যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু, চাকরি জীবনের শুরু থেকে তিনি নানা কেলেংকারীতে জড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ পরিচালক পদে কমর্রত রয়েছেন। সেখানে দায়িত্ব পালন করা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

তথ্যানুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, একটি ঘটনায় তিনি চাকরি থেকে ৭ বছরের জন্য বরখাস্ত হয়েছিলেন। ওই সময় তাকে আর্থিক জরিমানও করা হয়েছিলো। পরে বিভিন্ন দেনদরবারে চাকরি ফিরে পেলেও থামেনি তার অনিয়ম দুর্নীতি। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসামগ্রী ক্রয়ের জন্য ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাটের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্তে আসায় তিনি আবারো সমালোচিত হয়েছেন। সূত্র জানায়, ওই সময় অর্থ লুটপাটের ঘটনায় ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৫-৯৮ অর্থবছরে যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে এমএসআর খাতে দরপত্রের আহবান করা হয়। ওই সময় সেখানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কমর্রত থাকার সুযোগে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু ছিলেন দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব। ওই দরপত্রে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অডিটে তার প্রমানও মেলে। যে কারনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনুকে ৭ বছরের জন্য বরখাস্ত করে।

পাশাপাশি ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদের সরকারী হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি (পি এ কমিটি) তাকে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৫শ ৩ টাকা ১৫ পয়সা জরিমানা করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একজন দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় তিনি ডিডিও শিপ হারিয়েছিলেন। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেনদরবার করে তিনি চাকরিতে ফিরে যান। কিন্তু জরিমানার টাকা পরিশোধে তালবাহানায় মেতেছিলেন ডা. বেনু। ফলে টাকা আদায় করার জন্য গত ২০১২ সালের ৯ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উপসচিব শাহনাজ সামাদ স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, যশোর জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছিলো।

সূত্রে জানা গেছে, এই অবস্থার মধ্যে সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার থেকে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেডিওলজিস্ট হিসেবে যোগদান করার পর আবাসিক মেডিকেল অফিসারের (আরএমও) দায়িত্ব গ্রহন করেন। ফলে নিয়মানুযায়ী পদাধিকার বলে তিনি দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকার কথা। কিন্তু ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনুকে দরপত্র কমিটিতে না রাখার জন্য ২০১২ সালের ৫ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ মতিউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি আদেশপত্র পাঠানো তৎকালিন তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সালাউদ্দিন আহমেদের কাছে। যে কারনে তিনি কোন দরপত্র কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে থাকতে পারেননি। পরে আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে দরপত্র কার্যক্রমে তাকে সংশ্লিষ্টতার জন্য তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন করলেও তাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। যে কারনে তিনি তৎকালিন তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সালাউদ্দিন আহমেদ ও ডাঃ ইয়াকুব আলী মোল্যার সময় কোন দরপত্র কমিটিতে থাকতে পারেননি। সকল দরপত্র কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন ডাঃ আলমগীর কবির। স্থানীয় কর্মকর্তার নির্দেশে ডাঃ আলমগীর কবির আরএমও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তিতে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকতার দায়িত্ব পেলেও পদাধিকার হিসেবে সিভিল সার্জন অফিসের কোন দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকতে পারেননি দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ডাঃ শ্যামল কৃষ্ণ সাহা অবসরে যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১৮ মার্চ ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু ১৩ এপ্রিল তার তত্ত্বাবধায়কের সংযুক্তি আদেশ বাতিল করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়। যার স্মারক নম্বর ৪৫.১৪৩.০১৯.০৩.০০.০০১.২০১৬-২৩১। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পার-২ অধিশাখার যুগ্নসচিব একেএম ফজলুল হক স্বাক্ষরিত আদেশপত্রে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনুকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক (ওএসডি) হিসেবে যোগদান করতে বলা হয়।

