বোরহান উদ্দিনে নিহতদের দাফন সম্পন্ন

ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সাথে স্থানীয় মুসলিম জনতার সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। বোরহানউদ্দিন থানার এসআই আজিজুর রহমান বাদী হয়ে গত রবিবার গভীর রাতে এই মামলা (নম্বর-১৮) করেন।

মামলায় অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় সরকারিকর্মকর্তাকে সরকারী কাজে বাঁধাদান, অতর্কিত হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের আহত করা এবং দাঙ্গা সৃস্টি করে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করার অভিযোগ করা হয়েছে। থানার এসআই মামুনকে এই মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত এই মামলার কোন আসামী গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে বোরহানউদ্দিনের পরিস্থিতি শান্ত রাখাসহ স্থানীয় জনগনের জানমাল নিরাপদ রাখতে পুরো শহর নিরাপত্তার চাঁদরে ঢেকে দিয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। ৪ প্লাটুন বিজিবি, ১ প্লাটুন কোস্টগার্ড, বিপুল সংখ্যক র‌্যাব এবং পুলিশ শহরজুড়ে টহল দিচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি ম. এনামুল হক।

কিন্তু তারপরও স্থানীয় জনগন পুলিশের গ্রেফতার আতংকে ভূগছে। নিরীহ-সাধারণ জনগণকে গ্রেফতার করে পুলিশ বাণিজ্য করতে পারে বলে আশংকায় আছেন স্থানীয়রা। তবে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোন নিরহ জনগন হয়রানীর শিকার হবেন না এবং এ ঘটনায় পুলিশের কেউ গ্রেফতার বাণিজ্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নিশ্চয়তা দেন বোরহানউদ্দিনের ভারপ্রাপ্ত ওসি ম. এনামুল হক।

পুলিশ ও মুসলিম জনতার সংঘর্ষে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক মিরাজ পাটোয়ারীরর ভাই হাফেজ মাহফুজ পাটোয়ারী (২৩), দেউলা এলাকার মহিউদ্দিন পাটোয়ারীর ছেলে মাহবুব পাটোয়ারী (১৬), মনপুরার মো. হারুনের ছেলে মো. মিজান (৩০) ও জনৈক দেলোয়ার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (২৫) নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক।

আহতদের বোরহানউদ্দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোলা সদর হাসপাতাল এবং বরিশাল শেরে-ই বাংলা মেডিকেল সহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহত ৪জনের মধ্যে ৩জনের লাশ রবিবার রাতেই জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে বিনা ময়না তদন্তে নিয়ে দাফন করে। আরেকজনের লাশ গতকাল সকালে নিয়ে পারিবারিকভাবে দাফন করা হয়।

বোরহানউদ্দিনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা লালমোহনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান রুমি জানান, রবিবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাতে ফের কোন অনাকাংখিত পরিস্থিতির সৃস্টি না হয় সে জন্য বোরহানউদ্দিন পৌর শহরে কোন ধরনের সভা-সমাবেশ না করার মৌখিক অনুরোধ জানানো হয়েছে জনগণকে।

বর্তমানে বোরহানউদ্দিনের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে ব্যাপক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল জেলা সদরে সভা করেছে। তবে গতকাল দুপুর পর্যন্ত তারা সরেজমিন তদন্তে আসেননি।

ভোলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ভোলা জেলায় প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিত সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি হোমওয়ার্ক করছে। তারা আজ মঙ্গলবার সরেজমিন তদন্ত করে পরদিন বুধবারের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে বোরহানউদ্দিনের ঘটনায় পুলিশ সদর বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজিকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও গতকাল দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোন আদেশ পাননি বলে জানিয়েছেন বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, পত্রিকায় তিনিও কমিটির খবর দেখেছেন। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশ পাননি। ওই আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবেন বলে তিনি জানান।

অপরদিকে বোরহানউদ্দিনের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সকাল ১১টায় ভোলা সরকারী স্কুল মাঠে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করলেও প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সমাবেশ করতে পারেনি তারা। তবে সকাল সাড়ে ১১টায় ভোলা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বোরহানউদ্দিনে পুলিশের গুলিতে ৪জন নিহত এবং বহু মানুষ আহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানান তারা।

এ সময় লিখিত বক্তব্যে ভোলার সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা মো. মিজানুর রহমান ভোলার পুলিশ সুপার ও বোরহানউদ্দিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার, নিহত ৪ জনের পরিবারকে ক্ষতিপূরন প্রদান, আহতদের সরকারী খরচে চিকিৎসা প্রদান, ফেসবুকে পোস্ট দেয়া বিপ্লব চন্দ্র শুভ ফাঁসি, ইসলামী ও ধর্মকে কটাক্ষ কারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ওই ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্ত দাবিজানান।

এ ঘটনায় ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলী আজম মুকুল এমপি এ অনাকাংখিত ঘটনায় দু:খ প্রকাশ করে বলেন, আমি এ ঘটনা শুনে তাৎক্ষনিক এলাকায় এসে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নিতে সহযোগিতায় কাজ করি। রবিবার রাতেই ভোলার আলেম সমাজ কে নিয়ে বোরহানউদ্দিন থানায় বসেছি। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করেছি কোন নিরহ লোক হয়রানি শিকার হবে না। আপনাদের ধৈয্য ধারন করতে হবে। যে ব্যক্তি এ ফেইসবুকে কটাক্ত করেছে তাদের বিরুদ্ধে দেশীয় আইনে বিচার হবে ইনশাআল্লাহ। কোন পক্ষ যাতে এঘটনা কে ইস্যু বানিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সে দিকে সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আবদুল মালেক/ভোলা