খেয়া নৌকা। প্রতীকী ছবি

বরগুনায় নদী পথে ১৮টি স্থানে খেয়া পারাপারে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী জনপ্রতি ১০ টাকা করে খেয়া ভাড়া নেয়ার কথা থাকলেও নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা।

এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ পারাপার হয়ে জেলা শহরে আসে। বছরের পাঁচ মাস পরে এসব পথে খেয়া পারাপারে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে ইজারাদাররা। ইজারাদারদের দাবী জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ তাদের ভাড়া বাড়ানোর কথা বলেছে।

বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক এসব খেয়াঘাটের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

তিন বছর পরপর এই ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও আমরা কয়েক বছর ধরে সেটা করেনি। ভাড়া বৃদ্ধিতে আমাদের কোনো হাত নেই। বছর শুরুর ৫ মাস পরে আবার ভাড়া বাড়ানো বিষয়ে তিনি বলেন ইজারাদাররা যাত্রীপ্রতি ১৫ টাকা আদায়ের শর্তে তারা এই খেয়াঘাট ইজারা নিয়েছেন।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নিয়ম অনুসারে নদী পথের খেয়াঘাট গুলোতে যাত্রী বাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। সকল সরকারি নিয়ম নীতির মাধ্যমে এটা করা হয়েছে।এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতি তিন বছর পরপর ভাড়া বৃদ্ধির নিয়ম আছে। এটা সেই প্রক্রিয়ার অংশ।

খোজ নিয়ে জানা গেছে ১৪২৬ বাংলা বছরে জন্য বরগুনা জেলা পরিষদ থেকে নদী পথে ১৮টি স্থানে খেয়াঘাটের ইজারার জন্য দরপত্র আহবান করা হয়।

দরপত্রের শর্ত অনুসারে ১৪২৬ বাংলা বছরের জন্য প্রতিটি খেয়া ঘাটে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ভাড়া নেওয়া হবে এই শর্তে ইজারাদারা দরপত্র জমা দেন। সেই শর্ত অনুযায়ী ইজারাদারদের ঘাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়।

তবে ইজারাদারা বলেন যাত্রীপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া আদায়ের শর্তে জেলা পরিষদ থেকে আমাদের এই ঘাট গুলো ইজারা দেয়া হয়।যাত্রীপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া আদায় করলে আমাদের লোকসান হয়।তাই জেলা পরিষদ থেকে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

বরগুনা জেলা পরিষদের ইজারা শাখা সুত্রে জানা গেছে,জেলায় ছয়টি উপজেলা ১৮টি খেয়াঘাট রয়েছে। এর মধ্যে বেতাগী উপজেলা ছাড়া জেলা সদর সঙ্গে অন্য উপজেলাগুলোর নদী পথে যাতায়াতের করতে হয়।

এগুলো হলো পুরাকাটা–আমতলী, বড়ইতলা – বাইনচকি ,গোলবুনিয়া–পচাকোড়ালিয়া,চালিতাতলী-বগী,আয়লা-গুলিশাখালী,লবণগোলা-বালিয়াতলী,তালতলী-বালিয়াতলী, লতাকাটা বাইনসমথ- নকরী, নিশানবাড়িয়া- পাথরঘাটা, কালমেঘা- বান্দার গাছিয়া, কাকচিড়া– গুলিশা খালী, বড়াইতলা –বাইনচকি, ফুলঝুরি – রামনা স্লুইজ, বদনী খালী- বামনা,অযোদ্বা-দক্ষিণ কালিকাবাড়ি, বেতাগির সৌজালিয়া ও বেতাগি – কচুয়া খেয়াঘাটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা ভাড়া আদায় করছেন ইজারাদারা।

তিন বছর পরপর খেয়া ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনার অনুমতি নিয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।ভাড়া বাড়ানোর কারণে সরকারি রাজস্ব হারানোর কোনো সুযোগ নেই বলেন জানান।

