সোমেশ্বর অলি। লেখালেখির মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে কবিতা চর্চা করছেন। সফলতা পেয়েছেন গানে। দশ বছরেরর অধিক সময় ছিলেন বিনোদন সাংবাদিক। সম্প্রতি পেশা বদল করেছেন, উদ্দেশ্য লেখালেখিতে বেশি সময় দেয়া। কথা হলো তার সঙ্গে।

আজকের পত্রিকাঃ কেমন ছিলো আপনার শৈশব-কৈশোর? কবিতা-গান লেখার শুরুটা কীভাবে ?

সোমেশ্বর অলিঃ আমি স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ। খুব সহজে ভুলে যাই। বিশেষ করে বাল্যকালের স্মৃতি তেমন মনে নেই। চাপা স্বভাবের ছিলাম। খেলাধূলার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজগুলো আমাকে টানতো। তাই বলে ঘুড়ি বানানো, কাগজ দিয়ে নৌকা বানানো- এমন সাধারণ ব্যাপারগুলোও পারতাম না। কবিতা, গান, সিনেমা যাত্রাপালা এগুলোর প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিলো। আমার আব্বা মোটেও এসব পছন্দ করতেন না। কড়া শাসনের চোখ এড়িয়ে অনেকটা চুরি করেই রেডিও শুনতে হতো। আমার সেঝ ভাই কবিতা লিখতেন। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ম্যাগাজিন, সেসবে থাকা গল্প-কবিতা কিংবা কোনো ঈদ সংখ্যা পড়া হতো। হাই স্কুলে পড়ার সময়ই ছড়া লিখতাম, একটু বড় হয়ে কবিতা, কবিতার মতো গান লেখার শুরু। এরপর কলেজে পড়ার খাতিরে নেত্রকোনা শহরে আসা, মূলত এখানেই লেখালেখি সম্পর্কে বিস্তর জানাশোনা হয়। পাঠের পরিধি বাড়ে। মিশতে থাকি নেত্রকোনার স্থানীয় কবিদের সঙ্গে। ওখানে থাকার সময়ই জাতীয় পত্রিকায় লেখালেখি করতে শুরু করি। ঢুকে পড়ি লিটল ম্যাগের দুনিয়ায়। পরে ঢাকায় থিতু হওয়া।

আজকের পত্রিকাঃ ছোটবেলা থেকে কাদের গান বেশি শোনা হতো?

সোমেশ্বর অলিঃ বাছ-বিছার ছিলোনা। সবই শোনা হয়েছে। সেই শোনাটা ছিলো রেডিও-কেন্দ্রিক। পছন্দ বদলাতে শুরু করে আরও পরে। সেটা সবার যেমন হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। রুচির বৈচিত্র্য তৈরির আগে তো বাছ-বিছার করা সম্ভব নয়।

আজকের পত্রিকাঃ গান ও কবিতার পার্থক্য কোথায় আপনার কাছে?

সোমেশ্বর অলিঃ আমি পার্থক্য করি না, যদিও বাই-ডিফল্ট বেশ কিছু পার্থক্য তৈরি হয়েই আছে। বক্তব্যের জায়গাটাতে গান-কবিতায় খুব বেশি ফারাক নেই। একটা লিরিক সম্পূর্ণ গান আকারে বাজারে আসতে বেশ কিছু ধাপ পেরিয়ে যেতে হয় এবং এর সঙ্গে কয়েকজনের যোগসাজস থাকে। কবিতার সেটি প্রয়োজন নেই, একটি কবিতা লিখিত হওয়া মাত্রই তা নিজেই পূর্ণাঙ্গরূপ পেয়ে যায়।

আজকের পত্রিকাঃ গীটার হাতে তরুণদের আড্ডায় যে গানটি প্রথম দিকেই থাকে, সেই ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ কীভাবে লেখা হয়েছিলো? সে সময় কি ভেবেছিলেন এতোটা জনপ্রিয় হবে গানটি?

সোমেশ্বর অলিঃ কবিতা যারা লেখেন, তারা প্রায়ই তাড়িত হন। সেই তাড়না থেকেই আমার ঢাকায় আসা, অনেকটা ঘর পালিয়ে। বড় লেখকরা ঢাকায় থাকেন, কবিতাচর্চা তথা শিল্প-সাহিত্য করতে হলে রাজধানীবাসী হতে হয়- এমন একটা বাস্তবতার কথাও শুনতাম। তো ঢাকায় যাদের নিজের বলে কেউ নেই, কেবল তারাই বুঝতে পারেন এখানে মাথা গোঁজার জন্য কী না করতে হয়। তো ২০০৪ সালের দিকে সেই স্ট্রাগলটাই করছিলাম আমি। সে সময় আমার থাকার নির্দিষ্ট জায়গা ছিলো না। পত্রিকায় কন্ট্রিবিউট করতাম। সেই সূত্রে গীতিকার জাহিদ আকবরের সঙ্গে পরিচয়। তার মাধ্যমে লুৎফর হাসানকে [‘ঘুড়ি’র গায়ক] চেনা। এই মানুষটিই আমাকে গীতিকার বানিয়েছেন। আমি কবিতার মতো করেই লিখেছিলাম ‌’ঘুড়ি’র লিরিক। ধীরে ধীরে সেটি গানের রূপ পেলো তার কারণেই। ২০০৪ সালের দিকে লেখা-সুর করা হলেও এটি বাজারে আসে ২০১১ সালে। এর আগ পর্যন্ত আড্ডার গান হিসেবে অন্তত ২০-২৫ জন ছেলের মুখে মুখে ফিরতো এটি। শাহবাগ, বেইলি রোডের অনেক সন্ধ্যা মুখরিত ছিলো এই গানে। সেই ছেলেগুলিই আজ বিভিন্ন জায়গায় নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। তাদের কেউ কবি, কেউ গীতিকার, কেউ গায়ক, কেউ নির্মাতা, কেউ সাংবাদিক, কেউ অন্য পেশায় গিয়ে সফলতা পেয়েছে।

আজকের পত্রিকাঃ ‘ঘুড়ি’ তো শ্রোতাপ্রিয় গান। এর বাইরে আপনার প্রিয় লিরিক কোনগুলো?

