পঞ্চগড়ে খামারিদের মানববন্ধন।

টার্কি মুরগি পালনের নামে প্রতারণার মাধ্যমে পঞ্চগড় থেকে ১৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কোম্পানীটি। টার্কি মুরগি প্রতিপালন প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৯০ দিনের মাথায় লাখ টাকার স্বপ্ন দেখায় ওই ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার আশায় এনজিও’র ঋণ অথবা জমি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে টাকা সংগ্রহ করে কিংবা লগ্নি করে এখন পথে বসেছে চারশ’ ব্যক্তির চারশ পরিবার।

আগে কোম্পানির চেয়ারম্যান প্রতারক মানিক চন্দ্র মোবাইল ফোন রিসিভ করলেও কয়েকদিন ধরে তার ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল ফোনই বন্ধ রয়েছে। অবশেষে তারা তাদের টাকা উদ্ধারে শরনাপন্ন হয়েছেন জেলা প্রশাসকের কাছে।

 

‘স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস টার্কি ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টার্কি মুরগি প্রতিপালন প্রকল্পের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের প্রায় চারশ খামারির কাছ থেকে ১৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টাকা ফেরতের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।

২১ মে মঙ্গলবার পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কের পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচিতে গোটা জেলার নারী পুরুষ চার শতাধিক ক্ষতিগ্রস্থ খামারি অংশ নেন।

এসময় ক্ষতিগ্রস্থ খামারীদের পক্ষে শাহ আলম, ওসমান গণী, আরফিক হাসান, এম এ বাশার, সামিজান বেগম, খালেদা আক্তার অবিলম্বে স্বপ্নতরীর চেয়ারম্যান মানিক চন্দ্র বর্মনের কাছ থেকে ১৩ কোটি টাকা আদায়সহ তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

লাখ লাখ টাকার স্বপ্ন দেখিয়ে চারশ’ জন উদ্যোক্তা খামারীর স্বপ্ন ভঙ্গ করে ১৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন লাপাত্তা স্বপ্নতরী সার্ভিসেস লিমিটেড নামের নাম সর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠান।

টার্কি মুরগি প্রতিপালন প্রকল্পোর মাধ্যমে মাত্র ৯০ দিনের মাথায় লাখ টাকার স্বপ্ন দেখায় ওই ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার আশায় এনজিও’র ঋণ অথবা জমি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে টাকা সংগ্রহ করে লগ্নি করে এখন পথে বসেছেন চারশ’ ব্যক্তির চারশ পরিবার। আগে কোম্পানির চেয়ারম্যান প্রতারক মানিক চন্দ্র মোবাইল ফোন রিসিভ করলেও কয়েকদিন ধরে তার ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল ফোনই বন্ধ। অবশেষে তারা তাদের টাকা উদ্ধারে শরনাপন্ন হয়েছেন জেলা প্রশাসকের কাছে।

ক্ষতিগ্রস্থ খামারিরা ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জের ‘স্বপ্নতরী সার্ভিসেস লিমিডেট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান টার্কি মুরগি প্রতিপালনের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়। যার রেজিঃ নং-সি-১৪৫৫১৯/১৯। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মানিক চন্দ্র রায়ের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরের গড়েয়া এলাকার গড়েয়া গোপালপুর গ্রামে। তার বর্তমান ঠিকানা দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ৪ নং ওয়ার্ডের সুজালপুর সুইচগেট এলাকায়। এই প্রতিষ্ঠানটি এলাকাভিত্তিক এরিয়া ম্যানেজার, ইউসি ও এফও নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে টার্কি মুরগি প্রতিপালন প্রকল্পের নামে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এমনটি শহরাঞ্চলের সহজ সরল মানুষদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

তারা প্রতিটি প্যাকেজ ২৪ হাজার ৮শ’ টাকা করে মানুষদের কাছে স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করে টাকা হাতিয়ে নেয়। চুক্তি অনুযায়ী মুরগির বাচ্চা দেয়ার পর পরবর্তী ৯০ দিন মুরগির খাবার ও চিকিৎসা খরচ কোম্পানি থেকে বহন করবে। ৯০ দিন পর কোম্পানি সেই মুরগি নিয়ে যাবে।

এ সময় খামারিকে প্যাকেজ প্রতি সাড়ে ৮ হাজার টাকা লাভসহ সর্বমোট ৩৩ হাজার ৩শ’ টাকা প্রদান করবে। এভাবে একেকজন খামারি একটি থেকে শুরু করে ২৫-৩০টি প্যাকেজের জন্য কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে টাকা দিয়ে স্ট্যাম্পে চুক্তিবদ্ধ হয়। অনেককে আবার ওই পরিমান টাকার চেকও প্রদান করে।

লোকজনদের আস্থা অর্জন করার জন্য প্রথম কিস্তিতে ৯০ দিনের মধ্যে পুরো লভ্যাংশের টাকা প্রদান করে কোম্পানিটি। এদের অনেককে আবার লাভের টাকা দেয়ার পর মূল টাকা না দিয়ে আরো বেশি টাকার লাভের লোভ দেখিয়ে দ্বিগুন পরিমান টাকা হাতিয়ে নেয়। এরা তাদেরকে আর মুরগির বাচ্চাও দেয়নি। চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদপূর্তির পর তাদের আসল টাকাও ফেরত দেয়নি কোম্পানিটি। অবশেষে ক্ষতিগ্রস্থরা তাদের টাকা উদ্ধারে মাঠে নেমেছেন।

