মাহমুদ উল্লাহ্‌
বিজনেস করেসপন্ডেন্ট

ফেসবুকে কবি আল মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

শত সহস্র বর্ষে একজন কবি জন্ম নেয়। বাংলা ভাষায় এই সময়ের শক্তিশালী কবি আল মাহমুদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাকে নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও তার কবিতার কাছে সবার মাথা নত হয়ে আসে। বুদ্ধিজীবীদের কবর শহীদ মিনারে নেয়া হলেও তার কফিন নেয়া হয়নি। তার জানাজা পড়ানো হয়েছে বায়তুল মেকাররম মসজিদে। তাকে নিয়ে ফেসবুক ভরে গেছে বিভিন্ন ধরনের কমেন্টে। নিচে সেসব দেয়া হলো।

নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী লিখেছেন :

মহাকালের সন্তান মহাকালেই চলিয়া যায়
বিদায়, কবি আল মাহমুদ।

লেখক রিফাত হাসান তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন:
আমি জানি, নিশ্চিতভাবেই ভাবতে পারি, আল মাহমুদ মসজিদেই যেতে চাইতেন, শহীদ মিনারে নয়। শহীদ মিনার একটি মূর্তি, চিহ্ণ বিশেষ, আর কিছু না। ছাইভস্মও না। পৌত্তলিক, রাষ্ট্রীয় ধর্মবাসনার চিহ্ন। যেখানে ধর্ম নেই, ধর্মবাসনা আছে। একটি সেকুলার ধর্মচিহ্ন, যা বর্তমানে প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্টদের মাজার বৈ কিছু নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই শহীদ মিনারে আপনি যেতে অধিকার রাখেন না। কেন? আমি মনে করি শহীদ মিনার পুনর্দখল হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত যখন সেখানে যেতে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। মসজিদ যেমন, উদার সেকুলারদের জন্যও জায়গা দরকার। শহীদ মিনার পাবলিক প্রপার্টি।

কবি ও নির্মাতা কামরুজ্জামান কামু লিখেছেন:
মৃত্যুর আগে আল মাহমুদের সঙ্গে রাষ্ট্র যে আচরণ করল, বাংলাভাষায় চিরকাল তাকে ‘ছোটলোকি’ বলে সাব্যস্ত করা হবে!

