শহীদ আবুল হোসেন ও তার স্ত্রী রহিমা বেগম।

“মাইনষ্যে কর যুদ্ধ লাগি গেছে,একজনরে মারিলিছে,মাথার মাঝে গুলি লাগছে,কার লাগছে আমরা জানিনা। পাঞ্জাবীর গুলিতে মানুষ মারা গেছে। সেই মানুষটিই হচ্ছেন আমাদের সুনামগঞ্জের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন”।

সাক্ষাৎকারে একথা বলে প্রিয় স্বামীর স্মৃতিচারণ করলেন শহীদ আবুল হোসেনের অসহায় বিধবা স্ত্রী রহিমা বেগম। মুক্তিযুদ্ধের আগে তার স্বামী ছিলেন একজন পিসি অর্থাৎ আনসার কমান্ডার। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের অচিন্তপুর গ্রামের মরহুম জায়ফর মাহমদের কনিষ্ট সন্তান। ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে আবুল হোসেন ছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান।

স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন ২৮ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি এবং কোলে তুলে নেন তার শিশু সন্তান রেজাউল করিমকে। তখন নিজে কান্নাকাটি করে সন্তান রেজাউলকে আদর সোহাগ করেন। স্ত্রী রহিমাকে নির্দেশ দেন তার জন্য খিচুরি রান্না করতে। এবং বাজার নিয়ে বাড়ী ফিরবেন বলেও স্ত্রীকে জানান। সকাল অনুমান ৯ ঘটিকার সময় বাড়ী থেকে মহকুমা সদরের উদ্দেশ্যে বের হন তিনি।

“আমি যাইমুগি বাজারও,হুনছি পাঞ্জাবী আইছে দেশও যুদ্ধ লাগি যাইতো পারে। যদি কোন কিছু হুন তোমরা বাড়ী ছাইড়্যা যাইওনা”। বাড়ীতে থাকা ভাই ভাতিজা ও আত্মীয় স্বজনদেরকে বুঝিয়ে সাবধান সতর্ক করে চলে যান তিনি। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন বড়পাড়া বাড়ীর ঘাটে আইয়্যা গ্রামের অন্যান্য আনসার সদস্য ও আত্মীয় স্বজন সকলকে উদ্দেশ্য করে হাকডাক শুরু করেন। বলে উঠেন, “তোমরা তাড়াতাড়ি পার অইয়্যা আও যুদ্ধ লাগি গেছে”।

তার আহবানে সাড়া দিয়ে গ্রামের আনসার সদস্য মন্তাজ মিয়া,একদিল মিয়া,নুরুল ইসলাম, সামসুল ইসলাম,আব্দুল হাশিমসহ গ্রামের প্রায় সকল আনসার সদস্যরাই খেয়া নৌকা পার হয়ে শহরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। কিন্তু সহকর্মীদের স্পটে যাওয়ার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যান আবুল হোসেন। ট্রেজারীর তালা ভেঙ্গে ছাত্র জনতা অস্ত্র ছিনতাই করলে আবুল হোসেনও হাতে তুলে নেন অস্ত্র। বর্তমান এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে থেকে পুরাতন সার্কিট হাউজে অবস্থানকারী পাক সেনা সদস্যদেরকে লক্ষ্য করে তিনিই প্রথম গুলি ছুড়েন। তার ছুড়া গুলিতে এক পাক সেনা নিহত ও আরেকজন আহত হয়। আহত ওই সেনাসদস্য গভীরভাবে লক্ষ্য করে তার উপর ছুড়া গুলিটি কোথায় থেকে এসেছে। এমন সময় এসসি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের জানালা লক্ষ্য করে আহত সেনা সদস্যটি একজন মুক্তিযোদ্ধার মুখ দেখতে পায়। দেখামাত্রই সে গুলি চালায়। ওই গুলিটি আবুল হোসেন এর মাথায় গিয়ে পড়ে মগজ বের হয়ে যায়। পরে রুমাল দ্বারা বেঁধে সহকর্মীরা আছরের নামাজের সময় তার লাশটি বাড়ীতে পাটায়। বাদ এশা নামাজে যানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