সূত্র জানায়, ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু আর্থিক দুর্নীতির তথ্য গোপন করে হাসপাতালের সংযুক্তি তত্ত্বাধায়কের পদ বাগিয়ে নেন। বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়লে তার তত্ত্বাবধায়কের সংযুক্তি আদেশ বাতিল করা হয়। কেননা তত্ত্বাবধায়কের পদে থাকা মানেই হাসপাতালের যে কোন দরপত্র কমিটির তিনিই সভাপতি হবেন। তাই তার সংযুক্তি বাতিল করা হয়। কেননা বিগত দিনে তিনি আরএমও থাকাকালীন দরপত্র কমিটিতে তাকে না রাখার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওই আদেশটি বহাল ছিলো। যিনি দরপত্র কমিটির সদস্য সচিব হতে পারেননি তিনি কিভাবে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এদিকে তার তত্ত্বাবধায়ক পদের সংযুক্তি বাতিল করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের আদেশ না মেনে তিনি অবৈধভাবে তত্ত্বাবধায়কের পদ দখলে রেখেছিলেন। তিনি অবৈধভাবে পদে থেকেই গত ২৩ অক্টোবর হাসপাতালের এমএস আর মালামাল সরবরাহের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু ওই সময় অবৈধ তত্ত্বাবধায়কের দেয়া দরপত্রের অনুমোদন দেননি মন্ত্রনালয়। আবার তার স্বাক্ষরে কর্মকর্তা কর্মচারিদের বেতন ভাতা দিতে নারাজ ছিলো যশোর জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা জাকির হোসেন।

সূত্র জানায়, ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু স্বঘোষিত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদ আকড়ে রাখার কারনে তখনকার সময় হাসপাতালের দাপ্তরিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিলো। পরে ১ ফেব্রুয়ারি ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ পরিচালক (ওএসডি) হিসেবে যোগদান করতে বাঁধ্য হয়েছিলেন। ৩১ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে তাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান কর্মকর্তা কর্মচারিরা। বর্তমানে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন।
এদিকে, হাসপাতালের সাবেক এই কর্মকর্তাকে নিয়ে আবারো আলোচনা শুরু হয়ছে। হাসপাতালে ওষুধ ও চিকিৎসামগ্রী ক্রয়ের জন্য ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাটের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে আসার পরই শুরু হয়েছে এই আলোচনা। কেনান ওই সময় হাসপাাতালের আরএমও হিসেবে সব কিছু নিয়ন্ত্রন করতেন ডা. একে এম কামরুল ইসলাম বেনু। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১শ ৫১ কোটি টাকার মধ্যে যশোর হাসপাতালে বরাদ্দ হওয়া অর্থ মালামাল ক্রয় বাবদ ব্যয় করেছেন তিনি। অর্থ লুটপাটের বিষয়টি তদন্তকালে দুদক কর্মকর্তা আলী আকবর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও স্টোরকিপারের সাথে কথা বলেছেন। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খতিয়ে দেখেছেন। ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় করার রশিদও খতিয়ে দেখেছেন। ওই সময় তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন ডা. সালাউদ্দিন আহম্মেদ ও আরএমও ছিলেন ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু। এই দুই কর্মকর্তার অগোচরে কোন কিছুই হওয়া সম্ভব না। ফলে তাদের ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন। সে অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু বর্তমান কর্মস্থল জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিজের ইচ্ছামতো যাতায়াত করেন। তিনি সঠিকভাবে কর্মস্থলে না গিয়ে যশোরে শহরে তার মালিকানাধীন কিংস হসপিটালে আল্ট্রাসনোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার এই অনিয়ম রুখতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন চিকিৎসকদের একটি পক্ষ। বিষয়টি নিয়ে ডাঃ একেএম কামরুল ইসলাম বেনু সাংবাদিকদের বলেছেন, আমার জীবনের কিছু কালো অধ্যায় ছিলো। সেগুলো আমি ভুলে যেতে চাই। কিন্তুবার বারবার সেটা সামনে আনা হচ্ছে। তিনি বর্তমানে কোন অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িত না। বর্তমান কর্মস্থলে তিনি নিয়মিত অফিস করছেন। একটি মহল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।#

ইয়ানূর রহমান/যশোর