নাট্যকার ও এক সময়ের জনপ্রিয় নির্মাতা ফেরদৌস হাসান কবির সুন্দর স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন:
আব্বা বলে পড়রে সোনা, আম্মা বলে মন দে
পড়ায় আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে…
এই ছড়াকারকে ভালো না বেসে উপায় কী?
গাঙের ঢেউয়ের মত বলো কন্যা কবুল কবুল…
এই কবির প্রেমে না পড়ে উপায় কী!
জলবেশ্যা… যা আমাদের নেই,তা বেশ্যার আছে। নীতি!কে লিখবে আর কাবিলের বোন?
আমাদের তিনজনকে তালা মেরে ঈদ সংখ্যায় উপন্যাস লেখাচ্ছেন পূর্ণিমার সম্পাদক সৈয়দ আতাহার আলী। আল মাহমুদ,হূমায়ন আহমেদ আর আমি। আতাহার ভাই বলেছেন, লেখা শেষ হলেই টাকা দেবেন। কিন্তু আল মাহমুদের সংশয় যদি না দেয়।
যা না একটু শিওর হয়ে আয় না টাকাটা দেয় কি না দেয়!
আমি গিয়ে ধরি। আতাহার ভাই খাম দেখিয়ে বলেন,রেডি।
এসে বলি। উনি বলেন, কত?
আবার যাই। আতাহার, ৮ হাজার!
সে শুনে লেখায় মন দেয়। আমরা দু’জন পাশাপাশি। হূমায়ন ভাই দূরে। একা। আমাদের দিকে তার কোন মনযোগ নেই।
আমরা খবরের কাগজ বিছিয়ে নামাজ পড়ি। সে ইমাম।
হঠাৎ আমার এক পাতা নিয়ে তিনি পড়ে বলেন,তুমি উপন্যাস লেখছো না কবিতা!
আমি লজ্জা পাই।
তুমি লেখো কবিতা আর সে লেখে কিশোরী ফাঁসানোর গপ্পো!
সেটা মিন করে হূমায়ন ভাইকে।
আপনি কী লেখেন?
লেসবিয়ানদের নিয়ে।
আমি থমকাই। মনে করলাম তার মেজাজ খারাপ।
ভাই টাকার জন্য চিন্তা করছেন?
হ্যাঁ।
মন খারাপ করবেন না,আতাহার ভাই না দিলে আমি আপনাকে দেব।
শোন এরশাদ ৫ কাঠা জমি দিচ্ছে। তাও কোথায় দিচ্ছে জানিস গুলশানে! মানে তখন একাই একটা গরু দিব। হা হা হা…
আমরা লেখা শেষ করি। আতাহার খাম দেন। তিনি এক ভাগ গরুর টাকা নগদ পেয়ে আত্নহারা!
কয়েক বছর পর যাই, জলবেশ্যা নয়ে সিনেমা করার জন্য তিনি অনুমতি দিয়ে বলেন, তুই আসিস না কেন?
আপনি লেসবিয়ান নিয়ে লিখেলেন কোন আক্কেলে!
হা হা হা,তুই প্রমাণ চাস? ঢাকায় এখন ভুরি ভুরি!
না ভাই আমি সোনালী কাবিন চাই,পান কৌড়ির রক্ত,বখতিয়ারের ঘোড়া!
আর আমাকে দিয়ে হবে না!
কেন?
এরশাদ জমি দিয়ে সব্বোনাশ করলো!
কি ভাবে?
আগে তো খেতে পেতাম না তাই লেখা আসতো।এখন সকাল বিকাল ঘিয়ের লুচি খাই,পেন ধরতে পারি না,পিছলে পড়ে যায়… হা হা হা!
সাংবাদিক ও কবি সিফাত বিনতে ওয়াহিদ লিখেছেন
“নরম গদি কোশন আসন চশমা পরা চোখ
লোক ঠকানো হিসেব লেখে, কম্প্যুটারে শ্লোক।
বাংলাদেশের কপাল পোড়ে ঘূর্ণিঝড়ে চর
মানুষ গড়ার শাসন দেখে বুক কাঁপে থরথর।
‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’- গান শোননি ভাই?
মানুষ হবার ইচ্ছে আমার এক্কেবারে নাই।”
আপনারা মানুষেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করেন। মানুষ হওয়ার ইচ্ছে উনার ছিল না, আপনাদের সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধ না জানানোতে তার কবিতার কিছুই যাবে আসবে না।
এডভোকেট রাহাত মুস্তাফিজ লিখেছেন,
কবি আল মাহমুদ মারা গিয়ে সম্ভবত ভীষণ বিপদে ফেলে দিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট তথা সম্মিলিত শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন জোটকে। তারা এখন কী করবে? কবির ডেডবডি শহীদ মিনারে নিলে সিপি গ্যাং ও চেতনার বরপুত্ররা গোস্যা করবে, না নিলে দলকানা, পদলেহি, চাটুকার সিল আরও মজবুত হবে। কীএক্টাবস্থা! আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি কী হয় দেখার।
মাই প্রেডিকশনঃ পিয়াস করিমের যেমন শহীদ মিনারে জায়গা হয়নি, তেমনি আল মাহমুদেরও হবে না।
মাই এক্সপেকটেশানঃ আল মাহমুদকে শহীদ মিনারে নেওয়া হোক সর্বজনের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।
শেষ বয়সের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি বাদ দিলে তিনি আপাদমস্তক একজন কবি, বিশুদ্ধ কবি (কবিতার ক্ষেত্রে)।

