আমি ভালোবাসিনি সব ভেঙ্গে যাবে এভাবে ভাবতে পারিনি তুই ছাড়া কে বন্ধু হায় বুঝে আমার মোন তুই বিহনে আর এ ভুবনে আছে কে আপন?’

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত কে সেই বন্ধু। যে বন্ধুকে মিন্নি ভালোবাসতেন। সে কি তবে নয়ন নাকি অন্য কেউ? এ বিষয়টিও অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, যে আইডি থেকে এ স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছে, এটা মিন্নির নয়। কেননা,  মিন্নির নামে অসংখ্য ফেসবুক আইডি খোলা হয়েছে। এ বিষয়টিও প্রশাসনের আইসিটি বিভাগ খতিয়ে দেখতে পারে।

কেউ কেউ বলছেন, খুনিদের একজনের সাথে রিফাতের স্ত্রী মিন্নির প্রেম ছিল। রিফাত তাকে বিয়ে করেছে বলেই তাকে খুন হতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, খুনের সময় স্বামীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন মিন্নি। কিন্তু পারেননি। একজন নারী হয়ে তিনি এর চাইতে আর কতটুকু বেশিই করতে পারতেন।

আবার অনেকেই তার এই এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে নাটক আখ্যা দিতেও ছাড়ছেন না। অনেকের প্রশ্ন, নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসী এমন নির্মমভাবে রিফাতকে কুপালো, মিন্নিকেতো একটা চড় থাপ্পরও দিলো না কেনো? এখানে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, নয়ন কেনো মিন্নিকে আঘাত করলো না, সেটি জানতে হলেতো আগে নয়নকে গ্রেফতার হতে হবে। এর আগে জানা যাবে না। কিন্তু নয়ন আর নেই। মিন্নিসহ অন্য আসামি আছে।

রইলো বাকী গোপন প্রেমের কথা। প্রেম আবার কি? ইতোমধ্যে সামনে এসেছে প্রেম নয়, বিয়েই হয়েছিলো। বলেছিলাম এ প্রশ্নের কি সমাধান হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলেও আমাদেরকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এখনও বলছি, আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, যতক্ষণ না পর্যন্ত মিন্নি তার দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই রিফাতের ক্ষেত্রে প্রাক্তণ প্রেম বা পরকীয়াকে খুনের কারণ হিসাবে জাস্টিফাই করতে ইচ্ছুক নন। এখানে আমার একটা প্রশ্ন, প্রেম-বিয়ে না হয় বাদই দিলাম। তাহলে মিন্নি কেনো কলেজ ফাঁকি দিয়ে নয়ন বন্ডের বাড়ি যেতো?

এ প্রশ্নের সমাধানে আমার মাথায় বেশ কয়েকদিন ধরে একটা প্রশ্ন খেলছিলো। আমি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। নিজেই নিজের মনকে বার বার প্রশ্ন করেছিলাম, রিফাত আর নয়ন প্রেম করেনি, বিয়েও করেনি, তবে কেনো মিন্নি নয়নের বাড়ি যেতো।

মাথা খাটিয়ে যখন প্রশ্নের উত্তর পেলাম, তখন নিজেই ঠাস্কি খাইলাম। গণমাধ্যম সুত্রে যতদুর জানা গেছে, নিহত নয়ন বন্ড সন্ত্রাসীর পাশাপাশি একজন মাদক বিক্রেতা ছিলো। সবধরনের মাদক বিক্রি করতো। যদি নয়নের সাথে মিন্নির প্রেম না হয়, মিন্নি যদি নয়নকে বিয়েও না করে তাহলে যে কারণে তার বাড়ি যেতো সেটি হলো মিন্নি কি তবে মাদকে …. আসক্ত ছিলো।

এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারব না। তবে ইতোমধ্যে ইউটিউবে এ বিষয়টিও ভাইরাল হয়ে গেছে। লেখার শেষ পর্যায়ে এসে আমার মনে পড়ে গেলো ঐশির কথা। যে কিনা তার জন্মধাত্রী বা-মাকেও ছাড়েনি। আজ তার ঠিকানা কোথায়? জেলখানায়। তবে কি মিন্নিও ঐশির পথে হেটেছে। যার কারণে দুইটা তরতাজা প্রাণ অকালে নিভে গেছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন বরগুনা সরকরি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ ছাড়া সন্দেহভাজন অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়।

এ মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামি সহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলা দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীসহ বাকি তিন আসামি এখনও রিমান্ডে আছেন।

এর আগে গত শনিবার রাত আটটার দিকে রিফাতের বাবা বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির গ্রেপ্তার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এ হত্যার সঙ্গে মিন্নি জড়িত। রিফাতের বাবার এই অভিযোগের ফলে ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়। মিন্নির গ্রেপ্তারের দাবিতে পরদিন রোববার ১১টায় বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, রিফাত হত্যায় তাঁর স্ত্রী মিন্নি জড়িত।

‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ। মানববন্ধনে রিফাতের বাবা ছাড়াও বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ও স্থানীয় সাংসদের ছেলে সুনাম দেবনাথ বক্তৃতা করেন।

রবিবার সকালেই ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে মানববন্ধনের পর দুপুরে মিন্নি তাঁর বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, যাঁরা বরগুনায় ‘বন্ড ০০৭’ নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টি করিয়েছিলেন, তাঁরা খুবই ক্ষমতাবান এবং অর্থবিত্তশালী। নেপথ্যের এই ক্ষমতাবানেরা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকা ও এই হত্যা মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য তাঁর শ্বশুরকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।

এরপর মঙ্গলবার সকালে মিন্নিকে পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

আমার ধারণা, এতোদিন যার খেয়েছে, যার পড়েছেন তার হত্যায় সহযোগিতা করেছেন আয়শা সিদ্দীকা মিন্নি। এই বিশ্বাসঘাতক নারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

তাছাড়া, মিন্নিসহ যারা এ ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, আমি তাদের যেমন দায়ী করবো, সেই সাথে তাদের পরিবারের সদস্যসহ সমাজব্যবস্থাকেও দায়ী করব। কারণ, পারিবারিক, সামাজিক, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, সাংস্কৃতিক চেতনা, নৈতিকতা ও আদর্শিক ভাবধারার অভাব ছিলো রিফাত-মিন্নি-নয়নসহ অন্যান্যদের পরিবারে।

যে কারণে দিকভ্রান্ত হয়ে জঘন্য, বিবেকহীন যেকোনো অপরাধে জড়াতেও তারা পিছপা হয়নি। যেকোনো উপায়ে স্বার্থসাধনের চেষ্টায় রত ছিলো এই ছেলেমেয়েগুলো।

পরিবার নাকি প্রতিটি মানুষের প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। মানবতার ভবিষ্যত নাকি রচিত হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। পরিবারেই নাকি প্রথম মানুষের মানবিক গঠন তৈরি হয়। পরিবারকে নাকি সমাজের মৌলিক কোষ বা সেল বলা হয়। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় একটা কথা বলে, বাপ ভালো তো পুত ভালো, মা-ভালোতো ঝি, গাই ভালো তো বাছুর ভালো, দুধ ভালো তার ঘি।

ওই সব ছেলেমেয়েদের পরিবারে পারিবারিক, সামাজিক, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, সাংস্কৃতিক চেতনা, নৈতিকতা ও আদর্শিক ভাবধারার অভাব থাকায় বিপথগামী হয়েছে তারা।

পাঠক শেষ করার আগে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে একটা কথা বলি, আমার মতে প্রেম করে জীবন দেয়ার চেয়ে ছ্যাকা খাওয়াও অনেক ভালো। কারণ যে ছ্যাকা খায়, সে এর মাধ্যমে এমন একজনকে হারায় যে আদৌ তাকে ভালবাসেনি। এককথায় সে একজন প্রতারককে হারায়। এটা একটা ভালো দিক, কেননা ভবিষ্যতে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।

অপরদিকে যে ছ্যাকা দেয় সে হারায় একজন প্রকৃত প্রেমিককে, যে তাকে মনেপ্রাণে ভালবাসতো। তাই বন্ধুরা যারা প্রকৃত ভালবাসা করে ব্যর্থ, তাদের জন্য খুশির খবর হলো, আপনি কিছুই হারাননি। বরং যে আপনার সাথে প্রতারণা করল, সেই আপনার মতো একজন মূল্যবান ব্যক্তিকে বা মানুষকে হারালো।

রিফাতের বাবার সংবাদ সম্মেলন।

তবে হ্যাঁ। প্রেম করবেন, অবশ্যই করবেন, তবে একটা প্রেমই করবেন। দুই নৌকায় পা দিবেন না। তাহলে ধপাস করে মাঝ নদীতে পড়বেন। কাজেই প্রেম করবেন, সত্যিকারের প্রেম করবেন। লাইলী-মজনু, শিরি, ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট যেভাবে করেছে।

আসুন না, আমরা প্রত্যেকে যার যার নিজের জায়গা থেকে এসব বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি। আমরা এক কদম এগিয়ে আসি। হয়তো আমাদের বাড়ানো এক কদমই পারে সমাজকে হাজার মাইল এগিয়ে নিয়ে যেতে। আসুন আমরা বিবাহবর্হিভূত প্রেম থেকে বিরত থাকি, সচেতন হই, শান্তিতে থাকি। ইতিবাচক চিন্তা করি, নিজেকে ভাবি, নিজেদের পরিবারের কথা ভাবি।

-লেখক ও সাংবাদিক