নজরদারীর মধ্যেও থেমে নেই মানিকগঞ্জে ইলিশ নিধন

মানিকগঞ্জ জেলার পদ্মা-যমুনায় থেমে নেই মা ইলিশ শিকার। প্রশাসনের কঠোর নজরদারী ও ধরপাকরের মধ্যেও চলছে মৌসুমী জেলেদের ইলিশ শিকারের উৎসব।

জেলেরা ধরছে ইলিশ তাদেরকে ধরছে পুলিশ।

বিশেষ করে শিবালয়ে এ সময়ে ইলিশ রক্ষার নামে চলছে চোর-পুলিশ খেলা। উপজেলা প্রশাসনের নের্তৃত্বে প্রতিদিন জেলে ও ইলিশ ক্রেতাদেরকে আটক করছে পুলিশ। জব্দ করছে বিপুল পরিমাণ মাছ ও জাল। জব্দকৃত যতসামান্য মাছ যাচ্ছে এতিমখানায়।

আবার অনেকে খাবারের জন্য বাসাবাড়িতে ইলিশ মওজুত করেও প্রশাসনের হাত থেকে রেহায় পাচ্ছে না।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন পরিবহণে ও রাস্তা ঘাটে চলছে তল্লাসি, জব্দ করা হচ্ছে মাছ, চলছে জেল-জরিমানা।

প্রশাসনের এত নজরদারীর মধ্যেও থেমে নেই মা ইলিশ নিধন। জেলেরা নির্বিচারে শিকার করছে মা ইলিশ।

নদীর পাড়ে দাড়ালেই দেখা যায় শত শত নৌকা ভাসছে নদীতে ।

ইলিশ ধরার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান

জেলেদের জালে যেমন ধরা পড়ছে ঝাকে ঝাকে চকচকে রুপালী ইলিশ। তেমন নদীর পাড় এলাকা এবং শিবালয়ের আলোকদিয়াসহ-চরাঞ্চলে ক্রেতাদের ভীর দেখা গেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিবালয়ের আলোকদিয়ার চরে চলছে শুধু ইলিশ কেনা-বেচা।

বিকাল হলেই প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ নৌকা নিয়ে ওই চরে যাচ্ছে মাছ কিনতে। দেখে মনে হবে এ যেন ইলিশের মেলা বসেছে। দাম যে খুব একটা কম তা নয়। হুজুগে বাঙ্গালী তাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ইলিশ কিনতে। ছোট-বড় মিলে গড়ে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪/৫শ’ টাকা করে।

জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর রাত ১২টার পর থেকে সারা দেশে একযোগে মা ইলিশ মাছ ধরার ওপর সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে যা আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলতে থাকবে। এসময়ে ব্যপক উৎসাহ-উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে চলছে ইলিশ শিকারের প্রতিযোগীতা। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে অসংখ্য ডিমওয়ালা মা ইলিশ।

এরা প্রশাসনের চোখকে ফাকি দিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করে ইলিশ শিকার করছে এবং গোপনে তা বিক্রি করছে ক্রেতাদের কাছে। এদিকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে চলছে ব্যপক অভিযান ও ধরপাকড়। প্রতিদিন আটক করা হচ্ছে জেলে ও মাছ ক্রেতাদেরকে। জব্দ করা হচ্ছে জাল ও মাছ।

১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১শ ২৯জনকে ১বছর করে কারাদণ্ড প্রদান এবং ৪৬জনকে ১লাখ ৬৬হাজার ১শ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত। ১৩ লাখ ৮১ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধব্বংশ করা হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ১ হাজার ৭শ’ ৯২কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করে বিভিন্ন এতিমখানায় দেয়া হয়েছে বলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

প্রতিদিন চলছে ধরপাকড়। তারপরও থেমে নেই ইলিশ শিকারীদের নিধন কার্যক্রম। এরা আরো উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ নিধন চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবছরই এসব মৌসুমি জেলেরা সারা বছর নদীতে মাছ না ধরলেও এ সময়ে ৩/৪লাখ টাকা করে কামাবে এ টার্গেট নিয়েই নদীতে নামছে মা ইলিশ ধরতে। পদ্মা-যমুনার কয়েকটি চরাঞ্চলে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, এক সুবিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে মা ইলিশ নিধন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানিকগঞ্জে শিবালয়, তেওতা, জাফরগঞ্জ, চরশিবালয় , গঙ্গাপ্রসাদ, আলোকদিয়া, ত্রিসুন্ডি, চরকাটারী, বাচামারা, বাঘুটিয়া, মধ্যনগর, পাবনার কাজিরহাট, ঢালারচর, রাজবাড়ির চরদৌলতদিয়া, ও কুশিয়াহাটাসহ নদী তীরবর্তী এলাকার শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের নিজ নিজ এলাকার ২/৩শ মানুষ নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ নিধনে ব্যাপক আকারে প্রস্তুুতি নিয়ে মা ইলিশ শিকার করছে।

এরা প্রতিটি নৌকার মালিক ও ৫/৬জন ভাগিদাররা এক সাথে মা ইলিশ নিধন করার জন্য সর্বনিম্ন ৪ সেট করে কারেন্ট জাল ক্রয় করেন। তারা জানে যে, অভিযানে তাদেরকে ধরলে জাল পুড়িয়ে ফেলা হবে। বিধায় এক/দুই সেট জাল পোড়ালেও মা ইলিশ ধরা যাতে বাধাগ্রস্থ না হয় এর জন্য একাধিক সেট জাল ক্রয় করে মজুত করে রাখেন সকল মৌসুমি জেলেরা।

