বছর ব্যাপী প্রচারণা, বিশাল কিছু হতে যাওয়ার প্রলোভনে সিক্ত ৩৩তম ফোবানা সম্মেলণ শেষ হলো ব্যর্থতা, হতাশা আর সমালোচনার মধ্যে দিয়ে। সম্প্রতি শেষ হওয়া বহুল আলোচিত এবং বিভক্ত ফোবানার বিভক্ত সম্মেলনণ কি পেল আমাদের কমিউনিটি! কেনই বা এই খরচের মহোৎসব? এইসব প্রশ্ন এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সবার মুখে মুখে। যদিও অনেকেই বলছেন, আমাদের কমিউনিটি কখনো নাসাউ কলিসিয়ামে অনুষ্ঠান করার সাহস করতো না। আজ ফোবানা সেটি করে দেখিয়েছে এটাই তাদের বড় সার্থকতা।

তিন দিন ব্যাপী আয়োজিত এই অনুষ্ঠান ঘিরে যে প্রচারণা ছিল তাতে অন্য কিছু বাদ দিলেও শুধু অনুষ্ঠান নিয়ে যে প্রচারণা ছিল তার কতটুকুই বা দর্শকরা পেয়েছেন? বিশ্ব সেরা কনভেনশন সেন্টার ভাড়া নিয়ে বিলাসিতা দেখানোর কি খুব প্রয়োজন ছিল? অনুষ্ঠান বুলেটিন এবং তার পূর্ব প্রচারণায় শুধু মাত্র তুলে ধরা হয়েছে নাসাউ কলিসিয়ামে কারা পারফর্ম করেছেন এবং কি হয়েছে। তার সাথে বলা হয়েছে সেই বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পীরা যে স্থানে পারফর্ম করেছেন সেখানেই সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশের শিল্পীরা। এটা নিঃসন্দেহে শিল্পীদের জন্য বড় প্রাপ্তি। কিন্তু কোন শিল্পীরা গাইলেন বা পারফর্ম করলেন! দীর্ঘদিন ধরে শিল্পীদের যে প্রচারণা ছিল অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে হঠাৎ করেই সে তালিকা পরিবর্তন করা হলো। তাহলে কি টিকেট বিক্রি করার জন্যই সে প্রচারণার কৌশল ছিল? পক্ষান্তরে যে শিল্পীরা এলেন তারা কি তাদের দর্শকদের কিছু দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন? বিখ্যাত শিল্পীদের কনসার্ট এখানে হয় কারণ দর্শকদের স্থান সংকুলানের জন্য, লোক দেখানো বা ধান্দাবাজির জন্য নয়!

উচ্চ মূল্যে টিকেট, গাড়ি পার্কিং এর টাকা সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানে যাওয়া দর্শকরা কি পেলেন? সম্মেলণের জন্য বা কথা বলার জন্য সারাদিন পরে থাকলেও টাকা দিয়ে অনুষ্ঠান দেখতে আসা দর্শকদের কথা শুনিয়ে সময় নষ্ট করে বিনোদন বা শিল্পীদের অনুষ্ঠান দেখা থেকে বঞ্চিত করেছেন বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। অনেক দর্শক বলেছেন আমরা সময় এবং অর্থ ব্যায় করে এসেছিলাম দেশীয় বিনোদনের জন্য কিন্তু আমাদের বক্তব্য শুনিয়ে বিরক্ত করার মানে কী? কারা বক্তা, তারা আমাদের কি শুনাবেন বা তাদের কি যোগ্যতা আছে! এসব কথাতো তারা কনফারেন্সে বসে নিজেরা আলোচনা করে নিতে পারতেন! দর্শকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে টিকেট বিক্রির মানে কি? ফ্রি অনুষ্ঠান হলে আয়োজকদের যা ইচ্ছে করতে পারেন বলার কিছু থাকে না কিন্তু টিকেট কাটিয়ে এমন বিরক্ত করার মানে কী? তাদের আত্ম অহমিকা বা ভাব দেখার জন্য তো আমরা টাকা ব্যায় করে এখানে আসিনি! লং আইল্যান্ডে থাকেন এমন একজন গৃহবধু জানালেন পরিবার নিয়ে বিনোদণের আশায় কাজে ছুটি নিয়ে টিকেট কেটে এখানে এসেছিলাম। এর চেয়ে অন্য কোথাও ঘুরতে গেলেও ভাল হতো! মাইলসের ভক্ত অনেক দর্শক এসেছিলেন প্রিয় ব্যান্ডের গান শুনতে। কিন্তু সময়ের স্বল্পতার জন্য মাত্র দুই-তিনটি গান গাইলেন মাইলসের শিল্পীরা। অন্যান্য শিল্পীদের বেলায় একই ঘটনা ঘটেছে। দর্শকরা গান না শুনতে পেয়ে যেমন হতাশ তেমনি শিল্পীরা গান না শুনাতে পেরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে ক্ষোভ জানিয়েছেন আয়োজকদের একজনের দাম্ভিকতা পূর্ণ কথায়। গান‌ নিয়ে দর্শকদের ক্ষোভের এক পর্যায়ে ঐ ব্যক্তি এটা ফোবানা সম্মেলণ, আমাদের কথা শুনতে হবে বলে মন্তব্য করেন। যদি তাই হয় তাহলে টাকা না‌ নিয়ে বরং দর্শকদের টাকা দিয়ে তাদের কথা শুনানো উচিৎ ছিল বলেও অনেকে মন্তব্য করেন।