সোমেশ্বর অলিঃ বেশ কিছু আছে। তবে অধিকাংশই গানের রূপ পায়নি। সেগুলো যত্নে তুলে রাখা। কখনো যোগ্যতা ও সামর্থ্য হলে প্রকাশ করবো। এ নিয়ে কিছু পরিকল্পনা রয়েছে।

আজকের পত্রিকাঃ প্রকাশিত গানগুলোর মধ্যে যদি পছন্দের তালিকা করতে বলা হয়?

সোমেশ্বর অলিঃ অনেক পছন্দের লিরিকই অনেক সময় ঠিকঠাকভাবে গান হয়ে ওঠেনা। কিছু খুঁত রয়ে যায়। হয়তো সুর ভালো হলো, মিউজিক ভালো না, মিউজিক ভালো হলো, তো ভিডিও ভালো না, ভিডিও ভালো তো, চ্যানেল ভালো না- এভাবেই একটি সম্ভাবনাময় লিরিক নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। এখনকার গীতিকারেরা প্রতিনিয়ত এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। এইসব কিছু মাথায় রেখেই পছন্দের লিরিকের মধ্যে রাখবো- মন আমার [কুমার বিশ্বজিৎ], ‌‌ডানা নেই, ফিরে এসো, রঙচটা শহর, তোমার আলো [তাহসান], ছাতার কারিগর [সুমন কল্যাণ], মায়া [ঐশী], ‌খরচাপাতির গান, আয়না দিয়ে ঘর বেঁধেছি, ঘুড়ি [লুৎফর হাসান], তাই তোমার খেয়াল, কতো কিছু বাকি [মিফতাহ জামান], জোড়া শালিক [পথিক নবী], জোছনা [দোলা], নরকবাস, সান্ত্বনা, তোমার ঘ্রাণ, মন ভালো হয়ে যায় [তাহসিন আহমেদ], আমি নেই [জয় শাহরিয়ার], দোযখ [বেলাল খান], কাগজের নাও [কনা], ভেজা ভেজা চোখ [তানজীব সারোয়ার]।

আজকের পত্রিকাঃ এখন নিয়মিত গান লিখছেন। কবিতার বই করবেন কবে?

সোমেশ্বর অলিঃ কবিতা লিখতে ঢাকায় এলেও সাংবাদিকতা ও গানের ব্যস্ততার কারণে আমার কবিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কবিতাগুলো আমার কাছেই কবিতা হয়ে উঠছেনা, লোক দেখানোর জন্য সেগুলি বই আকারে প্রকাশ করার অর্থ নেই। আগে নিজের কবিতার ওপর পূর্ণাঙ্গ ঈমান আনতে চাই। তারপর বই করার চিন্তা। একইসময়ে লিখতে আসা অনেকেই বই করেছে, আমি পিছিয়ে পড়েছি বেশ আগেই। আরেকটু পিছিয়ে যেতে চাই (হা হা হা)। সাংবাদিকতা ছেড়েছি, কবিতায় আগের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছি, দেখা যাক।

আজকের পত্রিকাঃ গানের পাশাপাশি সিনেমা-নাটকের স্ক্রিপ্টও তো লিখছেন?

সোমেশ্বর অলিঃ নিয়মিতভাবে নয়। স্ক্রিপ্ট লেখার অভিজ্ঞতা ভালো নয় আমার। বুঝে না-বুঝে কয়েকটি লেখা হয়েছে। এখন জেনে বুঝেই লিখতে চাই। কিছু স্ক্রিপ্ট গুছিয়েছি এর মধ্যে। ধীরে ধীরে আসবে।

আজকের পত্রিকাঃ গান-নাটক-সিনেমার বাজার এখন ক্যামন?

সোমেশ্বর অলিঃ অস্থির। আমরা অনেকেই জানিনা আমরা কী করছি, কোন পথে চলছি। ঠিক নিবেদিত হয়ে কাজটা করছিনা। সবাইকে বলতে শুনি- সিনেমা শেষ, গান চলেনা, নাটকের বাজে অবস্থা। একটা অচলাবস্থার কথা মুরুব্বীরাও বলছেন। সত্যিকার অর্থে খুব বেশি ভালো কাজ এখন হচ্ছেনা। ভালো, মোটামুটি ভালো, গড় ভালো বা চলনসই কাজ হচ্ছে। চিন্তায় নাড়া দেবে, ভাবিয়ে তুলবে, বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে ইন্ডাস্ট্রকে- এমন কাজ খুব একটা চোখে পড়ছেনা। হয়তো এর ভেতরেই কেউ কেউ আছেন সবাইকে চমকে দেবেন নতুন মাত্রার কাজ দিয়ে।

আজকের পত্রিকাঃ আপনাকে ধন্যবাদ।

সোমেশ্বর অলিঃ আজকের পত্রিকা ও আপনাকেও ধন্যবাদ।

আজকের পত্রিকা/এসএমএস

https://www.youtube.com/channel/UCGHw9nU5g-Fj9oOsY_gd1SA?view_as=subscriber&fbclid=IwAR3QYczxN2YdSqHZeiYSJY7p5s5U_sQ0v-NE7mhYkHB3ql_Is6Si_F2wl_I