এডভোকেট আলী ইউনুছ সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়,৭১ এর ২৭শে মার্চ বাঙ্গালী ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের পাক হানাদার বাহিনী যখন প্রথম সুনামগঞ্জ আক্রমণ করে তখন ইপিআর ছাত্রজনতা ও আনসার ভিডিপি সদস্যরা প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে চতুর্দিক থেকে পুরাতন সার্কিট হাউজে অবস্থানরত পাক বাহিনীকে ঘেরাও করে ফেলেন। এ অবস্থায় ২৮ মার্চ দুপুরে পাকবাহিনী সাদা নিশান তুলে আপোষ প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে ইপিআর আনসার ছাত্রজনতার সম্মিলিত বাহিনী এসডিও মোকাম্মেল এর মাধ্যমে পাকবাহিনীকে সারেন্ডার করার শর্ত দেন।

কিন্তু পাক বাহিনী সারেন্ডারে সম্মত না হওয়ায় শুরু হয় প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধ। সুনামগঞ্জ সরকারী সতিশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আনসার কমান্ডার আবুল হোসেনের দল সার্কিট হাউস লক্ষ্য করে গুলিবর্ষন শুরু করেন। এসময় সার্কিট হাউস হতে আসা গুলির আঘাতে এসসি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের মধ্যেই শহীদ হন আবুল হোসেন।

শহীদ আবুল হোসেন ইহজগতে না থাকলেও তার অসহায় পরিবারবর্গরা এখন জীবনযুদ্ধে জড়িত রয়েছে। একমাত্র বিধবা স্ত্রী রহিমা বেগম সহ শহীদ আবুল হোসেনের রয়েছে ১ ছেলে ও ২ মেয়ে। মেয়ে রুনিয়া আক্তার এর বিবাহ হয়েছে চট্রগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার ফতেখাপুলে। তার স্বামী মিয়া হোসেন মুরাদ চাকুরী করেন বিজিবি কর্মকর্তা হিসেবে।

কনিষ্ট মেয়ে শামীমা আক্তারের বিবাহ হয় নোয়াখালী জেলার মাইজদী থানার খানবাড়ী গ্রামে। শামীমার স্বামী মাসুদ রানা মানিক চাকুরী করতেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। বর্তমানে তিনি পঙ্গুত্ব বরন করে চলেছেন। শহীদ আবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে রেজাউল করিম শারীরিক প্রতিবন্দ্বী। শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রী রহিমা বেগম সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের মৃত রিফাত উল্লাহ তালুকদারের কন্যা।

স্বামী শহীদ ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নদী ভাঙ্গন কবলিত অচিনপুর গ্রামের স্বামীর ভিটে ছেড়ে অসহায় বিধবা রহিমা খাতুন সন্তানদেরকে নিয়ে প্রথমে পিত্রালয় ইব্রাহিমপুর গ্রামে চলে যান। ২ বছর পিতার বাড়ীতে থাকা খাওয়ার পর এমএনএ দেওয়ান ওবায়দুর রাজা ও হোসেন বখত শত্রুর বাড়ী হিসেবে চিহ্নিত মিনিস্টার বাড়ীটিকে এতিমখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে রহিমা বেগম ঐ এতিমখানায় ২ বছর পিতাসহ সন্তানদেরকে নিয়ে মানবেতর দিনযাপন করেন। পরে পুলিশ গিয়ে আবুল হোসেনের শহীদ পরিবারটিকে মিনিস্টার বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে দিলে তিনি আবার পিত্রালয়ে চলে আসেন। কিছুদিন পরে ঐ এতিমখানাটি কালিবাড়ীস্থ বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানান্তর হলে শহীদ আবুল হোসেনের পরিবারের ঠাই হয় সেখানে। এখানে আরো ১০টি পরিবার বসবাস করতো তাদের সাথে। ৮/৯ বছর পরে কালিবাড়ী এতিমখানাটি উঠে গেলে সকল শহীদ পরিবারের আশ্রয় হয় সিলেটের রায়নগর রাজবাড়ীস্থ এতিমখানায়। সেখানে ছেলেমেয়েদেরকে এতিমখানা স্কুলে ভর্তি করে বিধবা রহিমা বেগম পিতৃগৃহে চলে আসেন। পিতার বাড়ীতে থেকে ১০/১৫ দিন পরপর রহীমা বেগম সন্তানদেরকে দেখার জন্য ছুটে যেতেন রায়নগরে। তাকে দেখতে পেলে সন্তানরা মায়ের সাথে ছুটে আসার চেষ্টা করতো।