বরগুনা জেলা পরিষদের প্রধান সহকারী হারুন অর রশিদ বলেন, ইজারাদাররা ১০টাকা হারে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়ার শর্তে ইজারাদারদের দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের থেকে ভাড়া বাড়ানো চিঠি জুন মাসে অনুমোদন হয়ে আসে। সেই কারণে ইজারাদাররা ভাড়া বাড়িয়েছে। এখন ৫টাকা হারে ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে সে হারের কোন টাকা ইজারাদারদের কাছ থেকে পে অর্ডারের মাধ্যমে আদায় করা হয়নি।

সরেজমিনে বেতাগী-কচুয়া, বামনা -বদনীখালী ,নিশানবাড়িয়া-পাথরঘাটা, পুরাকাটা-আমতলী, বড়ই তলা-বাইনচকি এলাকার খেয়াঘাটের যাত্রীরা বলেন এসব ঘাটে যাত্রীপারাপারে কোনো সুবিধা নাই। ছোট খেয়ার ট্রলার দিকে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুন যাত্রী বহন করে ঝুকি নিয়ে নদী পারাপার করে। এসবের মান উন্নতি না করেই বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

পাথরঘাটা- নিশানবাড়িয়া খেয়াঘাট ৪৬ লাখ হাজার ২২ হাজার টাকায় কামাল নামের এক ব্যক্তিকে ইজারা দেয়া হয়েছে।যাত্রী প্রতি দশ টাকা ভাড়া আদায়ের শর্তে তাকে এই ঘাট ইজারা দেয়া হয়।বাংলা বছরের চৈত্র মাসের শেষের দিকে এক বছর মেয়াদে খেয়া ঘাট ইজারা দেয়া হয়।কামাল হোসেন বলেন জনপ্রতি ১০ টাকা খেয়া ভাড়া আদায়ের শর্তে জেলা পরিষদ বাংলা বছরের প্রথম দিকে এই ঘাট আমাকে ইজারা দেয়া হয়।

জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া আদায় করলে আমাদের ব্যবসায় লোকসান হয়।তাই জেলা পরিষদ থেকে আমাদের যাত্রী প্রতি ১৫ টাকা আদায় করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে।আমি ইজারার সকল টাকা পরিশোধ করছি।

রামনা খেয়াঘাটের যাত্রী মো.শহীদুল ইসলাম বলেন ভাঙাচুরা কাঠের জোড়াতালি সিড়ি দিয়ে খেয়ায় উঠতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় ।খেয়া পারাপারে যাত্রী সুবিধা না করেই ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়র সংস্থা সংগ্রামের (এনজিও)পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মাসউদ সিকদার বলেন, খেয়া পারাপারে আমাদের কাছ থেকে আগে ১০টাকা ভাড়া আদায় করা হত।কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ১৫ টাকা খেয়া ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

যাত্রীদের সঙ্গে এটা এক ধরণের স্বেচ্ছাচারিত।নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক ইজারাদার বলেন এসব ঘাটে লোকসান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।এটা তাদের ব্যবসায়ী কৌশল। আর জেলা পরিষদ কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের যোগশাজসে ইজারাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা এই ভাড়া বাড়িয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাাহ বলেন এই ঘাটগুলো চৈত্র-বৈশাখ মাসে ইজারা দেয়া হয়।বিভাগীয় কমিশনার কাছে ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন চাওয়া হয়। ভাড়া বাড়ানো অনুমতি পেতে তিন-চার মাস সময় লেগেছে।এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা যাবে না ।

এ বিষয় জানতে চাইলে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী বলেন আমি এখানে নতুন আসছি।ভাড়া বাড়ানো বিষয়টি আমার জানা নেই।তবে স্বাভাবিক ভাবেই বছরের শুরুতে ভাড়া বাড়ানোর নিয়ম।মাঝ পথে ভাড়া বাড়ানো কথা না।

মিজানুর রহমান/বরগুনা