মাহমুদ উল্লাহ্‌
বিজনেস করেসপন্ডেন্ট

পাঁচটাকার ডাক্তারবাবু ডা. গৌরাঙ্গ গোস্বামী। ছবি: ইন্টারনেট

কালনা স্টেশনে নেমে তাঁর বাড়ি যাওয়ার কথা বললে ভাড়া নিতে চান না কোনো রিকশা চালক। পাড়ায় ঢুকে নাম বলে বাড়ি চিনতে চাইলে এলাকাবাসীর চোখে–মুখে ফুটে ওঠে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। ‘ডাক্তার বাবুর’ অতিথির যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, তাই আগন্তুককে বাড়ি দেখিয়ে দিতে নিজের কাজ ফেলে উঠে আসেন প্রতিবেশীরা। তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলে, কেউ বলেন সাক্ষাৎ ঈশ্বর।

তিনি ডা. গৌরাঙ্গ গোস্বামী। কলকাতার কালনা এবং তার আশপাশের অঞ্চলে তিনি বিখ্যাত ‘পাঁচ টাকার ডাক্তার বাবু’ নামেও।

চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি যৎসামান্য পারিশ্রমিকে বা বিনা পারিশ্রমিকে রোগী দেখে চলেছেন এই অঞ্চলে। পাশাপাশি বামপন্থী রাজনীতিতে এখনো সক্রিয় কর্মী তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা কোনো শ্রেণিগত বিভেদের কারণে এই চিকিৎসক কোনো দিন কোনো রোগীকে ফেরাননি বলে দরাজ ‘সার্টিফিকেট’ দিয়ে রাখছেন এলাকাবাসীরাও। বামপন্থী গৌরাঙ্গের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্থানীয় তৃণমূল কিংবা বিজেপি সমর্থকরাও। রাজনৈতিক হানাহানির এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই কালনার ভূমিপুত্র গৌরাঙ্গ এক বিরল চরিত্র।

১৯৭৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন গৌরাঙ্গ। তারপরে ভর্তি হন ‘এমএস’–এর পঠনপাঠনে। কিন্তু সেই পড়াশুনো শেষ করতে পারেননি। কারণটা রাজনৈতিক। ততদিনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাই পরে উত্তরবঙ্গের একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরি পেয়েও কালনাতেই ফিরে আসেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু। ন্যূনতম পারিশ্রমিকে রোগী দেখা শুরু করেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় নানা জিনিসের দাম বাড়লেও গৌরাঙ্গের পারিশ্রমিক বেড়ে হয়েছে মাত্র পাঁচ টাকা! নিজের বাড়িতেই চেম্বার বানিয়ে রোগী দেখেন গৌরাঙ্গ।

রোগী দেখার ফাঁকে তিনি বলছিলেন, ‘ওই সরকারি চাকরিটায় যোগ দিলে বদলি হতেই হতো। কোথায় কখন থাকতে হতো কে জানে? কালনার মানুষের সেবা করার সুযোগ পেতাম কি না, সেটাও নিশ্চিত নয়। তাই ভাবলাম চাকরি ছেড়ে এখানেই প্র্যাক্টিস শুরু করা যাক।’

সকাল দশটা থেকে শুরু হয় গৌরাঙ্গের রোগী দেখা। দুপুর একটা পর্যন্ত রোগী দেখে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেন তিনি। তারপরে দুপুর তিনটে থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় তার সময় কাটে রোগী–স্টেথোস্কোপ–প্রেসক্রিপশন নিয়ে। ফের এক ঘণ্টা বিশ্রাম। তারপরে সন্ধে ছ’টা রাত একটা–দেড়টা পর্যন্ত তার কাছে ভিড় জমান রোগীরা।

গৌরাঙ্গে জানালেন, অনেক সময়েই বিশ্রামের সময়েই কোনো ইমার্জেন্সি কল এসে গেল। তখন তো আর চুপ করে বসে থাকা যায় না।

বিশ্রামের সময় কাটছাঁট করেই নিজের মোটরবাইকে চড়ে রোগী দেখতে ছোটেন গৌরাঙ্গ। তিনি বলছিলেন, ‘রাত একটা পর্যন্ত রোগী দেখি মানে এমন নয় যে তারপরে রোগী এলে দেখব না। আমার বাড়ির দরজা রোগীদের জন্য সবসময়ই খোলা।’ দৈনিক দু’শো থেকে আড়াইশোজন রোগীর চিকিৎসা করতে হয় তাকে।