টরোন্টো প্রবাসী আরিফুল ইসলাম লিখেছেন:
মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আজ ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তাকে রহম করুন, বেহেস্ত নসিব করুন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া এই কবি একবার বলেছিলেন, “কবিরা কখনো পরাজিত হয়না।” তবে সব মানুষকে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হতে হয়, কিন্তু কবিরা মরে গেলেও তাঁদের কবিতা বেঁচে থাকে।
এস এম সাইফুল ইসলাম কবির সঙ্গে তার নিজের একটি ছবি পোস্ট দিয়ে নিচে লিখেছেন
“তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হব
পাখির মত বন্য।”
– আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
চিরশ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, হে প্রিয়তম কবি…

শর্ট ফিল্ম নির্মাতা আনন্দ কুটুম লিখেছেন:
কবি আল মাহমুদকে নিয়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দ্বিধান্বিত- “একজন মৌলবাদী কবিকে সম্মান জানানো সমুচিত হবে তো?”
এই যে প্রশ্ন তো আসারই কথা ছিলো। শিল্পীকে স্রেফ শিল্পী হিসেবে দেখার মত যথেষ্ট উদার বাঙ্গালী জাতি এখনো হয়ে উঠেনি।
প্রশ্ন জাগে, মৌলবাদী সময়ে যদি নির্মলেন্দু গুণের মৃত্যু হয়, আমরা কী তার লাশ ফেলে রেখে পালাব? পাছে ক্ষমতার কেন্দ্র রুষ্ট হয় ভেবে। একজন মৌলবাদী কবির লাশ ফেলে রেখে রাজনৈতিক সমিকরণ মেলানো ব্যক্তিরা (সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট) নিজেরাও কি কট্টর মৌলবাদের ঘরে বন্দি নয়? প্রশ্ন জাগে মনে।
সময় ঘুরে ঘুরে আসে। এটাই সময়ের নিয়ম। আজ যারা ডানে আছেন কাল তারা বাম হবেন। আজ যারা উচুতে বসা কাল তারা পাতালে যাবেন। এই ঘুর্ণয়মান সময়ের সমিকরনে ক্ষমতার বিপরীতে দাড়ানো মানেই আপনি অচল, অকেজো, প্রয়োজনীয়, অগ্রহনীয়।

রুদ্র সাইফুল লিখেছেন:
যুদ্ধাপরাধী শিরোমণি গোলাম আযমের আত্মজীবনীর অনুলেখক জামাতি কবি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদ আপাদমস্তক ভণ্ড ছিলেন।
জঙ্গি সংগঠন ছাত্রশিবির সম্পর্কে আল মাহমুদের বক্তব্য এই ভিডিওতে পাবেন:
“…এখন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্বন্ধে একটু বলি। আমি এদের ভালোবাসি। কারণ আমার জানামতে ইসলামী ছাত্রশিবির একমাত্র ছাত্রসংগঠন যারা এখনও নৈতিক বল ও ঈমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমি মনে করি এরা বিজয়ী হবে, ইনশাল্লাহ।”…বয়ানে বাল মাহমুদ।
এরপরেও যারা বাল মাহমুদের মরদেহ ভাষা শহীদদের পবিত্র বেদী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছেন তাদের পরিচয় আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে।
তাই বলি কি, শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচয়ের থেকে তার ব্যক্তিগত শিল্পবোধ অনেক উচুতে স্থান পায়, স্থান পাওয়াই উচিৎ। শিল্পীরা যদি রাজনৈতিক মারপেঁচের খেলায় রক্তারক্তি হয়ে বিভক্ত হয়ে যায় তবে সে তো রাজনৈনীতিরই সার্থকতা। শিল্পবোধ কী দলীয় রাজনীতির থেকেও ছোট কোন বিষয়? ভেবে দেখবেন…

