হাসপাতালের মুল ফটকে তালা। ছবি : প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহার দহগ্রাম ১০ শয্যার হাসপাতালটিতে তালা ঝুলে আছে। স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত সাবেক ছিটমহল দহগ্রাম আঙ্গোরপোতাবাসী। দেশের বহুল আলোচিত সাবেক ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতাবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহার হিসেবে হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন।

জানা গেছে, ইন্দ্র্রা মুজিব চুক্তির মাধ্যমে বেরুবাড়ির বিনিময়ে দহগ্রাম আঙ্গোরপোতা তিনবিঘার মালিকানা পায় বাংলাদেশ। ভারতের অভ্যন্তরে এক টুকরো এ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে কিরডোর ব্যবহার করতে হয়। ১৯৮৫ সালে দহগ্রাম একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সাথে যুক্ত হয়।

১৯৯২ সালে করিডোর গেট হয়ে এক ঘণ্টার জন্য দীর্ঘ বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পান এ দহগ্রাম ইউনিয়নের মানুষ।

 ২০০১ সাল থেকে সারা দিনের জন্য করিডোর গেট খুলে রাখা হলেও সন্ধ্যার পরেই বন্ধ থাকত সেই করিডোরের গেটটি। ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রাম সফরে গিয়ে আজীবনের জন্য করিডোর গেট খুলে রাখার উদ্বোধন করেন। সেই দিনই উপহারস্বরূপ দীর্ঘ বঞ্চিত দহগ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১০ শয্যাবিশিষ্ট দহগ্রাম হাসপাতাল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই থেকে সরকারি কাগজ কলমে সেবা দেয়া হলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের এ হাসপাতালে ঝুলে আছে তালা।

কোনো রোগী নেই হাসপাতালে। ছবি : প্রতিনিধি

উদ্বোধনের মাত্র ৮ বছরের মাথায় ভেঙে পড়েছে হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা। সরকারিভাবে হাসপাতালে জনবল নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী চোখে পড়ে না, হাসপাতালের মূল ফটকে ঝুলে থাকছে তালা। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও ভবনগুলো। চামচিকা বাদুরসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীর বসবাসস্থলে পরিণত হয়েছে এ হাসপাতাল।

চিকিৎসক ও নার্সদের বসবাসের জন্য করা ৮টি কোয়াটার, রোগী পরিবহনের একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার না করায় রুগ্ন হয়ে পড়েছে। পুরো হাসপাতালজুড়ে একমাত্র ওয়ার্ডবয় মিজানুর রহমান পরিবার পরিজন নিয়ে চিকিৎসকের একটি কোয়াটারে থাকেন। রোগীদের থাকার বেডগুলো নিজের কোয়াটারে নিয়ে খাট হিসেবে ব্যবহার করছেন এ ওয়ার্ডবয়।

হাসপাতালের গেটে তালা। ছবি : প্রতিনিধি

স্থানীয়রা জানান, আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা দেয়ার কথা থাকলেও কোনো কারণ বা ঘোষণা ছাড়াই কয়েক বছর ধরে আন্তঃবিভাগ বন্ধ রয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিতে মাঝে মধ্যে কিছু প্যারাসিটামল ট্যাবলেট নিয়ে দুই ঘণ্টার জন্য হাসপাতাল খুলে বসেন দু এক’জন ওয়ার্ডবয় ও নার্স। কখনো চিকিৎসক আসেন। তবে নিয়মিত নন। বিশেষ করে দুপুর ১২টার পর পুরো হাসপাতালে ঝুলে তালা। দুপুরের পর থেকে পরদিন সকাল ১০ টা পর্যন্ত কারো কোনো সমস্যা হলে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতেও ছুটতে হবে পাটগ্রাম হাসপাতালে।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি তথ্যমতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের দিন হতে দহগ্রাম হাসপাতালে আন্তঃ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

এ হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার ৪টি পদেই পূর্ণ থাকলেও দুইজন চিকিৎসক দীর্ঘ ৮/৯ বছর ধরে অলিখিত ছুটিতে রয়েছেন। ডা. নাজমুল ইসলাম ও ডা. আহমেদ মোস্তফা নামে এ দুই চিকিৎসক খাতা কলমে এ হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও বাস্তবে তাদের কোনো সন্ধান নেই খোদ সিভিল সার্জনের কাছেও। বাকি দুইজন বেতন ভাতা তুললেও বাস্তবে কর্মস্থলে নেই। উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার দুইটি পদের একজন কর্মরত থাকলেও বাস্তবে তিনিও অনুপস্থিত। নার্স ৪টি পদের চার জনই এ হাসপাতালের সেবা দেখিয়ে বেতন ভাতা উত্তোলন করলেও বাস্তবে তারা একজনও নেই হাসপাতালে। তবে ১০ শয্যার হিসেব অনুযায়ী সরকারি ওষুধপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হয় এ হাসপাতালে।

দহগ্রামের গৃহবধূ এস্মোতারা বেগম জানান, হাতের কাছে দহগ্রাম হাসপাতাল থাকলেও মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাসহ যে কোনো সমস্যা হলে পাটগ্রাম হাসপাতালে যেতে হয়। এটা শুধু নামেমাত্র হাসপাতাল। মাঝে মাঝে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চিকিৎসক এসে সকল রোগের একই ওষুধ দিয়ে চলে যান। এরপর মরতে বসলেও প্রাথমিক চিকিৎসা জোটে না দহগ্রামবাসীর কপালে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারটি পুনরায় সচল করতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেন তিনি।

আঙ্গোরপোতা গ্রামের কলেজছাত্রী মারুফা আক্তার জানান, দহগ্রামবাসী দীর্ঘদিন নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত বন্দিজীবন কাটিয়েছেন। মূলভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার পর সমতা ফিরাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপহার স্বরূপ এ হাসপাতালটি দিয়েছেন দহগ্রামবাসীকে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এ হাসপাতালটি। নাগরিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত এ হাসপাতালে সেবার মান বৃদ্ধি করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

হাসপাতালের কক্ষে তালা। ছবি : প্রতিনিধি

লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডা. কাশেম আলী জানান, বিনা ছুটিতে দীর্ঘ ৮/৯ বছর অনুপস্থিত থাকা দহগ্রাম হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিষয়ে একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বাকি জনবল হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন এবং সরকারিভাবে তাদের জন্য ওষুধপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জম সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। তবে হাসপাতালে তালা ঝুলে থাকার বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট/এমএআরএস/জেবি