রহিমা বেগম শুধুমাত্র সন্তানদেরকে মানুষ করার জন্য এতিমখানায় রেখে আসতেন। কনিষ্ট রেজাউল মাকে ছাড়া থাকতে পারতোনা বলে কান্নাকাটি করলে এতিমখানার দায়িত্বশীলরা তাকে হাতপা বেধে রেখে দিতেন। লেখাপড়া শেষে ২ কন্যা সন্তান বিবাহের উপযুক্ত হলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে এতিমখানা ছাড়তে হয়। তখন বড় মেয়ে রুনিয়া সখীপুরে আনসার ভিডিপি কমান্ডারের চাকুরী পেয়ে সেখানে চলে যায়। ছোট মেয়ে চাকুরী নেয় মহকুমা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনস্থ ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আয়া পদে। বড় মেয়ে আনসার ভিডিপিতে কর্মরত থাকাবস্থায় বড় মেয়ের বিবাহের পর তার চাকুরী হয় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ভিজিটর পদে।

কন্যাদেরকে বিবাহ দেওয়ার পর বিধবা রহিমা বেগম সুরমা নদীর পাড়ে সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের পরিত্যক্ত কার্যালয় সংলগ্ন ২ শতক জায়গা চাচাতো বোনের কাছ থেকে ক্রয় করে বসতভিটা বানিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন একমাত্র প্রতিবন্দ্বী ছেলেকে নিয়ে।

প্রতিবছর আশ্বিন মাসে বিধবা রহিমা বেগমের বাড়ীটি বালুদস্যুরা বালিদ্বারা আবৃত করে ঘেরাও করে রাখে। গত ৩ বছর আগে জেলা প্রশাসন ইব্রাহিমপুর মৌজায় এক একর জায়গা বন্দোবস্ত দেয় তাকে। কিন্তু বন্দোবস্ত পাওয়া জায়গায় তিনি এখন পর্যন্ত মাটি ভরাট বা ভিটেবাড়ী তৈরী করতে পারেননি।

সর্বশেষ ইব্রাহিমপুর সৈয়দপুর রাস্তার পূর্বদিকে ৭ শতক জায়গা ক্রয় করেন বিধবা রহীমা বেগম। ক্রয় করা এ জায়গায় মাটি ভরাট ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদ একটি টিনশেড গৃহ তৈরী করে দিলেও সেই গৃহটি বর্তমানে ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়ে দাড়িয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের কথিত নির্মিত ভিটেবাড়ীটিতে একদিনও থাকতে পারেননি তিনি।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তার আকুল আবেদন “বর্তমানে আপনি বিধবা আর আমি বিধবা হয়েছি ৪৮ বছর আগে। চাইলে আমি ২য় বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুখের সংসার করতে পারতাম। কিন্তু শহীদ স্বামীর সম্মানের দিকে চেয়ে আমি আর সংসার করিনি। আমার স্বামী শহীদ হওয়ার পর আমি কত উস্টাবিষ্টা খাইছি। এখন আর চলতে পারছিনা।

আমি ঘর পাইতাম বিল্ডিং পাইতাম। কতজনে কতকিছু পেয়েছে আমি এতসব চাইনা। অতীতে বহুবার আমি প্রশাসনের কাছে আবেদন নিবেদন করেছি। কিন্তু কেন যে এখন পর্যন্ত একটা ঘর পাইলামনা তা বুঝতে পারছিনা। আমি বাকী জীবন বেঁচে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে মাত্র একটি ঘর চাই।

আল-হেলাল/সুনামগঞ্জ