কাজী ফয়সাল
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

পুড়ে যাওয়া বস্তি ও সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের আহাজারি। ছবি: আজকের পত্রিকা

দারিদ্রতাই যেনো তাদের কাল! রাজধানী ঢাকায় শহুরে দরিদ্রদের বসবাস বস্তিতেই। আজ এই বস্তি, কাল ওই বস্তি, এমন করে কিছুদিন পর পরই আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় তাদের সহায় সম্বল, তাদের স্বপ্ন! মিরপুরে চলন্তিকা বস্তিতে ১৬ আগস্ট রাতে দীর্ঘ চার ঘণ্টার ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে পোড়া টিনের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে হাজারো বস্তিবাসির স্বপ্ন।

কড়াইল বস্তি, কালসি বস্তিসহ মিরপুরের একাধিক বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা সবারই জানা। কিন্তু এই আগুনের ঘটনার রহস্য স্পষ্ট করে আজো জানতে পারেনি কেউ। যদিও প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান মেয়র, এমপি, মন্ত্রীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্তাব্যক্তিরা। তবুও এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বন্ধের বিষয়ে নেই দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ। সামান্য আর্থিক সহায়তা ও সাময়িক সময়ের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাননা বস্তিবাসী।

বস্তিতে প্রায় অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানকার ক্ষতিগ্রস্তদের মুখ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়- বহুতল ভবন নির্মানের জন্যই ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে স্বর্থন্বেসী মহল পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। তবে ভুক্তভোগীরা তাদের নিজ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এই অভিযোগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রসাশনের সামনে সরাসরি বলতে সাহস পায় না।

জনপ্রতিনিধিদের কাছে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সে বা তারা উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন- যে বা যারা অভিযোগ করেছে তাদের আমার সামনে এসে বলতে বলেন। তারপর বিষয়টা আমলে নেবো।

আগুনের ঘটনার পরের দিন ১৭ আগস্ট মিরপুর রূপনগরের ৭ নম্বর সেকশনের মিল্কভিটা রোড়ে গিয়ে দেখা যায় ওই চলন্তিকা মোড় সংলগ্ন বস্তিরবাসীর কান্নার রোল। তারা পুড়ে যাওয়া টিনের নিচে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের সহায় সম্বল ও তাদের স্বপ্নগুলো। পুরো বস্তি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। শুধু অবশিষ্ট টিনগুলো আগুনে পুড়ে ধুসর রং ধারণ করে রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে এখনো অল্প অল্প ধোঁয়া দেখা গিয়েছে। দূর থেকেই বাতাসে পাওয়া যাচ্ছিলো বস্তির পোড়া গন্ধ।

ইতোমধ্যে পুড়ে যাওয়া বস্তি পরিদর্শন করেছেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান এবং ঢাকা -১৬ আসনের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা।

ওই বস্তির বাসিন্দা আলেয়া বেগম আজকের পত্রিকাকে বলেন, আমার মতো হাজার হাজার মানুষের স্বপ্ন অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে গেছে। হাত আর পা ছাড়া  আমাগো এখন আর কিছুই নেই। আগুন লাগার পরই এক পোষাকে বের হয়ে গেছি। পড়নের এই কাপড়গুলো নষ্ট হলে কি পড়বো জানি না। খাওয়া, গোসল, থাকার ব্যবস্থা কোন কিছুরই ঠিকঠাক বন্দবস্ত হয়নি। স্বামীসহ তিনটা বাচ্চা নিয়ে রাস্তার উপরই খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত পার করছি। শক্তিশালীরা আমাগো মতন নিরীহ, দারিদ্র মানুষের উপরের তাদের ক্ষমতা দেখান। আর কিছু বলতে চাই না।

রহিমা বেগম নামের একই বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, গোলার মতো আগুন জ্বলেছে। মনে হয়েছে, কেরোসিন দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে।

পরিবারি নিয়ে পুড়ে যাওয়া বস্তির একটি ঘরে থাকতেন তিনি। তার মোট ৩ টি ঘর ছিল, বাকি দুটি ঘর ভাড়া দিতেন। সেই দু’টিও পুড়ে গেছে। সাভারের আমিন বাজার থেকে এখানে প্রায় ৩০ বছর আগে এসেছেন। আমিন বাজারে তাদের কিছুই নেই।

সুমি আক্তার নামের এক বাসিন্দা বলেন, কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন দিয়েছে। আমাদের মতো গরিবকে এখানে থাকতে দেবে না। তাই সব পুড়িয়ে দিয়েছে অমানুষরা।

রফিকুল ইসলাম নামের এক রিকসা চালক বলেন, এমন ভয়বহ আগুন জীবনেও দেখিনি। সব পুইড়া গেছে আমাদের। আমার সন্দেহ আমাদের এই বস্তিতে কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

তবে নাশকতার বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো রকমের তথ্য নেই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোশতাক আহম্মেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, আগুনে ঘটনা আমরা তদন্ত করছি। এটি পরিকল্পিত আগুন- এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে এখনো কেউ করেনি,অথবা আমরা এমন কোনো তথ্যও পাইনি।

চলন্তিকা বস্তির আগুনে হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত

মিরপুরের চলন্তিকা বস্তিতে ১৬ আগস্ট শুক্রবার রাতে লাগা আগুনে বস্তিতে থাকা ৩ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, এখানে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ ঘর ছিল। আমরা কিছু ঘর এবং পরিবারগুলো রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। তবে আগুনে বস্তির ৩ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারনা করছি। ১৭ আগস্ট শনিবার সকালে চলন্তিকা মোড়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রেজাউল করিম আরো বলেন, আগুনে বেশির ভাগ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের অনুসন্ধান চলছে। প্রথম থেকে আমাদের কাজ করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কারণ, টিনের চালাঘর সব ধসে পড়েছে। এগুলো সরিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, আগুন নেভাতে আমাদের ২৪টি ইউনিট কাজ করেছে। কেউ নিহত হননি, তবে ৪ জন আহত হয়েছেন।

তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আজকের মধ্যেই সেটি হয়ে যাবে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

তিনি আরো বলেন, এখানে অনেক দাহ্য বস্তু ছিলো। গ্যাসের সংযোগগুলো ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলো। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বস্তির আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হলো, সহজেই দাহ্য হয় এমন বস্তু দিয়ে বস্তির ঘরগুলো তৈরি করা হয়। আর ঘরগুলো পাশাপাশি একত্রে লাগানো থাকে। কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না। এজন্যই বস্তির আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আজকের পত্রিকা/কেএফ