পবন দাস বাউল। ছবি : সংগৃহীত

পুণ্যাহ বাংলার রাজস্ব আদাযের বার্ষিক বন্দোবস্তের উৎসব। পুণ্যাহ উৎসব প্রায় বিলুপ্ত। পুণ্যাহ ছিলো রাজস্ব আদায় এবং বন্দোবস্ত সংক্রান্ত বিষযের প্রাক-ব্রিটিশ সময়ের পদ্ধতি। যে ব্যবস্থায় সরকার কর্তৃক সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের বছরের নির্দিষ্ট দিনে একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী বছরের রাজস্ব আদায় এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতো। কিন্তু সময়ে পালাবদলে পরিবর্তন হয়েছে নাম। বদলে গেছে আয়োজন।

এক সময় বাংলা নববষের প্রথম দিনটিকে বলা হতো পুণ্যাহ। যার অর্থ কমদ্বারা উদযাবনী দিন। বলা যায়, বাংলার রাজস্ব আদায়ের বাষিক বন্দোবস্তের উৎসব। তবে রাজস্ব বন্দোবস্ত ও আাদায় সংক্রান্ত বিষয়ে পুণ্যাহ ছিল প্রাক-বিটিশ ব্যবস্থা। সে আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবতনের পর বাংলা নববষের প্রথম দিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খাজনা আদায় শুরু হয়।

সরকার সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার, এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদেরকে আামন্ত্রণ জানানো হতো পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে। সে অনুষ্ঠানের সেরেস্তায় বা খাজনা আদায়ের নিধারিত দরবারে নায়েব তহসিলদারকে পূবের রাজস্ব পরিশোধ করে নতুনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। আর সে দরবার পরিচালনা করতেন নওয়াবগণ। তবে যারা নওয়াবদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন তাদেরকে নওয়াব সন্মানসূচক খিলাত বা পোশাক দিতেন। এইভাবে জমিদারগণ ও অন্যান্য ভূস্বামীগণ তাদের রায়ত বা প্রজাবর্গকে নিযে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান পালন করতেন।

রায়তগণ জমিদারের কাঁচারিতে একত্রিত হয়ে জমিদার অথবা তার নাযেবের নিকট থেকে পান বা পানপাতা গ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে নৃত্য, সঙ্গীত, যাত্রা, মেলা, গবাদি পশুর দৌঁড়, মোরগযুদ্ধ এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো।

মুগল আমলে পুণ্যাহ উৎসবের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ছিলো না। যখন থেকে এই উৎসব রাজস্ব বন্দোবস্ত এবং রাজস্ব সংগ্রহের সাথে যুক্ত হলো, তখন থেকেই পুণ্যাহ উৎসবের তারিখ নির্ধারিত করা হলো। মূলত প্রধান ফসল তোলার সমযকে সাধারণভাবে এই উৎসবের জন্যে নির্ধারিত করা হতো। এ বিষযে মুর্শিদকুলী খান একটি নতুন রীতি প্রচলন করেন। এই রীতি অনুসারে চৈত্র মাসে ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো। উৎসব শেষে সংগৃহীত রাজস্ব ভারতের দিল্লিতে প্রেরণ করা হতো।

পালাগান। ছবি : সংগৃহীত

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন হ্রাস পেলে পুণ্যাহ উৎসবেই রাজস্ব মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। পুণ্যাহ বলতে সমস্ত রাজস্বের আদায়কে বোঝাত না; অনাদায়কৃত রাজস্ব মওকুফ কিংবা ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত করারর ব্যবস্থাও এই উৎসবে করা হতো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে রায়তগণ বকেয়া রাজস্ব মওকুফ পেতো। এছাড়াও, চাষাবাদের জন্যে তাদেরকে তাকাবি বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হতো, পুণ্যাহ উৎসবে সে সকল ঋণের লেনদেনও সমপন্ন করা হতো।

১৭৬৬ সালে ইংরেজদের দীউয়ানি লাভের পর প্রথম পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মুর্শিদাবাদ কোর্টে ইংরেজদের রাজনৈতিক আবাসস্থল মতিঝিলে। লর্ড ক্লাইভ এ উৎসবের সভাপতিত্ব করেন। তিনি তখন এর প্রতি বিশেষ গুরূত্ব আরোপ করেছিলেন। পক্ষে ছিলেন প্রতিবছর এ উৎসব পালনের। তবে  সরকারকে এ পুণ্যাহ উৎসব পালন না করার নির্দেশ দেন কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স ফোর্ট উইলিয়ম।

প্রধানত দুই ধরনের পুণ্যাহ উৎসবের প্রচলন ছিলো। একটি সদর পুণ্যাহ উৎসব আর অপরটি মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব। সদর পুণ্যাহ উৎসবকে কেন্দ্রীয় পুণ্যাহ বলেও অভিহিত করা হতো। সদর পুণ্যাহ উৎসবে জমিদার এবং আন্যান্য ভূস্বামিগণ বাংলার দীউয়ানের বাসভবনে অংশগ্রহণ করতেন। আর মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হতো জমিদারের কাচারিতে। সেখান থেকেই তারা উৎসব পরিচালনা করেতন।  উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে পুণ্যাহ উৎসব নিয়মিতভাবে পালন হতো প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ১ তারিখে। ১৯৫০ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলোপ সাধনের পর বিলুপ্ত হয়ে যায় পুণ্যাহ উৎসব। কিন্তু কালের বিবতণে পুণ্যাহ উৎসবের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, মেলা, পুতুল নাচসহ বিভিন্ন অনষ্ঠানাদি এখনো উদযাপিত হয়। বাংলা নববষের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করে পুণ্যাহ উৎসব পরিনত হয়েছে বাংলাদেশের সাবজনীন উৎসব।

মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব প্রধানত জমিদারের কাঁচারিতে অনুষ্ঠিত হতো। এ উৎসবে জমিদার এবং প্রজাবর্গের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও, সমস্ত জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত না থাকায় এ রীতি ক্ষীণভাবে প্রচলিত ছিলো। কারণ সমস্ত জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। কিছু শর্তে খাস জমি ইজারদারদেরকে দেওয়া হয়েছিল। খাস জমির বন্দোবস্তের জন্য জোতদার এবং ইজারাদারদের নিয়ে পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো। এরূপ পুণ্যাহ উৎসব পূর্বে যেমন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতো সেভাবে না হয়ে কালেক্টরেট দফ্তরে অনুষ্ঠিত হতো। জমিদারগণ পুণ্যাহ উৎসব চালু রেখেছিল। তারা বরং ব্যাপকভাবেই উৎসব পালন করতেন। ব্যাপকভাবে উৎসব পালন জমিদার ও প্রজাবর্গের মধ্যে স্বাতন্ত্রের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাংলা নববর্ষে নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে পুণ্যাহ উৎসব বর্তমানে পূর্ব বঙ্গে এবং পশ্চিম বঙ্গে জাঁকজমকভাবে পালিত হয়।  

আজকের পত্রিকা/আ.স্ব/