এসব কারেন্ট জাল চড়াদামে সংগ্রহ করা হয়েছে আরিচা ঘাট, জাফরগঞ্জ, দৌলতদিয়া ও কাজিরহাটের বেশ কয়েকটি দোকান থেকে। যার ফলে শুধুমাত্র কারেন্ট জাল পুড়িয়েই ইলিশ নিধনযজ্ঞ বন্ধ করা যাবেনা বলে সচেতন মহল মনে করছেন। তারা আরো বলেছেন, মৌসুমি জেলেদের নৌকা জব্দ করা গেলে ইলিশ নিধন ফেরানো সম্ভব হবে। অন্যথায় অভিযান করে তেমন সফলতা পাওয়া যাবেনা বলে তারা জানান।

বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব মৌসুমি ইলিশ নিধনকারীরা ঘাট এলাকার কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মীর সাথে নৌকা প্রতি ২০/২৫হাজার টাকার চুক্তি করে নদীতে নামে ইলিশ মাছ ধরতে।

এছাড়া নির্বিঘ্নে মাছ ধরা জন্য প্রতিদিন ৭/৮শ’ টাকা করে বেতন দিয়ে সোর্স রেখেছে ইলিশ শিকারীরা। পুলিশ বা প্রশাসনের কোন টিম অভিযানে নদীতে নামলে সাথে সাথেই জেলেদেরকে মোবাইল করে জানিয়ে সজাগ করে দেয় এসব সোর্সরা। যার ফলে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে জোরদার অভিযান পরিচালিত হলেও তেমন সফলতা না আসার আশংকা করছেন স্থানীয়রা।তাই অভিযানের সফলতা আনতে মৌসুমি মা ইলিশ নিধনকারীদের নৌকাগুলো এক মাসের জন্য জব্দ করার প্রতি জোড় দাবী জানান অভিজ্ঞমহল, প্রকৃত মৎসজীবি ও হালদার সম্প্রদায়ের লোকজনেরা।

এব্যাপারে শিবালয় ৩নং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেক জোড়দার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও কিছু অসাধু মানুষ ও মৌসুমী জেলেরা নির্বিচারে মা ইলিশ নিধন করছে বলে জানা যাচ্ছে। অভিযান সফল করতে হলে মৌসুমী জেলেদের নৌকাগুলো জব্দ করা গেলে এ অভিযান পুরোপুরি সফল হতো বলে আমার মনে হয়। কারণ এত অল্প সময়ে পুনরায় একটি নৌকা বানিয়ে ইলিশ শিকার করা সম্ভব হতো না বলেও তিনি জানান।

শিবালয় বন্দর বাজার ব্যবসায়ী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র প্রচার সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে যারা নদীতে ইলিশ মাছ ধরছে এদের বেশীর ভাগই মৌসুমী জেলে। এরা প্রতিবছরই অধিক লাভের আশায় এ সময়ে সরাকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে টার্গেট নিয়ে নদীতে নামে। বিধায় আমরা নিজেরা যদি সচেতন না হই তাহলে শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সরকারের একার পক্ষে মা ইলিশ শিকার বন্ধ করা মুশকিল বলে তিনি মনে করেন।

ইলিশ ধরার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান

এসব বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএফএম ফিরোজ মাহমুদ বলেন, গত ৯ অক্টোবর থেকে আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ২২দিন মা ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। অভিযান সফল করতে আমাদের সকল ধরনের প্রস্তুুতি নেয়া হয়েছে। মৎস্য শিকারী এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে আরিচায় সচেতনতামুলক সভা এবং আলোকদিয়ার চরে পথ সভা করা হয়েছে। আরো দু’তিনটি সভা করা হবে বলে তিনি জানান। মা ইলিশ মাছ নিধনে কোন ধরনের সম্পৃক্ততা থাকলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে না। এ পর্যন্ত বেশ কয়েটি মোবাইল টিম পরিচালনা করে ৭৮জনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে এবং চব্বিশ ঘন্টাই মোবাইল টিম কাজ করবে বলে তিনি জানান।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. মুনিরুজ্জাম বলেন, মৎস্য অভিযান সফল করার জন্য আমরা আগে থেকেই জেলেদেরকে নিয়ে সভা, র‌্যালীসহ বিভিন্ন ধরণের সচেতনতামুলক প্রগ্রাম করেছি। ৭হাজার ৭শ’ ৭৯জন জেলেকে ২০কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া অভিযানের জন্য আমাদের বরাদ্ধ কম, লোকবলসহ লজিস্টিক সাপোর্টের স্বল্পতা রয়েছে। তারপরও এ অভিযান সফল করতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও আমাদের মৎস্য বিভাগসহ সরকারী বিভিন্ন সংস্থার লোকজন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। প্রতিদিনই জেলে ও ক্রেতাদেরকে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। এরপরও থামানো যাচ্ছে না তাদেরকে।

এবিষয়ে আমাদের সকলেরই সচেতন হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন। ইলিশ মাছ ধরা এবং বহণ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বলবত থাকবে। এসময়ে অভিযান সফল করতে সকলের সহযোগীতা কামনা করছেন তিনি।

শাহজাহান বিশ্বাস/মানিকগঞ্জ