মেলায় বিপূল সংখ্যক দর্শক সমাগমের প্রলোভনে বরাদ্ধ দেওয়া স্টলের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসে মেলাস্থলের উত্তেজনা প্রশমন করা গেলেও অনুষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এদিকে অনেকেই বলেছেন ড্রামা সার্কেল নাটকের সংগঠন হলেও বিগত কয়েক বছর তাদের আবৃত্তি আর গান ছাড়া নাটকের কোন কাজেই দেখা যায় নাই! ইভেন্ট এরেঞ্জার হিসাবে তাদের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলেও কারো জানা নেই। সেই ক্ষেত্রে এত বড় একটি অনুষ্ঠান করার বিলাসিতা কিভাবে দেখালো! ড্রামা সার্কেলের আয়োজনে বড় আকারে নাট্যোৎসবের আয়োজন হলে সেটা বরং মানানসই হতো বলেও অনেকে মন্তব্য করেন।

এদিকে লাগোয়ার্ডিয়া ম্যারিয়টে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি অপেশাদার, অনভিজ্ঞতার ছাপ প্রত্যক্ষ করা গেছে। নিউ ইয়র্কের বস্তাপঁচা কিছু শিল্পীদের গান আর আবৃত্তি না জানা মানুষের এমন অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ দর্শকদের বিরক্ত করেছে। গানকে দলিত মথিত করার পর তার, লয়, ছন্দ না জানা আনাড়ি লোক অন্যান্য অনুষ্ঠানের মতো কি টাকা দিয়ে আবৃত্তি করার সুযোগ নিয়েছে? এমন প্রশ্ন সবার। তবে এখানে যেহেতু বিনামূল্যে অনুষ্ঠান দর্শকদের এগুলো মেনে নিতেই হবে। নয়তো টাকা দেয়ার পরও যে দাম্ভিকতা, এখানে হয়তো বহিষ্কৃত হতে পারতেন!

প্রশ্ন হচ্ছে এই দুটি সম্মেলণ থেকে কমিউনিটি বা দেশ কি পেল? তারা কি দরীদ্রদের জন্য কোন তহবিল গঠন করেছেন? নাকি কেউ মারা গেলে তার লাশ দাফন বা দেশে পাঠানোর জন্য কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন? স্বল্প আয়ের লোক যারা পরিবার নিয়ে দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন তাদের জন্য কি নিয়েছে কোন ব্যবস্থা? সম্মেলণের মূল লক্ষ্য করা ছিল? টাকা কামানো, আদম পাচার নাকি শো ডাউন করা? এসব বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন ছিল। যারা এই লক্ষ্যহীন অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তাদের কাছে কী দেশের দুর্যোগ মোকাবেলায় বা অন্য কোনো মানবিক বিষয়ে এমন সাহায্য পাওয়া যাবে? কিসের প্রলোভনে বা কি লাভে তারা এইসব অনুষ্ঠানে টাকা লগ্নি করেছেন? এই নিয়ে রয়েছে নানা মন্তব্য।

প্রসঙ্গত সংবাদ সংগ্রহের জন্য সংবাদ কর্মীদের জন্য ছিল না কোনো ব্যবস্থা। একদিকে অগোছালো, পরিকল্পনাহীন স্বস্তা শিল্পী আর উপস্থাপনা আর অন্য দিকে দাম্ভিকতা প্রদর্শনের মাধ্যমে শেষ হলো ফোবানা সম্মেলণ। আর জাতি হিসাবে দর্শকরা হলেন‌ বরাবরের মতোই প্রতারিত।