এস আহমেদ ফাহিম

উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।এর জন্য উত্তীর্ণ হতে হয় ভর্তি পরীক্ষায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান উৎপাদন, বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে সেই জ্ঞান সংরক্ষণ ও পাঠদানের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করবে যা দেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিবে।।

কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শুধু পুরনো জ্ঞান বিতরণ হচ্ছে, নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার খুবই কম।বাংলাদেশের বর্তমানে ৪৬ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৯৫টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলমান আছে।এছাড়াও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে ৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০ টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতি বছর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা।কিন্তু দেখা যায় এসব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তি হয়ে পরিপূর্ণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় শিক্ষার্থীরা।যার প্রভাব পড়ে কর্মক্ষেত্রে। পরিপূর্ণ শিক্ষার অভাবে ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশকৃত শিক্ষার্থীরা।যার ফলে দেশের শিক্ষিত বেকারের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০১৬-১৭) অনুযায়ী দেশে শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার।

এর মধ্যে শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিতের (যাদের বয়স ১৫ বছর ও তদুর্ধ) সংখ্যা ২৩ লাখ ৭৭ হাজার এবং অশিক্ষিত বেকার ৩ লাখ।শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩ লাখ অশিক্ষিত বেকারের মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার পুরুষ এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার নারী।

শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষিত চার লাখ ২৮ হাজার তম্মধ্যে পুরুষ দুই লাখ দুই হাজার এবং নারী দুই লাখ ২৬ হাজার, মাধ্যমিক শিক্ষিত ৮ লাখ ৯৭ হাজার তম্মধ্যে পুরুষ চার লাখ ২২ হাজার এবং নারী চার লাখ ৭৪ হাজার। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষিত বেকার ছয় লাখ ৩৮ হাজার তম্মধ্যে পুরুষ তিন লাখ ৫৩ হাজার এবং নারী দুই লাখ ৮৫ হাজার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেকার ৪ লাখ পাঁচ হাজার তম্মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৩৪ হাজার এবং নারী এক লাখ ৭১ হাজার এবং অন্যান্য পুরুষ নয় জন।এছাড়াও প্রযুক্তি নির্ভর যুগে প্রযুক্তির জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে কম দেওয়া হয়।

যার ফলে প্রযুক্তি নির্ভর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ কম।যার প্রভাব পড়ে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায়।যার ফলে উন্নত শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যায় এখানকার শিক্ষার্থীরা এবং দেশে উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রের অভাবে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায় অনেকে।ইউনেস্কোর পরামর্শ হলো, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হবে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং জিডিপির ৬ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে অবস্থা করছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলিয়ে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৫.২ শতাংশ।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ হিসেবে এটি সর্বোচ্চ দেখানো হলেও শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি আলাদা করা হলে শুধু শিক্ষায় এই বরাদ্দ দাঁড়ায় ১১.৬৮ শতাংশ।জিডিপি’র হিসেবেও শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা মাত্র ২.২ শতাংশ যা অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় খুবই কম।একটি উন্নত জাতি ও উন্নত দেশ গঠনে প্রযুক্তিগত, গবেষণাধর্মী ও কারিগরি শিক্ষা খুবই জরুরি।

আমাদের দেশে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরি করার প্রবণতা বেশি, উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা খুবই কম।কেননা,উদ্যোক্তা হবার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পায় না এখানকার শিক্ষার্থীরা।আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ায় বিশ্ব র‍্যাংকিং এ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো র‍্যাংকিং এ অনেক পিছিয়ে থাকে।বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বাজেটের বেশিরভাগ ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজে,গবেষণাখাতে বরাদ্দ খুবই কম।বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় ৬১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা (১.৪৮%)। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুন্নয়ন বাজেট অনুমোদন করা হয় ৪ হাজার ৮৩৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়কে ৬২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা গবেষণা বরাদ্দ দেওয়া হয় যা অনুন্নয়ন বাজেটের ১.২৯ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাজেট অনুমোদন করা হয় ৮ হাজার ৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়ন বাজেট ৫ হাজার ৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণা বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা যা অনুন্নয়ন বাজেটের ১.২৬ শতাংশ। প্রতি বছরই কমেছে গবেষণায় বরাদ্দের হার।ইউজিসির ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন হতে জানা যায় , দেশে সরকারি ও বেসরকারি ১৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।

এর মধ্যে সরকারি ১০টি আর বেসরকারি ৩১টি। ২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই বছর সরকারি- বেসরকারি ১৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম ছিল ১২৭টিতে। এর মধ্যে ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টিতে এবং ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭টিতে কোনো গবেষণা প্রকল্পই ছিল না। পিএইচডি ও এমফিল ফেলোশিপ গ্রহণেও দেখা গেছে অনাগ্রহ।

ইউজিসির ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন হতে দেখা যায়, ২০ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনা নেই,সরকারি ৬ টি ও বেসরকারি ১৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে কোনো ব্যয় নেই। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে সরকারি বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। বেসরকারিভাবে গবেষণার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা নেই। অথচ, বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেটের বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক গবেষণা তেমন একটা হচ্ছে না।বাংলাদেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় কিছু বরাদ্দ রাখে যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তাই গবেষণার চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে অধিক অর্থ উপার্জনে আগ্রহী। আবার গবেষণা বরাদ্দ অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা প্রকল্পের গুণগত মানের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। ফলে, অনেক মেধাবী শিক্ষক হয়তো গবেষণা করতে চেয়েও প্রকল্প পাচ্ছেন না।

এভাবে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বরাদ্দ অর্থের যথাযথ বণ্টন-মনিটরিং-মূল্যায়নের অভাব এবং সর্বোপরি শিক্ষকদেরও গবেষণায় ক্রমবর্ধমান অনাগ্রহের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যতটা এবং যে মানের গবেষণা হওয়া উচিত সেটা হচ্ছে না। ফলে, উচ্চশিক্ষার মানও ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী হচ্ছে।

নতুন বছরে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণার মানোন্নয়ন, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করা শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হাত থেকে মুক্তির জন্য প্রদক্ষেপ নেওয়া হোক।

-এস আহমেদ ফাহিম