সাংবাদিক লেখক ও নির্মাতা ইমরান আনু তার ফেসবুক পেজে মায়ের স্মৃতি ও কবির একটি কবিতা নিয়ে লিখেন:
আমার মায়ের সোনার নোলক-ও কবি আল মাহমুদ
আমি তখন বৈদেশবাসী। দেশে এসেছি, তিনমাসের ছুটি। খুব কম সময়। তবুও আমার সাহিত্যের বলয়ের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগটা রক্ষা করার কারনে প্রতিদিনই কারো না কারো সঙ্গে দেখা করছি। মা বলেছিলেন মাকে একবার বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে যেতে হবে। সেই কাজটা আর হয়ে উঠল না। শেষমেস ছুটি শেষ জানুয়ারীর ১৬ তারিখ রাতে চলে গেলাম। সেই যাওয়ায় মা তার সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে এটাই তার সঙ্গে আমার এই ধরায় শেষ দেখা। আমি বুঝিনি।
মা ১৮ জানুয়ারী রাত ৩ টায় চলে গেলেন ঐ জগতে। খুব কষ্টের মাঝেও আমি বার বার সবাইকে বলেছি -মায়ের নাকের ফুলটা আমার জন্য রেখে দিও। এই বোধনটার একটা কাহিনী আছে। -আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। দাদা (আমরা বড় ভাইকে দাদা বলি) প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসেন, তবুও একুশে বইমেলা থেকে বই কিনে সেই বই বাই পোস্টে আমার আর আসাদ ভাইর জন্য পাঠিয়ে দেন।সেই বই গুলোর মধ্যে, ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ ‘গ্রামের নাম চৌগাছি’ ‘ছোটদের মহানবী’ সহ অনেক বই এখন নাম মনে নাই অনেক বইয়ের।সেই বই আমরা দুই ভাই পেয়ে কি যে আনন্দে আর আহলাদে বই নিয়ে হাটি , বই নিয়ে খেতে যাই, বই নিয়ে ঘুমাতে যাই। কি এক অন্য রকম আনন্দে দিন যায়। গ্রামের যে যখন পায় বলে -কবিতা শোনা আর আমরা দুই ভাই গড় গড় করে কবিতা-ছড়া মুখস্ত বলি – আমার প্রিয় কবিতা
-আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেলো শেষে,
হেথায় খুজি হোথায় খুজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম আছে তোমার কাছে
হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।—
এই কবিতা থেকে মায়ের সোনার নোলক টা কাছে রাখার ইচ্ছেটা । আমার ছোট আপার কাছে থেকে আমি সেই নোলকটা আমার কাছে নিয়েছি। নোলকটা এখনো আছে আমার কাছে –কখনো কখনো রাত দ্বিপ্রহর অথবা সাহস খর্ব হওয়ার দিনে আমি খুলে দেখি। আর মনে পরে মায়ের সাহসের বানী—‘কখনো মন ছোট করবি না’- ‘তুই যতটুকু ভাবতে পারিস তোর আল্লাহ তত বড়’ ‘সব সময় উপরে না নীচে তাকাবি’ আমি সাহস নিয়ে পুন:রায় হাটি নতুন পথে।
আমার মায়ের মতো কবি আল মাহমুদও চলে গেলেন। -সাহস গুলো কি এভাবেই চলে যাবে একে একে !!!!

নিমার্তা ও কবি মারিয়া তুষার লিখেছেন:
শুক্রবার রাতে মৃত্যু…
বিদায় সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদ।
ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন।
ভালো থাকুন প্রিয় তিতাস পারের কবি!

সাংবাদিক দিপান্বিতা ইতি কবির সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন:
বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল
পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না
তুমি যদি খাও তবে আমাকে দিও সেই ফল
জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোহে পরস্পর হবো চিরচেনা
পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা
দারুণ আহত বটে আতর্ আজ শিরা-উপশিরা…
পরাজিত হয় না কবিরা… হয় না…

