শনিবার চট্টগ্রামের প্রথম সিনেপ্লেক্স সিলভার স্ক্রিনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প এবং বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলো চালুর উদ্যোগ নিলে মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার চিন্তা করছে সরকার। এ বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সেটা করা গেলে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক হল পুনরায় চালু হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন সিনেমা হল খোলার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এক সময় সিনেমা হল পরিচালনা করা অনেক লাভজনক ছিল। এখন অনেকগুলো হল বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ হল পরিচালনা করে তেমন আয় হয় না।

এখন হলের জায়গায় মার্কেট করে দিয়ে, এমনকি গুদাম করে দিলেও সেটা আরো বেশি লাভজনক।

এ কারণে হলগুলো বন্ধ করে দিয়ে শহরে মার্কেট বানিয়ে ফেলছে, আর গ্রামে হলগুলোকে গুদাম বানিয়ে ফেলছে। সিনেমায় কেন পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে পুঁজি উঠে আসছে না। হল না থাকায় দর্শক পাচ্ছে না। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, অনুদানের চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই হচ্ছে আর্ট চলচ্চিত্র। বাণিজ্যিক ছবির জন্য অনুদান দেয়া হয় না। যারা অনুদান নিয়ে ছবি বানায় তারা হলে মুক্তি দেয় না। এগুলো কোনো একটা চ্যানেলকে বিক্রি করে দেয়। কিংবা অন্য কারো কাছে বাইরে বিক্রি করে দেয়।

কারণ নিজের বিনিয়োগ তো সেখানে কম। ৬০ লাখ টাকা সরকার থেকে নিলো। ২০-৩০ লাখ টাকা নিজ থেকে বিনিয়োগ করলো, ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিলো। তাহলে তার নিট আয় ৩০ লাখ টাকা। এটিই করা হয়। এজন্য আমরা প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, এখন থেকে বাণিজ্যিক ছবিতেও অনুদান দেব। এবং সেগুলো অবশ্যই হলে মুক্তি দিতে হবে। কিছু আর্ট চলচ্চিত্রে আমাদের অনুদান দিতে হবে।

যেমন কেউ যদি প্রীতিলতার ওপর একটি চলচ্চিত্র তৈরি করে, সেটা হয়তো আর্ট ফিল্ম হতে পারে, আবার বাণিজ্যিক ছবিও হতে পারে। প্রীতিলতার ওপর ছবি আগেও হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশে হয়েছে কিনা জানি না। আর্ট ফিল্মের জন্য অনুদান দিতে হবে। আমরা ঠিক করেছি, একটা পার্সেন্ট ঠিক করে দেবো, কত পার্সেন্ট আর্ট ফিল্মের জন্য দেব, আর কত পার্সেন্ট বাণিজ্যিক ছবির জন্য দেব।

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, একটি চলচ্চিত্র বানানোর জন্য ৬০ লাখ টাকা অনুদান অনেক কম হয়ে যায়। বোম্বেতে একটি স্ক্রিপ্টের জন্য লাখ টাকার বেশি নেয়া হয়। এমনকি পশ্চিমবাংলাতেও অনেক টাকা নেয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি, সেটা হচ্ছে সিনেমায় অনুদানের অঙ্কটা বাড়ানো। আমরা এখন ৫ কোটি টাকা করে দেই। এটা ১০ কোটি টাকায় নিয়ে যাচ্ছি। এবং একটি মুভিতে কমপক্ষে ৭৫ লাখ টাকা বা আরো বেশি দেয়া যায় কিনা। কারণ সবকিছুর দাম বাড়ছে।

একটা বড় মার্কেট করতে গেলে সেখানে যেন সিনেপ্লেক্সের জন্য কিছু জায়গা রাখা হয়। এই জায়গাটি রাখলে মার্কেটটি করার অনুমোদন পাওয়া যাবে, এই ধরনের শর্ত না দিলেও পরামর্শমূলকভাবে এটি থাকা প্রয়োজন। তাহলে বিনোদনের একটি ক্ষেত্র তৈরি হবে।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে সারা দেশে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে ৩০০ আসনের একটি হল থাকবে। সেই হলগুলো সরকার পরিচালনা করবে না, এগুলো লিজ দিয়ে পরিচালনা করা হবে। সরকার পরিচালনা করতে গেলে দেখা যাবে যে, সেগুলো চলছে না। প্রাথমিকভাবে আমরা ২৫ থেকে ৩০টি জেলায় একটি করে তথ্যকেন্দ্র করবো। চট্টগ্রামের মতো বড় জেলায় জমি পেলে দুটি তথ্যকেন্দ্র করা যায়।

বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এফডিসিতে যে যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে, সেটি চালানোর জন্য যে প্রশিক্ষণ দরকার সেটি নেই। আবার কোনো একটা পার্টস মিসিং, যে কারণে সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে এগুলো। সেগুলো আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। কিছু চিহ্নিত হয়েছে, ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। আগের মতো এফডিসিতে এসব অনিয়ম চলবে না।

দেশের চলচ্চিত্রের সংকটকাল গেছে, এখন উত্তরণ ঘটছে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, চলচ্চিত্রের জন্য ভারত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর দেশ। সেখানেও কিন্তু অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪০টি সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এর কারণ হচ্ছে, এখন মানুষের পক্ষে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সময় নেই। আরেকটি কারণ হচ্ছে, নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখার সুযোগ। আরো কিছু কারণ আছে। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে।

সেমিনারে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেনের সভাপতিত্বে ও দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের সহযোগী সমপাদক কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খান, দৈনিক আজাদীর সমপাদক এমএ মালেক, দৈনিক পূর্বকোণের সমপাদক ডা. রমিজউদ্দিন চৌধুরী।