নেত্রকোনায় গরিবের (এসি) মাটির ঘর। ছবি : সোহেল খান দুর্জয়।

বেশি দিন আগের কথা নয়, দেশের প্রায় গ্রামে দেখা যেতো সুদৃশ্য অসংখ্য মাটির ঘর। সময়ের আবর্তে আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে মাটির তৈরি ঘরগুলো। আরামদায়ক মাটির আবাসস্থলে দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও এক সময় পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন। রঙ-বেরঙের, একতলা-দুতলা, নকশা আঁকা মাটির ঘর, তার কোনো সীমা নেই। এখন আর মানুষ মাটির ঘর তৈরি করে না। সবাই পাকা দালান বাড়ি তৈরি করে। তাই পেশা পরিবর্তন করছেন অনেক মাটির ঘর তৈরির কারিগর। মাটির তৈরি ঘরের একাল আর সেকাল নিয়ে লিখেছেন নেত্রকোনার প্রতিনিধি সোহেল খান দুর্জয়।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখনকার যুগে কেউ আর মাটির ঘরে বসবাস করতে চায় না। তাই মাটির ঘর ভেঙে এখন নির্মাণ করা হচ্ছে ইটের তৈরি পাকা দালান। একটা সময় ওই মাটির ঘরগুলো ছিল এসির মতো। শত বছরের স্মৃতি সেই মাটির ঘর আজ নেত্রকোনা থেকে বিলুপ্তির পথে। এ জেলার মাটির ঘরের কদর কমিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক বন্যা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

শুধু মাটির ঘরই নয়, ছিল ধান চাল রাখার জন্যে মাটির তৈরি গোলা ঘর ও কুটির। দিনদিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে মাটির ঘর আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই মাটির ঘর ঠাণ্ডা থাকায় এক সময় এটাকে গরিবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরও বলা হতো। এ ঘর গরমের সময় আরামদায়ক। তবে এখনো নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা-দুর্গাপুর অঞ্চলের অনেক গ্রামে রয়েছে মাটির ঘর।

মাটির ঘরে বিভিন্ন ধরনের নকশা আঁকা হতো। পুরনো ঐতিহ্যের অনেক ছবি দেওয়ালগুলোতে আঁকা হতো। এই দেয়াল তৈরির কারিগরা দু’তালা মাটির ঘরও বানাতো। করতেন চাহিদা অনুয়ায়ী বিভিন্ন রঙ। জমি অথবা পুকুরের কাদা মাটি দিয়ে ৪/৫ ফুট চওড়া দেয়াল নির্মাণ করে মাটির ঘর তৈরি করা হতো। উচ্চতা প্রায় ১২-১৫ ফুট পর্যন্ত হতো। কাঠ বা সুপারি ও বাঁশের সিলিং তৈরি করে তার উপরে খড় অথবা টিনের ছাউনি দেয়া হতো।

গৃহিনীর হাতের স্পর্শে সেই মাটির ঘরের সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করতো। মাটির ঘর বিলুপ্তির কারণ হিসেবে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় মাটির ঘরগুলো বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশেষ ক্ষতি হচ্ছে। এই মাটির ঘরগুলোকে স্থানীয়ভাবে কোঠাঘর বলা হতো। ঘরের গাঁতুনি দেওয়ার সময় কারিগররা মাটিকে ভালোভাবে পিষিয়ে তাতে ছোট্ট ছোট্ট টুকরো করে পাটের আঁশ বা খড় বা ধানের চিটা বা কুঁড়া মিশিয়ে দিত। এতে করে মাটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতো। কারিগররা একটি ঘরের চারিদিকে একস্তরের ২ ফুট প্রস্থে মাটি দিয়ে দু’এক দিন রোদে শুকিয়ে আবার গাঁথুনি শুরু করতেন। এ ঘর তৈরির উপযুক্ত সময় ছিল শুষ্ক মৌসুম।

এভাবে মাটির ঘর তৈরি করে ছাদ হিসেবে বাঁশ ও তার উপরে অন্তত ১ ফুট মাটির প্রলেপ দেয়া হতো। কেউ বা ছনের ছাদও দিত। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলরা অবশ্য টিনের ছাদ দিত। ফলে এ ঘরটিতে সবসময় ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করতো। এমনকি আগুন লাগলেও ঘরের সব আসবাবপত্র পুড়ে যেত না।

নেত্রকোনা জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় এসব মাটির ঘরের বেশির ভাগই হয় ভেঙে গেছে না হয় ফেটে গেছে। এ নিয়ে চিন্তিত অনেকেই। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর ভরসা এখনো এই মাটির ঘরেই। মাটির সহজলভ্যতা এর প্রয়োজনীয় উপকরণ আর শ্রমিক খরচ কম হওয়ায় অনেক মানুষ মাটির ঘর বানাতে বেশি আগ্রহী ছিল। মাটির ঘর যাদের আছে তারা প্রতি বছরেই মাটির প্রলেপ দেন। অনেকে আবার চুনকামসহ বিভিন্ন রঙ করেন।

দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত মানকিন আজকের পত্রিকাকে জানান, সাধারণত এটেল বা আঠালো মাটি দিয়ে পানির সঙ্গে মিশিয়ে কাদায় পরিণত করা হয়। এরপর বিশ থেকে ত্রিশ ইঞ্চি চওড়া দেয়াল তৈরি করতেও মাঝখানে সময় লেগে যায়। কারণ একবারে দেয়াল তোলা যায় না। কিন্তু দেয়াল তোলার পর শুকাতে হয়। দশ থেকে পনের ফুট উচু দেয়া কাঠ বা বাশের সিলিং তৈরি করে তার উপর খড় বা টিনের ছাউনি দেয়া হয়। তার দ্বিতল মাটির বাড়ি রয়েছে এ গ্রামের অনেকের বাড়িতে।

বারহাট্টা উপজেলা সদরের আন্দাদিয়া গ্রামের মনির হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, অনেকেই বাঁশ মাটি টিন সংগ্রহ করে নিজেরাই মাটির ঘর তৈরি করেন। এ ক্ষেত্রে তবে খরচ কম পড়ে। শ্রমিক না নিলে কমপক্ষে বার থেকে পনের হাজার টাকা খরচ কম হয়। তাই এ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে এখনও মাটির বাড়িঘর রয়েছে ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হিসেবে। নতুন প্রজন্মকে এই মাটির ঘর বিষয়ে জানাতে এখনও তারা এই মাটির ঘর ব্যবহার করছে। এই মাটির ঘরের আরও কিছু গুণাবলী রয়েছে, যা ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে এর স্থায়িত্ব শত বছরও হতে পারে বলে জানান এলাকাবাসী।

বর্তমান সময়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি)’র সাহায্যে ঘর ঠাণ্ডা এবং শীতের মৌসুমে হিটার দিয়ে গরম রাখা হয়ে থাকে। তাছাড়া গ্রামের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক আধুনিক। এখন গরিবের সেই (এসি) মাটির ঘরে থাকতে চায় না বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাও। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে আরাম-আয়েশের জন্য মানুষও নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। মানুষ সুশিক্ষিত হচ্ছে। নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করছেন। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে নতুন অনেক কিছু শিখছে।

মাটির তৈরি ঘরের জায়গা দখল করে নিয়েছে ইট-পাথরের তৈরি পাকা ঘর।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব