সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

ভারত পেঁয়াজ দিচ্ছে না, তাই মাস খানিক ধরেই বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারে আগুন! এরইমধ্যে লবণের বাজারে শুরু হলো নতুন করে গুজব! গুজব সৃষ্টিতে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হয়, সে অনেক পুরনো কৌশল। কিন্তু মানুষের মূল্যও বৃদ্ধি হয় কি? মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস যা-ই হোক, ভারতীয় মিডিয়া সৃষ্ট বিভিন্ন গুজবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন এক অদ্ভুত ধোঁয়াশার ভেতর অবস্থান করছে। এই ধোঁয়াশা তৈরির পাত্র-পাত্রীরা ভারতীয় গণমাধ্যমে এক ধরনের কথা বললেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাছে এলেই কী যেন এক লুকোচুরি শুরু হয়ে যায়।

কথা হচ্ছে খ্যাতিমান ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী জয়া আহসান এবং রাফিয়াথ রশিদ মিথিলার প্রেম ও বিয়ে সংক্রান্ত গুজব নিয়ে। সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে প্রেম করছেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী জয়া আহসান। কলকাতায় তারা ‘লিভ টুগেদার’ করছেন- এমন একটি গুঞ্জন বহুদিন ধরেই শোনা গেছে শোবিজ অঙ্গনে। এমনকি টালিউডে জয়ার আধিপত্যের পেছনে এখনো সৃজিতকেই বড় করে দেখেন এপার ও ওপার বাংলার অনেকেই। যদিও প্রথম থেকে পুরো বিষয়টিকেই অস্বীকার করে গেছেন জয়া-সৃজিত দুজনই। ভারতীয় গণমাধ্যম যখন একের পর এক জয়া-সৃজিতের প্রেম কাহিনী-লিভ টুগেদার এবং বিয়ের গুঞ্জন ছড়িয়েছে, দুজনই বারবার নিজেদের শুধুমাত্র ‘ভালো বন্ধু’ বলে দাবি করেছেন সব জায়গায়।

সৃজিত-জয়া বারবার নিজেদের শুধুমাত্র ‘ভালো বন্ধু’ বলে দাবি করেছেন সব জায়গায়। ছবি: সংগৃহীত

ভারতীয় একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয়া বলেছিলেন, ‘শিল্পী হিসেবে সৃজিতের সঙ্গে আরও কাজ করতে চাই। আমরা একসঙ্গে পথ চললে, সেটা একটা বলার বিষয় ছিল। কিন্তু এটা পুরো গুজব!’ তবে সে সময় ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়ার প্রতি সৃজিতের উচ্ছ্বাস ছিল অনেকটা এ রকম- ‘জয়ার মতো অভিনেত্রী, জয়ার মতো মানুষ, জয়ার মতো নারী আমি খুব কম দেখেছি। এই সম্পর্ক বন্ধুত্ব, প্রেম বা তার চেয়েও বেশি কিছু।’

কলকাতার সিনেমা তারকাদের সঙ্গে সৃজিত ও জয়া। ছবি: সংগৃহীত

নতুন করে মিথিলা-সৃজিতের বিয়ের খবরে তোলপাড় দুই বাংলার গণমাধ্যমগুলো। ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আসছে ফাল্গুনে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন দুই দেশের এই দুই তারকা। আগামী বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করবেন সৃজিত মুখার্জি ও মিথিলা- টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইন সংস্করণকে এ খবর নিশ্চিত করেছেন সৃজিতের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সম্প্রতি বাংলাদেশের ফোক ফেস্টেও ঘুরে গেছেন সৃজিত, সাথে ছিলেন মিথিলা। দুজন মিলে ঢাকার বেশ কিছু শপিংমলে বিয়ের শপিং সেরেছেন বলেও খবর এসেছে। জানা গেছে, এবার ঢাকায় মিথিলার পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়ে যান সৃজিত।

এবার ঢাকায় মিথিলার পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়ে যান সৃজিত। ছবি: সংগৃহীত

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘সংবাদ প্রতিদিন’র এক প্রশ্নে সৃজিত বলেছেন, ‘মিথিলার পরিবারকে আমি অনেক দিন ধরে চিনি। তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আমার বিশেষ কোনো কারণের প্রয়োজন নেই। বিয়ে নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাইছি না।’ এর আগে কলকাতায় দুর্গাপূজায় অষ্টমীর দিন এই মিথিলা আর সৃজিতকে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে। তাদের সেইসব ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ছবিগুলোর নিচে জড়ো হয়েছে লাখ লাখ লাইক ও মন্তব্য। সেখানে অষ্টমীর শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ছবির মানুষদের অভিনন্দন জানিয়েছেন ভক্তরা। এক বন্ধু লিখেছেন, ‘গুজব তাহলে সত্য ছিল। আপনাদের বিবাহবন্ধনের জন্য অভিনন্দন!’ অভিনেত্রী স্বাতী বসু মুখার্জি লিখেছিলেন, ‘ভালো থেকো, ভালো রেখো।’ সৌরভ নন্দী নামের এক ভক্ত লিখেছেন, ‘ভালো, দুই বাংলা জুড়ে যাবে।’

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল সৃজিত মুখার্জির জন্মদিন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সৃজিতের পরিবারের সঙ্গে মিথিলাকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায় কেক কাটার সময়। এর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, গত কোরবানির ঈদের ছুটিতেও মিথিলা কলকাতায় এসে সৃজিতের সঙ্গে দেখা করেছেন। জয়ার সাথে সম্পর্কের মতো মিথিলার সাথে সম্পর্কের বিষয়েও ভারতীয় গণমাধ্যমকে এড়িয়েছেন সৃজিত।

মিথিলার সাথে তার সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমি ২০১০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যে কয়জন নায়িকার সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশের সঙ্গে আমার প্রেমের জল্পনা হয়েছে। এটাকে আমি পেশাগত বিড়ম্বনা হিসেবে মেনে নিয়েছি। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে এসব জল্পনা অধিকাংশ সময়ই ভিত্তিহীন হয়েছে, আর কিছু সময়ে সঠিক হয়েছে। যেহেতু আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু জানি না, তাই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে বলা মুশকিল। তবে মিথিলা আমার ভালো বন্ধু, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।’

জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সৃজিতের পরিবারের সঙ্গে মিথিলাকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায় কেক কাটার সময়। ছবি: সংগৃহীত

সৃজিতকে নিয়ে মিথিলার উত্তরগুলোও বরাবর রহস্যময় ছিল। গণমাধ্যমকে তিনি সব সময়ই বলেছেন, ‘অনেক আগে থেকেই সৃজিতের সঙ্গে আমার পরিচয়। এর আগেও আমাদের দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমাদের দুজনের কয়েকজন কমন বন্ধু আছে। ইদানীং কাজের সুবাদে যোগাযোগটা বেশি হয়।’

গত কোরবানির ঈদের ছুটিতেও মিথিলা কলকাতায় এসে সৃজিতের সঙ্গে দেখা করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে সৃজিত-মিথিলার বিয়ের খবর গণমাধ্যমে চাউর হতেই ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন, আগামী বছর বিয়ে করছেন জয়া আহসানও। আগামী ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় মুক্তি পেতে যাচ্ছে জয়া-প্রসেনজিৎ অভিনীত ছবি ‘রবিবার’। ১৮ নভেম্বর ছবি মুক্তি প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জয়া আহসানের ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা হয়। কলকাতার এক তারকার বরাত দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, জয়া নাকি বাংলাদেশের একজনের সঙ্গে প্রেম করছেন। এছাড়া আগামী বছর নাকি বিয়েও করবেন? জয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাহলে কি সংবাদটি গুজব? এমন প্রশ্নের জবাবে জয়া বলেন, ‘আমি প্রেম করছি। যার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছি তিনি বাংলাদেশের। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেউ নন। কিন্তু বিয়ের দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি।’

বিয়ের খবরের কোনো সত্যতা নেই বলে জানিয়েছেন জয়া। ছবি: সংগৃহীত

এ খবরগুলো কিংবা বলা যায় গুজবগুলো মূলত ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে পাওয়া। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো একেকটি খবর প্রকাশ করে কিন্তু বাংলাদেশে এলেই যেন সব গুজব, উড়ো খবর, মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন এই তারকারা। জয়ার বিয়ের খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করলেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রথম আলোকে এ খবরের কোনো সত্যতা নেই বলে জানিয়েছেন জয়া। ওই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমার বিশেষ বন্ধু আছে। কিন্তু সেটা কখনোই প্রেমঘটিত কিছু না। অনেক দিন ধরে টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে আমাকে প্রশ্ন করেছিল প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক নিয়ে। আমি কিন্তু তাঁদের বলেছি, আমার স্পেশাল বন্ধু আছে। খুবই ভালো বন্ধু আছে। কিন্তু এটা কখনোই প্রেম কিংবা ভালোবাসা নয়। আর বিয়ের তো প্রশ্নই ওঠে না।’

জয়া-সৃজিত-মিথিলার এই প্রেম ও বিয়ে কাণ্ড কিছু কিছু ক্ষেত্রে হার মানাচ্ছে বাজারের পেঁয়াজ আর লবণের দামকেও। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, কোনটা গুজব- তা কি কেবল ভারতীয় গণমাধ্যমই জানে? বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এলেই সব লুকোচুরি লুকোচুরি গল্পে পরিণত হয়!

আজকের পত্রিকা/সিফাত