বরগুনা জেলা পরিষদ কাজ না করিয়ে লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়ে গেছে একটি চক্র

বরগুনা জেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও রাজস্ব খাতের বরাদ্দে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে কাজ না করিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলা পরিষদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রকল্প কমিটিতে প্রকল্প চেয়ারম্যান (সিপিপিসি) করে বিভিন্ন কৌশলে জেলা পরিষদের একটি চক্র এসব টাকা তুলে নিচ্ছেন ।

বরগুনা জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, জেলা পরিষদ কার্যালয়ের ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের এডিপি এবং রাজস্ব তহবিলের আওতায় দুই অর্থ বছরে ৮শত২০টি বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহন করা হয়।

বরগুনা জেলা পরিষদের ২০১৬-২০১৭ ও ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৪টি ধাপে এডিপি ও রাজস্ব খাত থেকে ফুলের বাগান ও বাগানের উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

গত ১২অক্টোবর বরগুনা জেলা পরিষদেও কার্যালয়ের চত্তরে গিয়ে দেখা যায় কোন ফুলের বাগান নেই। জেলা পরিষদে গেটের পাশেই সাইনবোর্ডে লেখা শুধু ফুলের বাগান। খরচের খাতে সদর ডাকবাংলোয় যে ফুলের বাগান দেখানো হয়েছে তারও নেই কোন অস্তিত্ব।

গত ২১ অক্টোবর রাতে জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা তড়িগড়ি করে জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে ফুলগাছ লাগিয়ে রাখেন।

জেলা সদর ডাকবাংলোতে ২৫নভেম্বর তড়িঘড়ি করে ফুলের গাছ লাগিয়ে দেন।

বরগুনা জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০১৬-১০১৭ অর্থবছরে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে জনসাধারনের বসার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সেড নির্মান করেছে জেলা পরিষদ এমন তথ্য রয়েছে জেলা পরিষদের খরচের খাতে। তবে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন্। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কোন পাশেই নির্মাণ করা হয়নি সেড।

এদিকে জেলা পরিষদের আয়ের খাত বাড়াতে পাথরঘাটা উপজেলার সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের পাশে ডাক বাংলো নির্মানের নামে এডিপি খাত থেকে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা খরচ দেখিয়েছে জেলা পরিষদ। যার কোন অস্তিত্বই নেই। একই স্থানে একই অর্থবছরে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় জেলা পরিষদের নিজস্ব জমিতে দ্বিতল বিশিষ্ট একটি আধূনিক ডাকবাংলো নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়।

এই কাজের দরপত্র আহবান করায় ২০১৭সালের২১ সেপ্টেম্বর। এ কাজটি পায় পটুয়াখালির মের্সাস আবুল কালাম আজাদ। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই একই প্রকল্প এডিপি(সাধারণ) তহবিলের আওতায় পাথরঘাটা আধুনিক ডাকবাংলো মেরামত করণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়। যার বরাদ্ধ দেওয়া হয় পাঁচলক্ষ টাকা। কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৮সালের ২২মার্চ । কাজটি পায় বরগুনা সদরের মের্সাস ছগির ট্রের্ডাস। পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা রাসেল বলেন,এই ভবনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাহলে কিভাবে এটি মেরামত করে। এটি বড় ধরণের দূর্নীতি।

২০১৫-১৬ অর্থ বছরে উন্নয়ন সহায়তায় থোক বরাদ্ধের বিভাজন অনুযায়ী অনগ্রসর এলাকা হিসেবে প্রাপ্ত অর্থে গৃহীত প্রকল্পের আওতায় ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে (এডিপি-০২) আমতলী উপজেলা সদরে হাসপাতালের সম্মুখে জেলা পরিষদের ০২টি মার্কেটের ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়। এই প্রকল্পের কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৮সালের ৪জুন।

এ কাজের বরাদ্ধ ধরা হয়েছে পাঁচলক্ষ ২৫হাজার টাকা। কাজটি পায় বরগুনা সদরের মের্সাস মোহনা এন্টারপ্রাইজ।

ওই মার্কেট ঘুরে দেখা যায়,হাসপাতালের সামনের দুইটি মার্কেটের সামনে কোন ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। ওই মার্কেটের ব্যবসায়ী লালন বলেন, মার্কেটের সামনে কোন ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এডিপি (সাধারণ) তহবিলের আওতায় দরপত্রের মাধ্যমে বরগুনা সদর উপজেলা দক্ষিন বরগুনা আবুল হোসাইনিয়া জামে মসজিদ সংলগ্ন ঘাটলা নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়। কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৮সালের ৪জুন।

