ঘড়ির কাঁটায় সময় ভোর ৫ টা বেজে ৩০ মিনিট প্রতিদিনের মত আব্বুর ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেলো, ‘মুকিত উঠো নামাজ পড়ো।

শীতের সকাল লেপের উষ্ণতা ছেড়ে উঠতে মন চায় না তারপরেও উঠে গিয়ে চট করে ওজু করে ওয়াছেককে ডেকে নিয়ে এক সাথে নামাজ সেরে নিলাম (ওয়াছেক আমার একমাত্র ছোট ভাই) ৷

তারপর বাহির থেকে একটু  হেঁটে এসে পরিবারের সবাই মিলে সকালের নাস্তা সেরে হোটেলে ফিরে এসে দেখি আমাদের গ্রুপের প্রায় সকলের প্রস্তুতি শেষ, আমরাও তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। গন্তব্য বাংলার ভূসর্গ ও প্রকৃতি কন্যা হিসেবে পরিচিত সিলেটের জাফলং। সকাল ৯ টার মধ্যে আমাদের বাস এসে গেলো সকলেই নিজ নিজ সিটে বসে পরলাম।

একটু ঝাকুনি দিয়ে বাসটি আমাদের নিয়ে ছুটে চলল নিজ গন্তব্যের দিকে । যেতে যেতে চোখে পড়লো মেঘের সাথে আলিঙ্গন করে থাকা ভারতের সু-বিশাল পাহাড়। পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হবে সাদা মেঘের ভেতর সবুজের বিচরণ। উঁচু-নীচু রাস্তাকে পেছনে ফেলে ঘড়ির কাঁটায় যখন বেলা ১২ টা তখন আমরা জাফলং এ পৌঁছলাম।

তারপর সবাই মিলে এক সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে জাফলং এর সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়ে পরলাম। সিলেট নগরী থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং এর অবস্থান। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়।

সীমান্তের ওপারে ভারতের বিভিন্ন পাহাড় টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। শীতকালে জাফলং এর রুপ লাবণ্য কিছুটা ভিন্ন হয়ে উঠে। আমরা যেহেতু শীতকালে এসেছি সে জন্য জাফলং এর প্রকৃত সৌন্দর্য না দেখার আক্ষেপ রয়েই গেলো । তারপরেও খাসিয়া পাহাড়ের সবুজ চূড়ায় তুলার মত মেঘমালার বিচরণ দেখে নয়ন যেন জুড়িয়ে গেলো।


জাফলং এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হল জিরো পয়েন্ট। হেঁটেই জিরো পয়েন্টে যাওয়া গেলেও আমরা আনন্দটা একটু বেশি স্বরণীয় করতে ছোট একটি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে জিরো পয়েন্টে গেলাম। এই পয়েন্টে খুব কাছে থেকে দেখা যায় খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়। স্বচ্ছ পানি এবং পাথর বিছানো নদী দেখে একবারের জন্য হলেও সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমার কথা মনে পড়বে।

জিরো পয়েন্ট থেকে দেখা যায় দুই পাহাড়ের সংযোগ স্থাপনকারী ঝুলন্ত ব্রিজ যার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির নদী। নদীতে মুক্তার দানার মত সাদা পাথর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ জিরো পয়েন্টে থেকে সাখাওয়াত স্যার আমাদের নিয়ে খাসিয়া পল্লীতে যেতে চাইলেন আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। বালির বিশাল চরে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছলাম খাসিয়া জনগোষ্ঠীর পল্লীতে।

জাফলং এ গিয়ে খাসিয়া পল্লী না গেলে ভ্রমণ একদম অপূর্ণ থেকে যায়। খাসিয়াদের বাড়ি গুলো একটু আলাদা, মাটি থেকে বেশ খানিকটা উপরে। খাসিয়া সমাজে নারীরা সমাজের প্রধান হয়ে থাকে, আর তাই কিছু জায়গায় খাসিয়া মেয়েদের দেখলাম পান-সুপারি বাগানে কাজ করছে।

এ ছাড়াও খাসিয়া পল্লীতে রয়েছে চা বাগান, খাসিয়া রাজার বাড়ি, সুপারি গাছে লাগানো পানের বাগান ও ঝর্ণা। পানি না থাকায় আমরা ঝর্ণা দেখতে পারিনি। খাসিয়া রাজার বিশাল বাড়ি দেখে নদী পার হয়ে আমরা ভারতীয় পন্যের বাজারে গেলাম। সেখানে যে কোন ভারতীয় পন্য স্বল্প মূল্যে পাওয়া যায়। আম্মু অনেক কিছু কিনে ফেললেন। ততক্ষণে সন্ধা নেমে এসেছে, আমরা বাসে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বাসটি আমাদের নিয়ে ছুটে চলল।

আব্দুল্লাহ আল মুকিত , শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়-কুষ্টিয়া।