কিন্তু মাত্র পাঁচ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে সব সাংসারিক প্রয়োজন মেটে? গৌরাঙ্গ বললেন, ‘আমি যে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, তাতে এর চেয়ে বেশি টাকা লাগে না। তাছাড়া একজন কমিউনিস্টের জীবন এ রকমই হওয়া উচিত। প্রয়োজনের বেশি উপার্জনের দরকার আমার নেই।’

এলাকায় গৌরাঙ্গের জনপ্রিয়তা কতটা সেটা বোঝা যায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললেই। কালনা স্টেশন লাগোয়া দোকানের ব্যবসায়ী সাধন সাহার কথায়, ‘অনেকে ভাবেন, যে চিকিৎসকের পারিশ্রমিক কম, তিনি বোধহয় ততটা দক্ষ নন। কিন্তু গৌরাঙ্গবাবুর কাছে শুধু কালনা নয়, হুগলি ও নদিয়া এমনকী কলকাতা থেকেও রোগী আসেন। আমি এমনও দেখেছি, কলকাতায় নামজাদা চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করিয়েও তারা গৌরাঙ্গবাবুর কাছে এসেছেন। কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলেছেন, তাদের রোগের ব্যাপারে কলকাতার চিকিৎসকরা বিস্তারিত কথা বলেননি। ওষুধ লিখে দিয়েই দায় সেরেছেন। গৌরাঙ্গবাবুর কাছে আসার পরে কী হয়েছে, কেন হয়েছে, রোগের অবস্থা কতটা গুরুতর— এসবই সহজভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। আবার কেউ হয়তো আত্মীয়স্বজনের চাপে কলকাতায় চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন, তারপরে আবার ফিরে গৌরাঙ্গের কাছেই এসেছেন। কাগজপত্র দেখিয়ে জানতে চেয়েছেন, তার ঠিক চিকিৎসা হয়েছে কি না! আসলে ওর ব্যবহার এতটাই ভালো যে কথা বললেই রোগী নিশ্চিন্ত হয়ে যান। অর্ধেক অসুখ তো ওখানেই সেরে যায়। তাছাড়া যত রাতই হোক, ওর কাছে কাছে কোনো রোগী গেছেন, তবু তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনটা কখনো হয়নি।’

স্থানীয় গৃহবধূ রিনা সূত্রধর আবার বললেন, ‘গৌরাঙ্গবাবু সাক্ষাৎ ঈশ্বর। কম পারিশ্রমিকে চিকিৎসা ছাড়াও কত মানুষকে যে উনি বিনামূল্যে ওষুধ দিয়েছেন বা চিকিৎসার খরচের জন্য অর্থ সাহায্য করেছেন, সেটা গুনে শেষ করা যাবে না। এমনকী, পাঁচটাকা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না যাদের, তাদের বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করেন উনি।’ স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ পোদ্দারের কথায়, ‘শুধু পারিশ্রমিক কম নেওয়া কিংবা রোগীর সেবা করাটাই বড় কথা নয়। কালনায় এমন একজনও নেই, যিনি গৌরাঙ্গকে শ্রদ্ধা করেন না। অগ্নীশ্বর ফিল্মে উত্তমকুমার যে চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, তিনি যেমন সর্বজনশ্রদ্ধেয় একটি চরিত্র ছিলেন, এখানে গৌরাঙ্গও তেমন।’

ভালো ব্যবহারই যে তার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, সেটা পরোক্ষে মেনে নিচ্ছেন গৌরাঙ্গ নিজেও। তিনি বলছেন, ‘অনেক চিকিৎসকই শুধু প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে কাজ সারেন। ব্যস্ততা হোক কী অন্য কোনও কারণ, তারা রোগীকে সময় দিতে পারেন না। আমি মনে করি, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হওয়া উচিত। অসুখ হলে যে শুধু শরীরের ওপরে প্রভাব পড়ে, তাই নয়। মনও তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন ভালো থাকলে শরীরও জলদি সেরে ওঠে।’

এক সময় কালনা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন গৌরাঙ্গ। ছিলেন জেলা কমিটির সদস্যও। বর্তমানে সিপিএম কালনা কমিটির সদস্য তিনি। রাজনীতি এবং চিকিৎসা— একসঙ্গে সামলান কী করে? গৌরাঙ্গ বললেন, ‘যখন যেটা করি, তখন সেটাই মন দিয়ে করি। তাহলেই দুটো কাজের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।’

আজকের পত্রিকা/এমইউ