বর্ষাকালে পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করুন। ছবি : সংগৃহীত

বর্ষার এই সময়টা আমাদের জন্যে এক দিক থেকে একটি আশীর্বাদ। যেহেতু গ্রীষ্মের উত্তাপ মুছে দিতে একটি মেঘাচ্ছন বৃষ্টির দিনের থেকে সুন্দর বিকল্প হতে পারে না। আবার বৃষ্টি ঋতুতে অতিরিক্ত আদ্রতা থাকায় বেশ কিছু শারীরিক ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ এসময় বিভিন্ন প্রকার ব্যাকটেরিয়া এবং প্যাথোজেনের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। এছাড়া মৌসুমি ঋতুতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা, বন্যা ইত্যাদি কারণে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রকটতা বাড়তে থাকে।

পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায় এসময় অনেকেই প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিকস ব্যবহার করে থাকে। বেশির ভাগ মানুষ এক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই কাজটি করেন। যাইহোক, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার আমাদের শরীরকে অন্যান্য রোগের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এটি শরীরের সহায়ক ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং সামগ্রিক জনসংখ্যার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স বেড়ে যেতে থাকে। যদি সঠিক পরিমাণে এবং পর্যাপ্ত সময় ধরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা হয় তাহলে ব্যাক্টেরিয়াগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয় না এবং বেঁচে যাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে এই ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে উক্ত অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। এ অবস্থাকেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।

বর্ষার সময় তাই পানিবাহিত রোগগুলো শনাক্ত করে তা নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া ও সচেতন হওয়া জরুরী। নিম্নে প্রতিরোধ করার কিছু সহজ টিপস সহ কিছু পানিবাহিত রোগের একটি তালিকা উল্লেখ করা হলো।

টাইফয়েড

টাইফয়েড জ্বর বাংলাদেশে খুবই সচরাচর একটি রোগ। টাইফয়েড জ্বর স্যালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমণে হয়ে থাকে। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে প্রধানত দেহে এই জীবাণু ছড়ায়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার লোকজনের টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তস্রোতে ও অন্ত্রনালীতে এই ব্যাটটেরিয়া অবস্থান করে এবং দুষিত খাবার ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিযা দেহে প্রবেশ করা জীবাণুগুলো গুণিতক আকারে বেড়ে গিয়ে রক্তস্রোতে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিরোধ

টাইফয়েড থেকে দূরে থাকতে পরিস্কার এবং ফোটানো পানি পান করুন। রাস্তার পার্শ্বস্থ দোকানের খাবার গ্রহণ এবং পানি পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। টয়লেট সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুকে পরিষ্কার করার পূর্বে, খাবার প্রস্তুত বা পরিবেশন করার পূর্বে, নিজে খাওয়ার পূর্বে বা শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে সাবান দিয়ে ভালো ভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

কলেরা

বর্ষার সময় সহজে ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক রোগগুলোর একটি হচ্ছে কলেরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত খাবার এবং পানি হচ্ছে কলেরা রোগের প্রধান কারণ। কলেরা রোগের লক্ষণ হলো, গুরুতর ডায়রিয়া ও বমি হওয়া যার ফলে শরীরে প্রচুর পরিমাণে ডিহাইড্রেশন হয়। তাই কলেরা হলে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে কারণ এটি মাত্র ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আপনাকে মেরে ফেলতে সক্ষম।

প্রতিরোধ

বিশুদ্ধ পানীয় পান করা, পরিস্কার পরিবেশ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিয়মিত হাত ধৌত করা এসবের মাধ্যমে কলেরা প্রতিরোধ করা যেতে পারে। এ ছাড়া সংক্রামিত ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলুন। গুরুতর ক্ষেত্রে, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা।

জন্ডিস

শরীরের ত্বক, মিউকাস মেমেব্রেণ এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়াকে সাধারণত জন্ডিস বলে। দূষিত পানি পানের ফলে জন্ডিস রোগ হয়। প্রতিদিন আমাদের শরীরে সর্বনিন্ম ১% পুরনো লোহিত কণিকার স্থলে নতুন লোহিত রক্ত কণিকা স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। আমাদের শরীরের পুরনো লোহিত রক্ত কণিকা গুলো সবসময় বিলিরুবিন উৎপন্ন করে, যা সাধারণভাবে পায়খানার মাধ্যমে আমাদের শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

যদি কোনো কারণে শরীর থেকে এই বিলিরুবিন না বের হতে পারে তাহলে অধিক বিলিরুবিনের জন্য জন্ডিস হয়। বিলিরুবিনের কারণে শরীরের ত্বক, চোখ ইত্যাদি হলদে ভাব হয়ে যায়।

প্রতিরোধ

জন্ডিসের প্রতিরোধ সবক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে কয়েকটি প্রধান সতর্কতা রয়েছে যা জন্ডিসের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। সুস্থ অভ্যাস বজায় রাখুন, হেপাটাইটিস এ বা বি সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকা দিন এবং দূষিত জায়গা থেকে খাদ্যগ্রহণ বা পানীয় পান করা এড়িয়ে চলুন।

বর্ষা মৌসুমে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্য টিপস

১) বাইরের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন

২) ছত্রাক সংক্রমণ এড়াতে শুকনো পোশাক পরিধান করুন

৩) বেশি ভিড় থাকে এমন জায়গায় থেকে যতটা সম্ভব বিরত থাকুন

৪) হাঁচি, কাশি দেওয়ার সময় একটি পরিস্কার রুমাল ব্যবহার করুন

৫) ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার পূর্বে কিংবা খাদ্যগ্রহণের পূর্বে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।

৬) প্রচুর পানি পান করুন এবং রান্নায় ব্যবহৃত পানির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করুন

৭) পানিবাহিত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে অবশ্যই ফোটানো উষ্ণ পানি পান করুন

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/