ছবি: সংগৃহীত

‘চলে গেলে- তবু কিছু থাকবে আমার/আমি রেখে যাবো/ আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি…’। নিজের কবিতায় চলে গেলেও থেকে যাওয়ার কথা লিখেছিলেন ৬০’র দশকের অন্যতম আধুনিক কবি আবুল হাসান। ৪৪ বছর আগে চলে গিয়েও কবিতাপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠিকই রয়ে গেছেন এই জনপ্রিয় কবি। ৪ আগস্ট, ২০১৯ তাঁর ৭২তম জন্মদিন।

মাত্র ২৮ বছরের জীবনকাল তাঁর। এরইমধ্যে তিনি বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও অগ্রন্থিত কালজয়ী বেশকিছু কবিতা। এছাড়াও রয়েছে তাঁর গল্প ও কাব্যনাটক। আবুল হাসান যখন কলম ধরেছিলেন, সময়টি ছিল বাঙালির জাতীয় জীবনের ক্রান্তিকাল, দুঃসহ সময়। ৫২’র মহান ভাষা-আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছিল একটি একক জাতিসত্তাবোধ, পূর্ণাঙ্গ ও পরিশুদ্ধ ভাবনা। আর সেই ভাবনা থেকে ব্যক্তি ও কবি আবুল হাসান কখনোই পৃথক ছিলেন না। এ ভাবনাকে ধারণ করেই তৎকালীন সময়ের চলমান ঘটনা কবিতার নির্মাণশৈলীতে ভিন্ন-ভিন্নভাবে উচ্চারণ করেছেন তিনি।

কবিতার আঙ্গিক ও গঠনশৈলী নিয়ে ষাটের দশকের প্রথমার্ধে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। এ সময়েই বাংলাদেশের কবিতায় গদ্য একটি মাধ্যম হিসেবে প্রবেশাধিকার পায়। আবুল হাসান মধ্যষাটে আত্মপ্রকাশ করে নিজেও কবিতার উপস্থাপন মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

এ সময় কেউ কেউ কবিতাকে গদ্যরেখা ও সরল রেখার মতো উপস্থাপনা করেছেন। যেহেতু বক্তব্য উপস্থাপনে সুস্পষ্ট বক্তব্যাশ্রয়ী হয়নি, ফলে এর গদ্যভাষা এক ধরনের অস্পষ্টতার ভেতর আচ্ছন্ন ও আরোপিত ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। বক্তব্য বৃহত্তর কাব্যপাঠকের কাছে সহজবোধ্য ছিল না। কবি আবুল হাসান কবিতায় গদ্যভঙ্গিকে উপস্থাপন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি যথাযথভাবে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সমমাত্রায়।

১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন এবং আস্তে আস্তে পদার্পণ করেন ‘উদ্বাস্তু-উন্মুল’ যৌবনে।

পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলে আবুল হাসান অর্থের প্রয়োজনে পত্রিকায় চাকুরি নেওয়ার কথা ভাবেন। পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় বার্তা বিভাগে সাংবাদিকতা শুরু করেন। কিন্তু মাত্র তিন মাস পরে চাকরি ছেড়ে দেন। কোনো পত্রিকাতেই তিনি একটানা বেশি দিন কাজ করেননি।

আবুল হাসান অল্প বয়সেই একজন সৃজনশীল কবি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। মাত্র এক দশকের কাব্যসাধনায় তিনি আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। আত্মত্যাগ, দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবুল হাসানের কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র ২৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন প্রতিভাবান এই কবি।

আজকের পত্রিকা/সিফাত