সন্তান যদি হন বিশ্বসেরা তবে তাঁদের মায়েরা কেন এতটা দায়িত্বহীন?
ঠিক কত টাকার বিনিময়ে বিশ্বসেরা সন্তানের মায়েরা এমন বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছেন?

সম্প্রতি টেলিভিশন এবং ইউটিউবে হরলিক্সের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। সেখানে মডেল হয়েছেন তিনজন মা। সেলিব্রেটি সন্তানের মা হিসেবে তাঁরা তিনজনই বিখ্যাত। তাঁদের সন্তানরা হলেন যথাক্রমে- ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, পাইলট তানিয়া রেজা এবং দাবাড়ে জিয়াউর রহমান। বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, তাঁরা নির্দ্বিধায় বলছেন, সন্তানের ভালো কিছু করার জন্য সবার আগে চাই- সেরা পুষ্টি। আর সেই পুষ্টির জোগানদাতা হিসেবে তাঁদের তিনজনেরই আস্থা হরলিক্সের প্রতি।

অর্থাৎ তাঁরা বলছেন, ছোটবেলায় তাঁদের সন্তানেরা রোজ নিয়ম করে হরলিক্স খেয়েছেন। বিজ্ঞাপনটির মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে কোম্পানি। যা কিনা এই বিজ্ঞাপনের টার্গেট পয়েন্ট বা মূল বিষয়। সেটা হলো, হরলিক্স খাওয়ার কারণেই তাঁদের সন্তানরা মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত হতে পেরেছেন। সক্ষম হয়েছেন চ্যালেঞ্জ নিতে এবং স্বপ্ন পূরণ করতে।

বিজ্ঞাপনটি দেখে নিজের সন্তানকে হরলিক্স কিনে দিতে না পারার কারণে কোনো গরিব মায়ের মনে আফসোস তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, স্বচ্ছল মায়েরাও তাঁদের সন্তানদের মস্তিস্কের শক্তি বর্ধনের জন্য হরলিক্সকে খাবার তালিকার প্রথম সারিতে রাখতে পারেন। কিন্তু হরহামেশাই দেখা যায়, অনেক গরিব মায়ের সন্তান হরলিক্স ছাড়াই পরিণত বয়সে দেশ বরেণ্য হয়েছেন এবং অবিরত হয়ে চলেছেন। ফলে কোম্পানি তাদের বিতর্কিত পণ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর জন্য আরোপিত ও চটকদার এই বিজ্ঞাপন প্রচার করে প্রকারন্তরে খ্যাতিমান ও সেলিব্রেটি তিনজন মাকে তাদের ব্যবসায়িক ফাঁদে ফেলেছে। অথবা সেলিব্রেটি সন্তানের মায়েরা বিচার-বিবেচনা না-করেই মোটা অংকের টাকার কাছে নিজেদের দায়বদ্ধতা ও কাণ্ডজ্ঞান বিকিয়েছেন।

হরলিক্সের উপকার বা অপকার নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কম-বেশি সবাই জানেন। তারপরও দুয়েকটি তথ্য দেওয়া হলো:
ক. বিএসটিআই অনুমোদন নেই এই পণ্যটির।
খ. কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে লেভেলিং নীতিমালা ভঙ্গ করে মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রচারের। সেকারণে ২০১৮ সালে এই কোম্পানির নামে মামলাও হয়েছিল। মামলাটি করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রসিকিউটিং অফিসার।
কিন্তু কোনোকিছুতেই থেমে থাকে নি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের (জিএসকে) কোম্পানিটির কার্যক্রম। এই বাস্তবতায় সেলিব্রেটি সন্তানের মায়েদের হরলিক্সের বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক ও হতাশাব্যঞ্জক।

ডাক্তাররা বলছেন, কোনো সহায়ক খাবার (সাপলিমেন্টারি) ছাড়াই নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেলেই সন্তানের বেড়ে ওঠা নিশ্চিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে প্রকৃত পুষ্টি বিষয়ক কোনো প্রচারণায় তথা- সমাজ সেবা বা গণসচেতনতামূলক কোনো বিজ্ঞাপনে তাঁদের অংশগ্রহণ আমাদেরকে অনেক বেশি আশান্বিত করতে পারতো।

হরলিক্স একটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয় খাবার। বাচ্চারা একবার হরলিক্স খেলে এর স্বাদের কারণে দ্বিতীয়বার খেতে চায়। এটাই মূলত হরলিক্সের প্রধান গুণ। একে উপজীব্য করে কোম্পানি চটকদার বিজ্ঞাপন তৈরি করে থাকে। ফলস্বরূপ এর বেচাবিক্রি হয় ভালো। দামও আকাশচুম্বী। বিজ্ঞাপনে আকাশ-কুসুম চিন্তার প্রকাশ প্রায়ই হয়ে থাকে। আমরা তা অনায়াসে মেনে নিতেও পারি। কেননা দর্শক-শ্রোতা হিসেবে আমরা বিজ্ঞাপিত বিষয় থেকে নিজেদের মতো গ্রহণ-বর্জন করে নিতে পারি। কিন্তু দেশ বরেণ্য ব্যক্তিত্বের মায়েরা যখন হরলিক্সের সাফাই গাইছেন, প্রকারন্তরে বলছেন, হরলিক্স খেয়েই তাঁদের সন্তানেরা বিশ্বসেরা হয়েছেন, তখন খটকা লাগে। ভীষণ হতাশ হতে হয়।

কোম্পানি তাদের ব্যবসার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে সেই বিজ্ঞাপনে সাকিব-জিয়াদের মা মডেল হবেন কেন? কেন তাঁদেরকে হরলিক্সের সাফাই গাইতে হবে? শিশুখাদ্য এবং আর দশটি পণ্যের বিজ্ঞাপন একরকম বিষয় নয়। শিশুখাদ্য বলে এটি অধিকতর স্পর্শকাতর। ফলে মায়েদের আরো সাবধানী হওয়া দরকার বলে মনে করি।
আমরা আশা করি বিখ্যাত মা হিসেবে তাঁরা মডেল হবেন সেইসব বিজ্ঞাপনে যার মাধ্যমে দেশ ও জাতি উপকৃত হয়। শিশু-কিশোরদের মানস গঠনে সহায়ক হয়- এমন বক্তব্য নিয়েই তাঁরা মিডিয়ার সামনে হাজির হবেন। কোনো বিতর্কিত পণ্যের প্রতি তাঁদের অবস্থান নেওয়া মানে নীতি বিসর্জন দেওয়া এবং অর্থের প্রতি লোভ প্রকাশ। এটি মোটেও কাম্য নয়।

লেখক: মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ
নাট্যকার, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী