শুরুতে বাকল্যান্ড বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌরসভার উপর অর্পিত হলেও ১৯৬৩ সালে দায়িত্ব হস্তান্তরিত হয়ে তা অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত হয়। ছবি : সংগৃহীত

আহসান মঞ্জিল, রূপলাল হাউজ, নর্থব্রুক হল, করোনেশন পার্ক, লেডিস পার্কের মতো রাজকীয় স্থাপনাগুলো বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড়ে গড়ে উঠেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। সুরম্য এই স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করতো নিঃসন্দেহে।

জেমস টেইলর তার ‘অ্যা স্কেচ অব দ্য টোপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স অব ঢাকা’ (১৮৪০) গ্রন্থে এই দৃশ্যপটকে প্রাচ্যের ভেনিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আজকের মৃতপায় সেই বুড়িগঙ্গা ছিল বিশাল—যেমনি দৈর্ঘ্যে, তেমনি প্রস্থে।

‘প্যানোরমা অব ঢাকা, ১৮৪০’-এর ছবিগুলোতে তা মূর্ত হয়ে উঠেছে। রেনেলের তথ্য মোতাবেক, ১৭৬৫ সালে বুড়িগঙ্গার ধার ঘেঁষে উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে চার মাইল প্রশস্ত একটা লম্বা বাঁধ ছিল। কিন্তু কালক্রমে সেই বাঁধের অনেক স্থানই ক্ষয়ে যায়।

প্রতিবছরই সেখান দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করতো। এই প্রসঙ্গে শরীফ উদ্দিন আহমেদ তার ‘ঢাকা ইতিহাস ও নগর জীবন ১৮৪০-১৯২১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘নদীর তীরকে প্লাবণ ও ক্ষয় থেকে রক্ষা, ভাটার সময় নদীর পাড়ে কাদার ঢিবি গড়ে উঠাকে প্রতিহত এবং নদীর ঘাটে মালবাহী নৌকা বা জাহাজ ও যাত্রী চলাচলের সুবিধার জন্য ঢাকার কমিশনার সি টি বাকল্যান্ড ১৮৬৪ সালে শহরের দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে একটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেন।

নদীর সামনের অংশকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার উদ্দেশ্যে এবং অধিবাসীদের সকাল ও বিকেলের বেড়ানোকে আকর্ষণীয় করে তুলতে তিনি বাঁধের ওপর একটি বেড়ানোর পথ নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেন।’

পৌরসভার আর্থিক অবস্থা তখন ভালো ছিল না। তাই জনগণের অনুদানের ভিত্তিতে তিনি বাকল্যান্ড বাঁধটি নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন। মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ গ্রন্থে তৎকালীন পত্রিকা থেকে এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ উদ্ধৃত করেছেন—‘বকলন্ডস রোড ঢাকার নিকটবর্ত্তিনী বুড়ীগঙ্গার উত্তর তটস্থিত উল্লিখিত নামের পাকা রাস্তাটির কার্য অদ্যাপি সম্পন্ন হয় নাই।

শ্রীযুক্ত কালী নারায়ণ রায় বাহাদুর, শ্রীযুক্ত জগন্নাথ রায় চৌধুরী এবং শ্রীযুক্ত মোহিনী মোহন দাস প্রমুখের নিকট হইতে ৬৫০০০ (পয়ষট্টি সহস্র) টাকা সংগ্রহ করেন।…’

স্বেচ্ছাদানের মাধ্যমে নদীর পাড়ের বাড়িগুলোর সামনের জায়গাটুকু পাওয়া গিয়েছিল। প্রথমে কাউকে কাউকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে সবাই এই প্রস্তাবে রাজী হন।


বাঁধটি দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় এক মাইল। বাকল্যান্ডের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হয়েছিল বলে এটিকে ‘বাকল্যান্ড বাঁধ’ নাম দেয়া হয়। ছবি : সংগৃহীত

বাকল্যান্ড বাঁধ নির্মিত হওয়ার পর এবড়ো থেবড়ো ক্ষণভঙ্গুর নদী তীর সুশ্রী সরল রূপ ধারণ করে। বাঁধটির সম্মুখভাগ পাথর দিয়ে বাঁধানো হয় ও উপরিভাগে ইট বসিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। সদরঘাটের কাছে বাঁধের বেশ কিছুটা অংশ পাথর দিয়ে বাঁধাই না করে খালি রাখা হয়, যেখানে পরবর্তীতে ঘাস লাগিয়ে সবুজ চত্বর তৈরি করা হয়।

এ চত্বরে একটি ছোট পার্কও বানানো হয়, যার অভ্যন্তরে স্থায়ীভাবে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। এ মঞ্চে উচ্চপদস্থ ও সম্মানিত অভ্যাগতদের স্টিমার থেকে নামার পর অভ্যর্থনা জানান হত এবং সেখানে প্রতিদিন বিকেল বেলা সমাগত জনতার চিত্তবিনোদনের জন্য স্থানীয় রেজিমেন্টের সদস্যরা ব্যান্ড বাজাতো।

বাকল্যান্ডের দায়িত্বকাল ছিল প্রায় পাঁচ বছর। পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ধরে বিক্ষিপ্তভাবে বাঁধের কাজ চলতে থাকে। ১৮৭০-এর দশকে খাজা আবদুল গণি পশ্চিম দিকে ওয়াইজ ঘাট থেকে বাদামতলী ঘাট পর্যন্ত এবং ১৮৮০’র দশকে রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস পূর্ব দিকে নর্থব্রুক হল ঘাটের কাছ থেকে সবজিমহলে তাদের বাড়ির কাছ পর্যন্ত এই বাঁধের সম্প্রসারণ করেন।

বাঁধটি দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় এক মাইল। বাকল্যান্ডের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হয়েছিল বলে এটিকে ‘বাকল্যান্ড বাঁধ’ নাম দেয়া

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণায় ঐতিহাসিক এই বাঁধ সম্পর্কে চমৎকার সব তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক আজিম বখশ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে পুরো বাকল্যান্ড বাঁধ পানি দিয়ে ধোয়া হত। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জমায়েত হত এখানে।’

ব্লগার আবু রেজা ‘বায়স্কোপের নেশা আমার ছাড়ে না’ নিবন্ধে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন— শৈশব-কৈশোরের বায়স্কোপওয়ালা ‘আলী জান’ বায়স্কোপে গল্প, গান ও বর্ণনার মাধ্যমে লোককাহিনী, ঐতিহাসিক ঘটনা ও স্থানের বিবরণ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও নিজ শহর ঢাকার বিবরণ উপস্থাপন করতেন। মধ্যবিরতির পর আলীজান প্রিয় শহর ঢাকাকে দেখাতেন আর ছন্দের তালে তালে গাইতেন-

‘এই কি চমৎকার দেখা গেলো
কি চমৎকার
কি চমৎকার দেখা যায়, ভাই।
আরে আচানক ভাই, একি হইলো!
ঢাকা শহর আইয়া গেলো।
ঐ দেখো ভাই মীর জুমলার কামান,
আরে বুড়িগঙ্গার পিনিস দেখো, বাকল্যান্ডের বাঁধ দেখো
গোবিন্দ দাশ গাইতো যেখায় গান।’

শুরুতে বাকল্যান্ড বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌরসভার উপর অর্পিত হলেও ১৯৬৩ সালে দায়িত্ব হস্তান্তরিত হয়ে তা অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত হয়। ১৯৫৮ সালের ঢাকা সিটির মাস্টার প্ল্যানে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে বাকল্যান্ড বাঁধকে সংরক্ষণের কথা উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে, ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (১৯৯৫-২০১৫) তে তা অনুপস্থিত!

সরকারি উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনায় সুরম্য শহরের অপূর্ব সুন্দর ওয়াটারফ্রন্টটি আজ ময়লার ভাগার। স্থানে স্থানে ঝুপড়ি ঘর আর আর্বজনার স্তুপে বাকল্যান্ড বাঁধ এখন দেখা-ই যায় না। ইংরেজ কর্তা বাকল্যান্ডের শারীরিক প্রয়াণ ঘটলেও, ঢাকাবাসীর মনের মণিকোঠায় তিনি এখনও অম্লান।

প্রায় দেড়শ বছর পর বাকল্যান্ড রূপে বাঙালি আনিসুল হকের আগমণ ঘটলেও আশার প্রদীপ জ্বলে উঠতে না উঠতেই তিনি পরপারের যাত্রী হলেন। এখন, নতুন আনিসুলের আশায় পথ চেয়ে থাকা ছাড়া ঢাকাবাসীর আর গতি কী!

লেখক : হোসাইন মোহাম্মদ জাকি