কাজটি পায় বামনা উপজেলার মের্সাস সততা এন্টারপ্রাইজ। মসজিদ কমিটির সভাপতি শাহে আলম বলেন,আমাদের মসজিদ সংলগ্ন কোন ঘাটলা নির্মাণ করা হয়নি।

বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া মাছুয়াখালী বাজার জামে মসজিদের ঘাটলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ব্রীজ থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত ইটের সলিং রাস্তার নামে ২ লাখ টাকা খরচ করেছে জেলা পরিষদ। তবে ঘাটলা নির্মান করলেও রাস্তার যেমন মাটির ছিল তেমন মাটিরই আছে। একটি ইটের ছোয়াও লাগেনি রাস্তায়।

মোকামিয়া ইউনিয়নের আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য নাসির হোসেন মারুফ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ব্রীজ থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত ইটের কোন সলিং কাজ করায়নি জেলা পরিষদ।

২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রাজস্ব তহবিলের আওতায় দরপত্রের মাধ্যমে বরগুনা জেলা পরিষদেও অফিসের কাজের জন্য জেনারেটর সংগ্রহ ও কমিশনিং। কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারী। কাজটি পায় মাগুরা জেলার মের্সাস আনিসা এন্টারপ্রাইজ।

এই কাজের বরাদ্ধ ধরা হয়েছে পাঁচলক্ষ টাকা। আবার একই ২০১৭-১৮অর্থবছরে এডিপি-তহবিলের আওতায় বরগুনা জেলা পরিষদেও অফিসের কাজের জন্য জেনারেটর সংগ্রহ ও কমিশনিং।

কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৯ সালের ১৩জানুয়ারী। কাজটি পায় মাগুরা জেলার মের্সাস আনিসা এন্টারপ্রাইজ। কাজের বরাদ্ধ ধরা হয়েছে আট লক্ষ টাকা। দুইটি প্রকল্প দেখালেও জেনারেটর সংগ্রহ করা হয়েছে একটি।

২০১৬-১৭ অর্থ বছওে আরএডিপি তহবিলের আওতায় বরগুনা জেলা বেতাগী উপজেলায় জেলা পরিষদেও নিজস্ব জমিতে দ্বিতল বিশিষ্ট একটি আধুনিক ডাকবাংলো নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়। এই কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। এই কাজটি পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মের্সাস আল-মামুন এন্টারপ্রাইজ।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে রাজস্ব তহবিলের আওতায় কোটেশনের মাধ্যমে বেতাগী উপজেলা সদরে আধুনিক ডাকবাংলোর সম্মুখস্থ স্থানের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প গ্রহন করা হয়। কাজের দরপত্র আহবান করা হয় ২০১৮ সালের ২৭মার্চ। কাজটি পায় বরগুনা সদরের মের্সাস বিসমিল্লাহ কনস্ট্রাকশন।

কাজের জন্য বরাদ্ধ ধরা হয়েছে পাঁচলক্ষ টাকা।

সরেজমিন গিয়ে সেখানে দেখা যায় কোন জলাবদ্ধতা নিরসনে কোন কাজ হয়নি। ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের হিসেবও অনেকটা একই রকম।

পাথরঘাটা আধুনিক ডাকবাংলো নির্মান কাজ শেষ না হবার আগেই মেরামত কিভাবে করলেন এমন প্রশ্ন করলে সহকারি প্রকৌশলী শহীদুল আলম বলেন, অফিসের কাজপত্র না দেখে তিনি কিছু বলতে পারবেনা।

বরগুনা জেলা পরিষদের সদস্য নাহিদ এম হোসেন লিটু বলেন,যেসব জায়গায় কাজ হয়েছে তাও হয়েছে নিম্নমানের। যা নির্মাণ কাজ শেষ হবার সাথে সাথেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পরছে। তিনি আরও বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

একই প্রকল্প ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে উনśয়নে ব্যয় দেখিয়েছে যা অকল্পনীয়। জেলা পরিষদের এমন কর্মকান্ডকে চড়ম অনিয়ম ।

বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। পরে বলেন প্রধান নির্বাহী ও সহকারী প্রকৌশলী এসব বিষয়ে বলতে পারবে। তবে তিনি আরও বলেন, ইটের সলিং রাস্তার কাজ জেলা পরিষদ কখনো করেনা।

-মিজানুর রহমান/বরগুনা