লিচু। ছবি : সংগৃহীত

দিনাজপুর জেলা ইতোমধ্যে লিচুর জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। চলতি মৌসুমে লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষীরা। এখানকার প্রতিটি লিচু গাছে এখন শোভা পাচ্ছে থোকায় থোকায় মুকুল। ইতোমধ্যে এ জেলার লিচু বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

এ জেলায় চাষ হওয়া লিচুর মাঝে রয়েছে চায়না থ্রি, চায়না ফোর, বেদেনা, বোম্বাই ও মাদ্রাজি উল্লেখযোগ্য।

জেলার সদর উপজেলার আউলিয়াপুর, মাসিমপুর, পুলহাট, সিকদারগঞ্জ, মহব্বতপুর, উলিপুর, খানপুর এলাকায় ঐতিহ্যবাহী বেদেনা লিচু চাষ উল্লেখযোগ্য।

এই এলাকার মাটির কারণেই উৎপাদিত বেদেনা লিচু সুস্বাদু এবং উন্নত মানের হয়ে থাকে। অন্য এলাকার বেদেনা লিচুর চেয়ে এই এলাকার বেদেনা লিচু সকল ধরনের গ্রাহকের নিকট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

হাইব্রিড জাতের লিচু চায়না টু, চায়না থ্রি, চায়না ফোর সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, বিরল, বোচাগঞ্জ, বীরগঞ্জ, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ীসহ জেলার ১৩ উপজেলাতেই ব্যাপকহারে বাগান গড়ে উঠেছে।

দিনাজপুর হর্টিকালচার বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ প্রদীপ কুমার গুহ জানান, প্রতিবছর এই জেলায় উৎপাদিত লিচু দেশের বিভিন্ন জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তিনি জানান, লিচু লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় প্রতিবছরই জেলাতে লিচু চাষ বেড়েই চলছে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ তহিদুল ইকবাল জানান, চলতি বছর ২০১৯ সালে লিচু চাষের জন্য জমির পরিমাণ ৫ হাজার ৭শ’ ৮১ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৩টি। দিনাজপুরের লিচু সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় সারাদেশব্যাপী এর চাহিদা বেশি।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একজন প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জানান, লিচু চাষে ব্যাঘাত না ঘটার জন্য কৃষি কর্মকর্তারা চাষীদের নিয়মিত পরামর্শ দেন। কোন সময়ে কোন কীটনাশক, বালাইনাশক ব্যবহার করা উচিত তা পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

মাসিমপুর গ্রামের ইমতিয়াজ আহমদ (৫২) নামে এক লিচু চাষী জানান, লিচুর ফুল আসা শুরু করার পর পরিচর্যা শুরু করতে হয়। নিয়মিত স্প্রে ও সেচ দেয়া শুরু হয়েছে। লিচু গাছগুলোতে ফুল আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার লিচু ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেছেন। তারা আগাম লিচু বাগান কিনছেন। তার ৩ একর জমির দুটি লিচু বাগান রয়েছে। ২৯৫ লিচু গাছের মধ্যে ৮২ রয়েছে বেদেনা লিচুর গাছ এবং দেশী ও হাইব্রিড জাতের চায়না থ্রির গাছ রয়েছে ২১৩। এ দুটি বাগান তিনি ১ বছরের জন্য সাড়ে ৯ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। বাগানের বয়স প্রায় ১২ থেকে ১৬ বছর হবে। যত দিন যাবে লিচুর গাছে ফল বেশি ধরবে এবং দামও বাড়তে শুরু করবে। এছাড়াও তার বাড়িতে ৪ লিচুর গাছ রয়েছে এর মধ্যে ১ বেদেনা ও ৩ মাদ্রাজী ও বোম্বে লিচু। এ ৪ গাছের লিচু তার পরিবারের খাওয়া ছাড়াও আত্মীয়-স্বজনকে দেয়া এবং বিক্রি করা যায়।

বিরল উপজেলার বটেরহাট গ্রামের লিচু বাগানের মালিক দৌলত তালুকদার জানান, এবারে যে পরিমাণ ফুল আসতে শুরু করেছে, তাতে করে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার লিচুর ফলন হবে। তার দেড় একর জমিতে চায়না থ্রি লিচু বাগান রয়েছে। তার বাগানে ১৫২ গাছ রয়েছে। চলতি বছর ফেনী জেলার ব্যবসায়ী সারওয়ার জাহান ৩ লাখ টাকায় বাগানটি কিনেছেন। বাগানের লিচুর গাছের বয়স ১৫ বছর হতে চলছে। তার এলাকায় আরো ২০ বাগানে বাম্পার লিচু ফলন হয়েছে।

দিনাজপুর জেলা কৃষি অধিদফতরের ফল বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম জানান, দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ বেদেনা লিচু সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ব্যাপকভাবে হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আউলিয়াপুর ইউনিয়নে কসবা, উলিপুর, মাসিমপুর, খানপুর, দাইনুর, মহদেবপুর, রসুলপুর, চেরাডাঙ্গী, শিকদারহাট এসব এলাকায় বেদেনা লিচুর জন্য প্রসিদ্ধ।

দিনাজপুরের প্রধান লিচু বাজার হচ্ছে পৌরসভার নিউ মার্কেট। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৬০টি মোকামে লিচু বিক্রি হয়ে থাকে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনাজপুরের প্রতিটি বাড়ির বসতভিটায় বা আঙ্গিনার লিচু গাছে মুকুল বের হয়েছে। লিচু গাছের মুকুলের সঙ্গে সঙ্গে ফুলে ফুলে মৌমাছির গুঞ্জন আর ঝি ঝি পোকার ঝি ঝি শব্দে এলাকা মুখরিত হয়ে উঠেছে।

আজকের পত্রিকা/এমএআর শায়েল