মানববন্ধনে নিখোঁজদের স্বজনরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

নিখোঁজ স্বাজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছে ভুক্তভোগী অন্তত ২০ টি পরিবার। ২৫ মে শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আকুতি জানান নিখোঁজদের স্বজনরা। গুম হওয়া সন্তানদের মায়েদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এই মানববন্ধনের উদ্যোগ নেয়।

৭ বছর বয়সী শিশু লামিয়া আক্তার মীম। শিশুটির আড়াই বছর বয়সের সময় তার বাবা কাওসার হোসেন নিখোঁজ হন। সাত বছর বয়সী আরেক শিশু আদিবা ইসলাম হৃদি পারভেজের বাবা পারভেজ হোসেন যখন নিখোঁজ হন, তখন শিশুটির বয়স মাত্র দেড় বছর। এই দুই শিশু তাদের নিখোঁজ বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছে সরকারের কাছে।

মানববন্ধনে শিশু লামিয়া আক্তার মীমে মা মিনু আক্তার জানান, তার স্বামী কাওসার হোসেন পেশায় ছিলেন গাড়ি চালক। তিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। এর পরেই মিনু আক্তার সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে টিউশিনি করে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি। এ রকম আর কতো দিন চালাতে পারবো, জানি না। আমার স্বামীকে আমি ফেরত চাই।
কাওসার যখন নিখোঁজ হন, শিশু মীমের বয়স মাত্র আড়াই বছর। এখন যত বড় হচ্ছে, ততই বাবার কথা চায় সে। মানববন্ধনে মীম বলে, ‘আমার বাবাকে ঈদের আগে ফেরত চাই।

মিনু আক্তার জানান, কাওসারের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বিমানবন্দর এলাকায়। প্রায় ৭ বছর ধরে নিখোঁজ থাকায় তারা এখন অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে সময় পারছেন।তাদের বিশ্বাস কাওসার একদিন ফিরে আসবেন।

আরেক শিশু আদিবা ইসলাম হৃদি পারভেজ। বয়স ৭ বছর। নিখোঁজ বাবা পারভেজ হোসেনের ছবি বুকে নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছে। শিশুটি তার মা ফারজানা আক্তারের সঙ্গে মানববন্ধনে এসেছে। বাবা যখন গুম হন, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র দেড় বছর। বাবাকে বাবা ডাকার আগেই তার সামনে থেকে বাবা হারিয়ে যান।

শিশুটির মা ফারজানা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে চার যুবকের সঙ্গে পারভেজ হোসেনওক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন পর্যন্ত আর খোঁজ মেলেনি। পারভেজ যখন গুম হন, তখন হৃদির বয়স ছিলো মাত্র দেড় বছর। তখন হৃদি কিছুই বুঝতো না। এখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, সবার মতো তার বাবা নেই। তবে ওর বাবার কী হয়েছে, কেন সে নেই! তা আমি তাকে বলতে পারছি না। সাত বছর যাবত হৃদি তার বাবাকে নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারছি না।

পারভেজ বংশাল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন উল্লেখ করে ফারজানা প্রশ্ন ছুড়ে দেন- রাজনীতি করা কি অপরাধ? তাহলে দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। আমাদের সন্তানদের বাবাদের ফেরত দিন, তারা আর রাজনীতি করবেন না।
হৃদি এখন তার মায়ের সঙ্গে যাত্রাবাড়ির মাতুয়াইলে নানাবাড়িতে থাকেন। নানাবাড়ির পাশের একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। নিখোঁজ পারভেজের বাবা ছেলের শোকে মারা যান দুই বছর আগে। বর্তমানে তার মাও শয্যাশায়ী বলেও জানান ফারজানা আক্তার।

২০১৩ সালে মিরপুর পল্লবী থেকে নিখোঁজ হন বিএনপিকর্মী সেলিম রেজা পিন্টু। তার বোন মুন্নী মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বলেন, ৫ বছর ছয়মাস ধরে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। কতো মানুষের কাছে গিয়েছি, প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, তাও আমাদের ভাইকে ফেরত পাইনি। আমাদের বাবা-মা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা হয়তো বাঁচবেন না। আমরা এই বেঁচে থেকে মরে আছি। আমরা প্রতিদিনই মারা যাই। হয় আমাদের গুম করুণ, না হয় আমাদের ভাইদের ফেরত দিন।

মানববন্ধনে এসেছেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া সাজেদুল ইসলামের বোন আফরোজা ইসলাম। সম্বনয় করেছেন মানববন্ধনের। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান ফিরে এসেছেন। আমরাও মনে করি, আমাদের স্বজনদেরও এভাবে ফেরত দেওয়া হবে।

ইউপিডিএফ-এর অন্যতম সংগঠক ও ইউনাইটেড ওয়াকার্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইকেল চাকমা গত ৯ এপ্রিল কাঁচপুর থেকে নিখোঁজ হন। তার বড়বোন সুভদ্র চাকমা মানববন্ধনে অংশ নিয়ে কথা বলার আগে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। মাইকেল পাহাড়ি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করে থাকেন।

যারা এখনো নিখোঁজ

মানববন্ধনে অন্তত ২০ জন নিখোঁজের স্বজন, সন্তান, স্ত্রী ও পরিবার অংশ নেন। যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তারা হলেন, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া ঢাকার ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন। একই বছরের ২৮ নভেম্বর নিখোঁজ হন খালিদ হাসান সোহেল। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর নিখোঁঝ হন আদনান চৌধুরী। এছাড়া ২০১৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হন, খালিদ হাসান সোহেল, স¤্রাট মোল্লা, মো. সোহেল, চঞ্চল, নিজাম উদ্দিন মুন্না, তরিকুল ইসলাম ঝন্টু, মাহবুব হাসান সুজন, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, আসাদুজ্জামান রানা, পারভেজ হোসেন, মো. সোহেল, আল আমিন, এমএ আদনান, কাউসার ও সেলিম রেজা পিন্টুসহ আরো কয়েকজন।

মানববন্ধনে যারা সংহতি প্রকাশ করেছেন

নিখোঁজ ও গুম হওয়া মানুষের ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে আয়োজিত এই মানববন্ধনে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা ছিলেন। এর মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, গুম-খুনের জন্য দায়ীরা আপনার পাশেই আছে। আপনি তাদের বলুন, তারা যেনো দ্রুত নিখোঁদের ফেরত দেয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হলে অবস্থা এমনই হবে!

সরকারের উদ্দেশে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, এসব ঘটনা তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করুন। তারা একটি গ্রহণযোগ্য তদন্ত করুক। যেনো আমরা সবাই আস্থা রাখতে পারি। তারা তদন্ত করে দেখুক, আসলে তাদের ভাগ্যে কী জুটেছে?

আজকের পত্রিকা/কেএফ