কবি হিজল জোবায়ের লিখেছেন:
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কী ফালাইতেছে!!!???
এডভোকেট, চিকিৎসক ও কবি জয়ন্ত জিল্লু লিখেছেন
বাংলাভাষার সেরা কাব্য : সোনালি কাবিন
বাংলাভাষার সেরা কিশোর কাব্য : পাখির কাছে ফুলের কাছে
বাংলাভাষার সেরা গল্পগ্রন্থ : পানকৌড়ির রক্ত
বাংলাভাষার সেরা আত্মজৈবনিক : যেভাবে বেড়ে ওঠি
বাংলাভাষার সেরা উপন্যাসের একটা : উপমহাদেশ
সব কয়টা বইয়ের লেখক আল মাহমুদ। আশা করি, আপনারা বইগুলো পড়বেন।
২০০৬ সাল সম্ভবত কবি আল মাহমুদের কেয়ারি শান বাসার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। ঢাকার জ্যামের কারণে বাসায় আর যাওয়া হয়নি। #ভাঁজপত্রের আল মাহমুদ সংখ্যাও আর করা হয়নি।
সর্বশেষ বাতিঘরে আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা। একটি ছবিও আছে কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া দা’র মোবাইলে।
আজ কবি পৃথিবী ছাড়লেন। আমার প্রিয় কবি। অসম্ভব প্রিয় কবি। শৈশব থেকে একমাত্র আল মাহমুদকে কবি বলে জানতাম।
কষ্ট হচ্ছে। এইটুকুই।
কবিরা কি মরে? হ্যাঁ মরে। প্রগতিশীলতার দোঁহাইয়ে কবিরা শুরুতেই মরে। তারপর, রাজনৈতিক পরিচয়ের দোঁহাইয়ে। সর্বশেষ হাসপাতালের বাতি নিভে গেলে।
বাংলাদেশ কবিদের দেশ না। এটা চাটুকারের দেশ।
ওপারে কিভাবে ভালো থাকে জানি না। হয়ত আল মাহমুদ ভালো থাকবেন। হয়ত ওখানে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীকে খুঁজবেন। হয়ত ওখানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় থাকবেন।
আজকের জনপ্রিয় লেখকদের পাঠক-পাঠিকারা, আপনারা কি আল মাহমুদের নাম শুনেছিলেন? উনার ব্যানারের ব্যাগ দেখেছেন বইমেলায়? উনার নামে স্টল দেখেছেন?

ইমতিয়াজ মির্জা লিখেছেন:
এইটা কী খুব অস্বাভাবিক যে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করসে, কিংবা ভারতে গিয়ে পরিচয় দিয়ে সংগঠন করসে, রেডিওতে প্রগ্রাম করেছে, জনসংযোগ করেসে বিদেশে, যারা দেশ স্বাধীন না হলে হয় মারা যেতো না হয় সারা জীবনের জন্য বিদেশ পালিয়ে বেড়াতো সেই মুক্তিযোদ্ধাদের উপর যারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি যেমন শামসুর রাহমান, জাফর ইকবাল ইত্যাদিদের প্রচুর রাগ!
হতভাগা বাঙ্গালের বুদ্ধিজীবি আবার কাপুরুষ হিংসুক গুলো যারা মানুষ হিসাবেই মার্ক পায় না আবার বুদ্ধিজীবি

রেকিদন হেলাল:
শহীদ মিনারে আল মাহমুদের মরদেহ নিতে দেয়া হয়নি।
এই শহীদ মিনারে মুতলাম।

লেখক ও অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ নাজমুল হাসান:
এই শরীরমুখি সাহিত্যচর্চা, বেলুনমুখী উন্নয়ন বার্তা, কবি নামক কাউয়া আর তোষামদ প্রত্যাশী রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ‘সোনালী কাবিন’ কোন সৃষ্টিই না..
আমার সোনার বাংলায় #আল_মাহমুদ নামক নক্ষত্রের জন্ম নেওয়া অপরাধ

