চিকিৎসক হলে সুবিধা অনেক। নিজের দেহের রোগ সম্পর্কে জানা গেলে, চিকিৎসা করা যায় নিজে নিজেই। তবে নিজের দেহে নিজেই অস্ত্রোপচারের ঘটনা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ রকমই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন লিওনিড রোগোজোভ নামের এক চিকিৎসক। চিরতুষারের দেশে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। নিজের অসুখে নিজেরই চিকিৎসা করা ছাড়া উপায়ও ছিল না তার। ফলে নিজেই অস্ত্রোপচার করে দেহ থেকে বাদ দিয়েছিলেন অ্যাপেন্ডিক্স।

১৯৩৪ সালে মঙ্গোলিয়া এবং চিনের সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্ত থেকে ১৭ কিমি দূরে পূর্ব সাইবেরিয়ার চিটা ওব্লাস্ট গ্রামে রোগোজোভের জন্ম। শৈশবেই পিতৃহীন হন তিনি। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত হন তাঁর বাবা। তখন রোগোজোভের বয়স মাত্র ১১ বছর। লেলিনগ্রাদ পেডিয়াট্রিক মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে তিনি ডাক্তারি পাশ করেন ১৯৫৯ সালে। তার খ্যাতি ছিল অস্ত্রোপচারে। ১৯৬০ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার ষষ্ঠ অ্যান্টার্কটিক অভিযানে তিনি যোগ দেন চিকিৎসক হিসেবে।

১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল- এই দু বছর অ্যান্টার্কটিকায় কর্মরত ছিলেন রোগোজোভ। তের জন বিজ্ঞানী তথা গবেষকের দলে তিনি ছিলেন একমাত্র চিকিৎসক। তাদের কর্মক্ষেত্র ছিল নোভোলাজারেভস্কায়া স্টেশন। হিমশীতল ওই মেরুপ্রদেশের নোভোলাজারেভস্কায়া স্টেশনে ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রোগোজোভ। প্রথমে দুর্বলতা, তার পরে বমি। এরপর হাল্কা জ্বর এবং তলপেটের ডানদিকে ব্যথা। উপসর্গগুলো ক্রমশ বাড়তেই লাগলো। নিজে চিকিৎসক হওয়ায় তিনি বুঝতে পারলেন তার সমস্যা অ্যাপেন্ডিসাইটিস। অস্ত্রোপচার না করলেই নয়।

অস্ত্রোপচার করতে হলে আরও একটি গবেষণাকেন্দ্রে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সেই মুহূর্তে নোভোলাজারেভস্কায়ার সব থেকে কাছের গবেষণাকেন্দ্র মিরনি ছিল ১৬০০ কিমি দূরে। সেখানে যাওয়ার একমাত্র ভরসা এয়ারক্র্যাফ্ট। কিন্তু তীব্র তুষারঝড়ে সে বাহনও ব্যবহারের অযোগ্য ছিল। রোগোজোভ বুঝলেন নিজের অস্ত্রোপচার নিজেকেই করতে হবে। নইলে প্রাণসংশয় আসন্ন। ১৯৬১ সালের ১ মে অস্ত্রোপচারের সময় ঠিক হল। গবেষণাকেন্দ্রে তৈরি হলো অস্থায়ী অস্ত্রোপচার থিয়েটার। রোগোজোভের পাশে থাকলেন একজন আবহাওয়া-বিজ্ঞানী এবং একজন গাড়িচালক।

আধশোয়া রোগোজোভের সামনে ধরা হলো আয়না। ইঞ্জেকশন দিয়ে তলপেটের নির্দিষ্ট অংশ অবশ করলেন তিনি। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া। এরপর নিজেই নিজের অস্ত্রোপচার শুরু করলেন। আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে এগোতে লাগল রোগোজোভের হাতের ছুরি-কাঁচি। তবে প্রথমেই বাঁধে বিপত্তি। অ্যাপেন্ডিক্স বাদ দিতে গিয়ে তিনি অন্য অঙ্গ ‘সিকাম’কে আঘাত করে বসেন। তারপর সেটি সেলাই করে আবার নির্দিষ্ট দিকে এগোতে শুরু করে তার হাতের অস্ত্র।

অবশেষে অ্যাপেন্ডিক্স দেখতে পেলেন রোগোজোভ। সেটি তখন যথেষ্ট স‌ংক্রামিত। দেহ থেকে সেটি বাদ দিলেন তিনি। বুঝলেন, এই অস্ত্রোপচার না করলে যে কোনো সময় সেটি পেটের ভিতরে ফেটে যেত এবং তাতে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি দেখা দিতো।

ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ বাদ দেওয়ার পরে আবার নিপুণ হাতে অস্ত্রোপচারের জায়গা সেলাই করে ফেলেন রোগোজোভ। প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে প্রায় দু ঘণ্টা। এর সাতদিন পরে সেলাই কাটা হয়। দু সপ্তাহ পরে পুরনো কাজের ছন্দে ফেরেন এই চিকিৎসক।

এ ঘটনার পর এই স্ব-অস্ত্রোপচার শিরানোমে চলে এসেছিল স্বভাবতই। লিওনিড রোগোজোভকে পুরস্কৃত করা হয় ‘অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার অব লেবার’ সম্মানে। সব গবেষণাকেন্দ্রে কর্মরতদের শারীরিক চেকআপে আরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১৯৬১ সালে লেনিনগ্রাদে ফিরে আসেন রোগোজোভ। এম ডি হিসেবে যোগ দেন লেলিনগ্রাদ পেডিয়াট্রিক মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট-এ। যেখান থেকে তিনি ডাক্তারি পাশ করেছিলেন। এরপর তিনি লেনিনগ্রাদের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লিওনিড রোগোজোভ ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র: আনন্দবাজার
আজকের পত্রিকা/সিফাত