গ্রেফতারকৃত থাই নাগরিক কিয়াটকাট সমইয়োথ। ছবি: আজকের পত্রিকা
প্রতারণা, আত্মসাত ও বিশ্বাস ভঙ্গের মামলায় থাই নাগরিক কিয়াটকাট সমইয়োথকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে আদালত।
১১ সেপ্টেম্বর বুধবার সিএমএম কোর্টে বিচারক রাজেশ চৌধুরী তার জামিন না মঞ্জুর করে আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সমইয়োথ এর বিরুদ্ধে একই আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আদালতে আত্মসমর্পন করতে এসেছিলেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগুলো প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক তার জামিন না মঞ্জুর করেন এবং জেল হাজতে পাঠান। বাদী পক্ষের আইনজীবীগণ তার জামিনের বিরোধিতা করেন।
সিয়াম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমইয়োথ থানাপোল চাকপাওনাম ওরফে কিয়াটকাটি এর বিরুদ্ধে এর বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে বিশ্বাস ভঙ্গ ও প্রতারণা ধারা ৪০৬ ও ৪২০ এবং আত্মাসাৎ এর ধারা ৪০৩ এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলা করেছিলেন অমিত গ্রুপ।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি ২০১৭ সালে একটি ক্লাবের লাইসেন্স অমিত গ্রুপের কাছে হস্তান্তরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তির সময় সমইয়োথ ১ কোটি টাকা গ্রহণ করেছিলেন। অথচ সেই সেই শেয়ার তিনি ২০১১ সালেই অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। বাদী মামলাটি একই আদালতে দায়ের করার পর আদালত মামলাটি পুলিশ বুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে পিবিআই প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রতিবেদনে সমইয়োথ থানাপোল চাওপাকনাম ওরফে কিয়াতকাতি এর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ ও প্রতারণা ধারা ৪০৬ ও ৪২০ এবং আত্মাসাৎ এর ধারা ৪০৩ অনুযায়ী অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
পিবিআই ইনপেক্টর রফিকুল ইসলাম চলতি বছরের জুনে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত তদারকি করেন পিবিআই এর বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সমইয়োথ (পাসপোর্ট নম্বর এএ৬৩৬৫৪৯১) থাই ইন্টারন্যাশনাল রিক্রিয়েশন লিমিটেড (যা থাই ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব নামেও পরিচিত) এর মালিকানা দাবি করেন। ২০১৭ সালে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান অমিত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনে এর কাছে এই মালিকানা বিক্রি করার প্রস্তাব দেন সমইয়োথ । তাদের মধ্যে ৩ কোটি টাকার চুক্তি হয়। চুক্তি সইয়ের সময়ই ১ কোটি টাকার চেক বুঝে নেন এই থাই নাগরিক। সেই টাকা তার একাউন্টে ডেবিটও হয়। বাকি ২ কোটি টাকা মালিকানা হস্তান্তরের সময় গ্রহণ করার ছিল। কিন্তু দীর্ঘ দু বছর পার হলেও এই মালিকানা তিনি হস্তান্তর করেননি। বিষয়টি বাদী পক্ষের সন্দেহ হওয়ায় খোঁজ খবর করতে শুরু করেন। তাতে বেরিয়ে আসে প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের এই চিত্র। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়ে দেয় এই প্রতিষ্ঠানে থাই নাগরিক সমইয়োথ এর কোনো মালিকানা অবশিষ্ট নেই। ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে তার শতকরা ষাট ভাগ শেয়ার ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে সমস্ত শেয়ার তিনি অন্যদেরকে টাকার বিনিময়ে হস্তান্তর করে দেন।
পিবিআইএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জয়েন স্টক কোম্পানির ২০১২ সালের প্রতিবেদন থেকেই সমইয়োথ এর কোনো শেয়ার অবশিষ্ট নেই। সর্বশেষ (২০১৮) প্রতিবেদন অনুযায়ী থাই ইন্টারন্যাশনাল রিক্রিয়েশন লিমিটেড এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জাহাঙ্গীর হোসেন এবং পরিচালক মীর মোঃ কালাম ও মোহাম্মদ।
মামলার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অমিত গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার কামরুজ্জামান শাহীন বলেন, আমরা চেয়েছিলাম এই বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাব না। কিন্তু বার বার থাই এই নাগরিক কথা দিয়েও কথা রক্ষা করেননি। বিশ্বাসভঙ্গ এবং প্রতারণা করেছেন। বাধ্য হয়ে আদালতের দারস্থ হই। পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলেও পরও আমরা চেষ্টা করেছি। চলতি বছরের ৩০ জুলাই দ্যা প্যান প্যাসিফিক হোটেল অনুষ্ঠিত এক মিটিংয়ে এই থাই নাগরিক কথা দিয়েছিলেন তিনি সমস্ত টাকা ফেরত দেবেন। কিন্তু সেটারও বরখেলাপ করেন তিনি।
মামলার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যারিস্টার মুনীম পিয়াস বলেন, আমরা লিগ্যালি লড়ছি। আশা করি আমাদের মক্কেল আদালতে ন্যায় বিচার পাবেন। তদন্ত চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন কোর্টে দাখিল করে।
এদিকে জানা গেছে, থাই নাগরিক সমইয়োথ দীর্ঘদিন ধরে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এদেশে ব্যবসার আড়ালে চটকদার কিছু কর্মকান্ড করে আসছেন। যা বিভিন্নভাবে সমালোচিত হলেও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে তার প্রতারণার ফাঁদে ফেলছেন। সম্প্রতি তার এসব কর্মকান্ডে তাজুল ইসলাম চন্দন নামে একজন যুক্ত হয়েছেন। তিনি কখনো সমইয়োথ এর উপদেষ্টা কখনো আবার মুভি পার্টনার কখনো আবার নিজেকে আইনজ্ঞ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিনি নিজের ক্ষমতা জাহির করার জন্য বলে থাকেন তার ছেলে খুব পাওয়ার ফুল। প্রধানমন্ত্রীর সাথে চলাফেরা করেন। এই ব্যক্তিটি সর্বশেষ মধ্যস্থতার ভার নিয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল যে, এই ব্যক্তি সমইয়োথ এর বাংদেশের সম্পত্তি গ্রাস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় সমইয়োথকে মামলার বেড়াজালে ফেলা হচ্ছে। এসব সমইয়োথ এর কাছের একটি সূত্র জানিয়েছে। সমইয়োথ এর কর্মকান্ড সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশের কিছু স্পা সেন্টার পরিচালনা করেন সমইয়োথ ও তার মেয়ে। এসব স্পা সেন্টারে যেসব থাই নারীদের কাজ করানো হয় সেসব আমদানী সমইয়োথ এর মাধ্যমেই করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে বিভিন্ন প্রকল্পের তত্ত্ব হাজির করে তাদের কাছ থেকে বিনিয়োগ খসানোর চেষ্টা করেন সমইয়োথ। চটকদার এসব প্রকল্পের জালে অনেকে ফেঁসে গেছেন এরইমধ্যে আবার অনেকে ফাঁসার অপেক্ষায়।
তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, নাফ টুরিজম নামে বাংলাদেশে একটি টুরিজম কেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন সমইয়োথ। এ জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এরই মধ্যে বিনিয়োগ খসােনোর ফাঁদ পেতেছেন তিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রতারণামূলক কর্মকান্ড বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রীতিমতো সন্দেহ তৈরি করেছেন। অনেকেই তার উপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীরা। ভূক্তভোগীরা সমইয়োথ এর এসব কর্মকান্ড বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হয়। 
আজকের পত্রিকা/কেএফ