শবে বরাতের রাতে মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে অবস্থান করেন। ছবি: সংগৃহীত

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শবে বরাত ২১ এপ্রিল। হিজরি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটিই শবে বরাতের রাত হিসেবে পালন করা হয়।

আরবি ভাষায় ‘শব’ অর্থ রাত, আর ‘বরাত’ শব্দের অর্থ ভাগ্য। এই দুই শব্দের সম্মিলনে গঠিত শবে বরাতের অর্থ ‘ভাগ্য রজনী’ বা ‘ভাগ্যের রাত’ বা ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত’। এছাড়া, মুক্ত হওয়া বা বিচ্ছেদের রাত অর্থেও শবে বরাত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অপরাধীরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে, এক্ষেত্রে বান্দার বন্দেগির সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়। আর আল্লাহর ওলিরা পার্থিব অপমান-লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত হয়ে যায় (ইবনে মাজাহ)।

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতই শবে বরাতের রাত। শাবান অর্থ শাখা-প্রশাখা হওয়া। অর্থাৎ মাহে রমজানের অবারিত কল্যাণ ও বরকত হাসিলের বিভিন্নমুখী দ্বার খুলে দেওয়া হয়। আর তাই রসুলে করিম (স.) রজব মাস থেকে দোয়া করেছেন। হে আল্লাহ, রজব ও শাবানের অবারিত কল্যাণ ও বরকত দান কর এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছার তৌফিক দান কর।

পবিত্র কোরআনের আলোকে শবে বরাত: সুরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি একে (কোরআন মজিদকে) বরকতপূর্ণ রাতে নাজিল করেছি।’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র.), আবু হুরায়রা (রা.), হজরত ইকরামা (রা.)-সহ বহু সাহাবি-তাবেয়ির মতে, ১৪ শাবান দিবাগত রাতকেই বোঝানো হয়েছে।

লাইলাতুল মুরাবকাহ হলো-শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, আর তাই লাইলাতুল বরাত (গুনিয়াতুত তালিবিন)। ইকরামা (রা.) বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা জিবরাইল (আ.)-কে ওই রাতে প্রথম আকাশে প্রেরণ করেন। ওই রাত হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত। এ রাতকে মোবারক নাম রাখার কারণ হলো যেহেতু ওই রাতে বরকত কল্যাণ নাজিল হয়।’

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় রাসুলে করিম (স.) ইরশাদ করেছে, যখন শাবানের ১৫ তারিখ হয়, সে রাতে আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়িয়ে ইবাদত কর, দিনে রোজা রাখ। কেন না, এ রাতে সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমান থেকে বলতে থাকেন কেউ কী আছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাকে আমি ক্ষমা করব? রিজিক প্রার্থী কেউ আছে কী, যাকে আমি রিজিক দেব? বিপদগ্রস্ত কেউ আছে কী? যাকে আমি সুস্থতা দান করব। এমনিভাবে সুবেহ সাদিক পর্যন্ত আল্লাহর তরফ থেকে বান্দাদের উদ্দেশ্য ঘোষণা হতে থাকে। (ইবনে মাজাহ)

শবে বরাতে করণীয়

বিভিন্ন হাদিস থেকে শবে বরাতে করণীয় ইবাদত সম্পর্কে জানা যায়। এ রাতে গোসল করা মোস্তাহাব, গোসলের পর দুই রাকাত তাহিয়াতুল অজুর নামাজ, তারপর দুই রাকাতের নিয়তে প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতিহা ও সুরা ইখলাছ সহকারে ৮ রাকাত নামাজ পড়তে হয় বলে বর্ণিত আছে। বলা আছে রোজা রাখার কথাও। রোজা রেখে ইবাদত করা, ইবাদত করে রোজা রাখা— দু’টোই উত্তম। কেন না, সারাদিন রোজা রেখে ইবাদত করলে ইবাদতে মন বসে। যাবতীয় গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। রিজিকের জন্য দোয়া করতে হবে। তওবা করতে হবে। তওবা তিনটির সমন্বয়ে হয়—

ক. কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে,

খ. পাপকাজ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে, এবং

গ. ভবিষ্যতে পাপ না করার অঙ্গীকার করতে হবে।

শবে বরাতে উভয় জাহানের কল্যাণ কামনা করতে হবে। নফল নামাজ পড়তে হবে। কবর জিয়ারত করতে হবে। আল্লাহর রহমত কামনা করতে হবে। কেননা, আল্লাহর রহমত না হলে এ রাতে কোনো ইবাদতই করতে পারব না। আর ইবাদত করার পর কবুল হবে না কারণ, আল্লাহর রহমত না হলে ইবাদত কবুল হবে না। এ জন্য ইবাদতের বড়াই বা অহংকার করা যাবে না।

শবে বরাতে বর্জনীয় কাজ

আতশবাজি, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা, হালুয়া রুটি এ রাতেই বানাতে হবে— এমন ধারণা দূর করতে হবে। শিরনি বা জিয়াফতের নিয়মে খাদ্য রান্না করা বা অন্য যেকোনো খাদ্য উপকরণ শুধু এ রাতেই নয়, অন্য যেকোনো দিনও রান্না করা যেতে পারে। মসুর ডাল রান্না করতে হবে— এ ধারণাও দূর করতে হবে। শবে বরাতে প্রচুর শিরনি বানাতে গিয়ে মহিলাদের ইবাদত থেকে বঞ্চিত রাখার প্রথা বর্জন করতে হবে।

আজকের পত্রিকা/মির/সিফাত