কবি ও সাংবাদিক আলমগীর নিষাদ লিখেছেন:
আমি জানি, নিশ্চিতভাবেই ভাবতে পারি, আল মাহমুদ মসজিদেই যেতে চাইতেন, শহীদ মিনারে নয়। শহীদ মিনার একটি মূর্তি, চিহ্ন বিশেষ, আর কিছু না। ছাইভস্মও না। পৌত্তলিক, রাষ্ট্রীয় ধর্মবাসনার চিহ্ন। যেখানে ধর্ম নেই, ধর্মবাসনা আছে। একটি সেকুলার ধর্মচিহ্ন, যা বর্তমানে প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্টদের মাজার বৈ কিছু নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই শহীদ মিনারে আপনি যেতে অধিকার রাখেন না। কেন? আমি মনে করি শহীদ মিনার পুনর্দখল হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত যখন সেখানে যেতে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। মসজিদ যেমন, উদার সেকুলারদের জন্যও জায়গা দরকার। শহীদ মিনার পাবলিক প্রপার্টি।

কবি অনিকেত শামীম লিখেছেন:

‘আজ থেকে প্রায় ১২/১৪ বছর আগে কবি আল মাহমুদ আজিজ মার্কেটে এলে মাঝে মাঝে ‘লোক’-এ আড্ডা দিতেন। তরুণ কবিরা ভিড় করে থাকতো। আহা তিনি আজ আমাদের মাঝে শুধু ইতিহাস, শুধুই কবিতার মানুষ। বিগত কয়েকদিন থেকে কবি সাখাওয়াত টিপুসহ কয়েকজন তরুণ কবি বইমেলায় আমাকে বলছিলেন আল মাহমুদ এর উপর ‘লোক’-এর একটি সংখ্যা করার জন্য। এ ছাড়া কয়েক বছর আগেও অনেকেই বলেছেন এবং আমি নিজেও অনুধাবন করছিলাম যে বাংলা ভাষার এত বড় একজন কবিকে নিয়ে লোক-র একটি সংখ্যা করা উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক বিভিন্ন বিতর্কের কারণে তার ওপর সংখ্যাটি লোক-এর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয় নাই বরং আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে মানসী কীর্তনীয়া সম্পাদিত ‘কারুভাষ’-এর একটি সংখ্যা আল মাহমুদকে নিয়ে হোক সেটার জন্য চেষ্টা করেছি। সেই সংখ্যাটি হয়তো মাসখানেকের মধ্যেই বেরিয়ে যাবে, প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। এখন যেহেতু তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন তাই ভাবছি লোক’র একটি সংখ্যা তাঁকে নিয়ে করা যায় কিনা।
আপনারা কি বলেন?’

সাখওয়াত টিপু লিখেছেন:

‘সকাল থেকে অসংখ্য ফোন তরুণ কবিদের। আল মাহমুদ নিয়ে কিছু যেন বলি! জীবদ্দশায় আল মাহমুদ ঝুলন্ত সাঁকোতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মৃত্যুর ভেতর দিয়ে সে সাঁকো পার করেছেন। স্বদেশের মাটি এখন তাঁর ঠিকানা। কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে যে প্রশ্নগুলো বারবার সামনে এসেছে:

১. আল মাহমুদকে শহীদ মিনারে নেওয়া হবে কিনা?
২. আল মাহমুদকে বাংলা একাডেমিতে নেয়া হবে কিনা?
৩. আল মাহমুদের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে সাড়ে তিন হাত জায়গার ব্যবস্থা হবে কিনা?
এই সব বিষয় নিয়ে যেন আমি কিছু বলি। আমি জানি না আমার বলা না বলায় সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কিছু ভাবেন কিনা? যে প্রশ্নের মুখে কবি আল মাহমুদ সবাইকে ফেলে দিয়েছেন, সেটা যে সহজে মীমাংসাযোগ্য তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। আল মাহমুদ মধ্যবিত্ত কবি। ফলে তাঁর নানা বিচ্যুতি ছিল। কিন্তু কবিতার আল মাহমুদ বাংলা ভাষার রত্নভাণ্ডার। রত্নভাণ্ডারকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে হয়। ভাষার সৌন্দর্য এখানেই। কবির দেহও ভাষার সমান। অবহেলা করলে ভাষার অপমৃত্যু ঘটে। ফলে রত্নকে রত্নের মতোই যত্ন করুন। এটুকুই আমার শেষ কথা। কবি আল মাহমুদের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।’