ক্ষতিগ্রস্থ খামারিরা বলেন, স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস টার্কি ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেড টার্কি মুরগি প্রতিপালন প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৯০ দিনের মাথায় লাখ টাকার স্বপ্ন দেখিয়ে পঞ্চগড়ের প্রায় চারশ খামারির কাছ থেকে প্রায় ১৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। অনেকে এনজিও’র ঋণ অথবা জমি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে টাকা সংগ্রহ করে তা ওই কোম্পানীতে লগ্নি করে এখন পথে বসেছেন। অবশ্য চুক্তি ভঙ্গ করায় খতিগ্রস্ত খামারিদের মধ্যে পাঁচজন পঞ্চগড়ের আদালতে ওই কোম্পানীর চেয়ারম্যান মানিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এসব মামলা চলমান রয়েছে।

পঞ্চগড় পৌর এলাকার রামের ডাঙ্গা মহল্লার রেহেনা আক্তার জানান, স্বামীর সাথে তার ডিভোর্স হয়েছে। ছোট বাচ্চা পালনের জন্য তিনি ব্যাংকের ডিপিএস ও গহনা বিক্রয় করে ৬ লাখ টাকা দেন। কিন্ত তাকে কোন মুরগির বাচ্চা দেয়া হয়নি। ৯০ দিন পর তাকে লাভ আসলে তাকে ৮ লাখ টাকা দেয়ার কথা। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তাদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। আমি সব টাকা বিনিয়োগ করে এখন মাঠে বসেছি।

পঞ্চগড় জেলা সদরের রজলীপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেন জানান, তিনি জমি ও গরু বিক্রয় করে ১৫টি প্যাকেজের জন্য তিনি কোম্পানীকে ৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা দেন। প্রথমে এক লাখ টাকা লাখ দিলেও পরে আর মুরগিও দেয়নি এবং টাকাও দিচ্ছেনা। আমার মত আমাদরে এলাকার অনেক মানুষকে নিঃস্ব করেছে ওই কোম্পানীটি। তিনি তার পাওনা টাকা আদায়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সেই সাথে স্বপ্নতরীর চেয়ারম্যান প্রতারক মানিক চন্দ্র বর্মনের বিরুদ্ধে এমন শাস্তির দাবি জানান তিনি যেন আর কারও কাছে প্রতারণা করে একটি টাকাও হাতিয়ে নিতে না পারে।

পঞ্চগড় জেলা সদরের হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জিয়াবাড়ি সর্দারপাড়া গ্রামের মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, প্রতিটি প্যাকেজ ২৪ হাজার ৮শ টাকা হিসেবে তিনি দুইটি প্যাকেজের জন্য ৪৯ হাজার ৬শ’ টাকা প্রদান করে কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী বাচ্চা প্রদানের তিন মাস মুরগির বাচ্চার খাদ্য ও ওষুধ কোম্পানী বহন করবে। তাকে শুধুমাত্র দেখভাল করতে হবে। দুইটি প্যাকেজে ১৭ হাজার টাকা লাভসহ ৯০ দিন পর তাকে ৬৬ হাজার ৬শ টাকা দেয়ার কথা। তাকে দুইটি প্যাকেজের জন্য ২০টি মুরগির বাচ্চা দেয়া হয়। কিন্তু মুরগির বাচ্চা দেয়ার পর কোম্পানীর লোকজনের কোন খোঁজখবর না থাকায় মেয়াদপূর্তির আগে ১৫টি মুরগি মরে যায়। এখন তারা মুরগি নিতেও আসেনা এবং টাকাও দেয় না। আমার মত অনেক খামারি এখন পথে বসেছে।

পঞ্চগড় জেলা সদরের গড়িনাবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার রফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের শুরুতে আমার কাছ থেকে ১২টি প্যাকেজের জন্য দুই লাখ ৯৭ হাজার ৬শ টাকা গ্রহণ করে। ৯০দিন পর মুরগি নিয়ে তারা লাভের এক লাখ দুই হাজার টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করে। বাকি লাভের টাকা দেয়ার আগে তারা ৯০ দিন পর দ্বিগুণ লাভ দেয়ার জন্য নতুন করে চুক্তি করে আমার কাছ থেকে আরও দুই লাখ ৯৭ হাজার ৬শ টাকা নেয়। এই টাকা নেয়ার পর তারা আমাকে আর টার্কি মুরগির বাচ্চা দেয়নি। তারা বলে যে মুরগির দরকার নেই। মেয়াদ শেষে আপনি পুরো লাভসহ আসল টাকা ফেরত পাবেন। আগামী ২৪ মে আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এখন শুনছি তারা লাপাত্তা।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য স্বপ্নতরী সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মানিক চন্দ্র বর্মনের ব্যবহৃত মোবাইলে (০১৭৪০৮১৯৩৭৭, ০১৩০৩১১৫০১৪) একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দু’টি নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে র‌্যাবের মহাপরিচালক বরাবরে অবহিতকরণ ও সহযোগিতা চেয়ে পাঠানো একপত্রে কারণ ব্যাখা করে মানিক চন্দ্র বর্ম্মণ বলেন,আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সব পাওনা পরিশোধ করা হবে। এই চিঠির অনুলিপি ডাকযোগে পঞ্চগড় প্রেসক্লাবে পাঠানো হয়েছে।

নুর আলম পুলক/পঞ্চগড়/এমএআরএস