ছবি: আজকের পত্রিকা

‘তোয়ালেটা দাও তো। তাড়াতাড়ি।’
যার উদ্দেশে কথাটি বলা সে তখন ডুবে আছে আরব্য রজনীর মায়াবী সমুদ্রে। ফলে প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি সুরেলা কণ্ঠটি শাহেরজাদের, নাকি রক্তমাংসের কোনো নারীর। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নারী-সান্নিধ্য বঞ্চিত দুই কক্ষের একতলা এই ফ্ল্যাট বাড়িটির একেবারে শেষপ্রান্তে বাথরুমের অবস্থান। তবে তার বিভ্রম কাটতে সময় লাগে না। এবার শুধু কথা নয়, তার সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের মতো বাথরুমের টিনের দরোজাটিও বেজে ওঠে ঝনঝন শব্দে। সে হন্তদন্ত হয়ে তোয়ালে হাতে ছুটে যায়।
‘কী করছিলে? এত ডাকছি শুনতে পাচ্ছো না? দাও, তোয়ালেটা দাও।’

তন্ময় কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে যায়। তার কিশোর চোখ দুটি স্থির হয়ে যায় বাথরুমের দরোজার ফাঁক গলে বেরিয়ে থাকা হাতটির ওপর। কোনো মানুষের হাত যে এত সুন্দর হতে পারে তা ছিল তার কল্পনারও অতীত। যেন কোনো স্বর্গীয় শিল্পীর তৈরি নিটোল। নিখাদ। পরিপক্ক কমলার খোসার মতো তার রঙ। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো তখনো ফোটা ফোটা জল জমে আছে সেই হাতে। ক্ষণিকের জন্যে ঘোর লেগে যায় তন্ময়ের চোখে। মস্তিষ্কে। এখানে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট নয় যে এ ঘোর তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। হাতটি ফিরে ফিরে আসবে। গোখরোর ফণার মতো দুলতে থাকবে তার অকিঞ্চিৎকর জীবনকে ঘিরে এবং যারাই তার সংস্পর্শে আসবে তারাই স্মৃতিফলক হয়ে ঝুলতে থাকবে কালের দেয়ালে।
জরাক্রান্ত রোগীর মতো সে কাঁপছিল। কিছুটা এলোমেলোভাবে তোয়ালেটা দিতে গিয়ে তন্ময়ের পা পিছলে যাওয়ার উপক্রম হয়। আত্মরক্ষার সহজাত তাড়না থেকে সে হাতটি আঁকড়ে ধরে। তাও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমের দরোজাটা খুলে যায়। তন্ময় কী দেখেছিল তা সে কখনোই আর ঠিকঠাক মনে করতে পারেনি পরবর্তী জীবনে। তবে আকাশচ্যুত নক্ষত্রের মতো আশ্চর্য দ্যুতিময় দুটি চোখের কথা মনে আছে- ওরা তার বক্ষ বিদীর্ণ করে মিলিয়ে গিয়েছিল হাওয়ায়।

বাসায় আর কেউ ছিল না। তন্ময়েরও এ সময় বাসায় থাকার কথা নয়। কিন্তু মাত্র কয়েকদিন আগে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। এখন চলছে টেস্ট পরীক্ষার প্রস্তুতি। তবে অ‘পাঠ্য’ বইয়ের নিষিদ্ধ আকর্ষণে পাঠ্যবই তখন পানসে হয়ে গেছে ওর কাছে। ডানে-বাঁয়ে একই প্যাটার্নের আরও তিনটি ফ্ল্যাটে তন্ময়ের বাবা-মা, ভাইবোনদের বসবাস। সবাই নিজেদের নিয়ে বড্ডো ব্যস্ত! ফলে অযাচিতভাবে এক ধরনের স্বাধীনতাও ভোগ করতো সে। বলে রাখা ভালো যে তন্ময় তখনো জীবনানন্দ পড়েনি। অতএব ‘নগ্ন নির্জন হাত’-এর ধারণার সঙ্গেও সে পরিচিত নয়। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে তার দৃষ্টির সামনে এসে পড়া একটি হাত শুধু যে তার জীবনের খোলনলচে বদলে দেয় তাই নয়, তা ছায়ার মতো জড়িয়ে যায় তার সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গেও।
হাতটির যিনি মালকিন তিনি সরাসরি তন্ময়দের কেউ নন। তার সদ্যবিবাহিত স্বামীদেবতাটি হলেন তন্ময়ের মায়ের পক্ষের আত্মীয়। গ্রামের মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি দফতরে ছোটোখাটো চাকরি করেন। বেচারার বিবাহ উপলক্ষে প্রাপ্ত ছুটি শেষ। এদিকে অফিস কামাই করার মতো মনের বা খুঁটির জোর কোনোটাই তার নেই। স্ত্রীকে গ্রামে রেখে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শহুরে সুন্দরী নতুন বউ বেঁকে বসেছে। কিছুতেই গ্রামে থাকবে না। অগত্যা দুইদিক সামাল দেওয়ার জন্যে তিনি তন্ময়দের বাসায় এসে উঠেছেন সাময়িকভাবে। নবদম্পতিটির ঠাঁই হয়েছে তন্ময়ের ঠিক পাশের কক্ষটিতে। ভেতরগোঁজা লাজুকস্বভাবের তন্ময় যে তাতে খুব খুশি হয়েছে তা নয়। চেনা মানুষদের সঙ্গেই সে মিশতে পারে না। আর অচেনা মানুষের সঙ্গে বসবাস- সে তো তার কাছে কারাবাসতুল্য।

ভাগ্য ভালো যে প্রথম কয়েকটা দিন স্কুল-কোচিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেছে। সামনের দীর্ঘ অনিশ্চিত দিনগুলো কাটানোর প্রস্তুতি হিসেবেই সে ‘আরব্য উপন্যাস’টা নিয়ে এসেছে বন্ধু মামুনের বাসা থেকে। সঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ও। কিন্তু এইমাত্র যা ঘটে গেল- তার সম্মোহন থেকে সে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। আশ্চর্য এক অস্থিরতা তৈরি হয়ে গেছে তার ভেতরে। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে সে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। ঠিক তখনই নতুন পাড়ভাঙা শাড়ি, চুড়ি আর বেলিফুলের সুঘ্রাণ- তিনে মিলে সংগীতের মতো কিছু একটা তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। ত্রিমুখী তরঙ্গের অভিঘাতে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে সে সামনে যে নারীমূর্তিটি দেখে এমন নারী পৃথিবীতে ইতঃপূর্বে আর কখনো দেখেছে বলে তার মনে পড়ে না।
পরনে শাদা ব্লাউজ, আকাশি নীলরঙের শাড়ি। আজানুলম্বিত খোলা চুল আর কিঞ্চিৎ ফাঁক করা গোলাপি দুই ঠোঁটের মাঝখানে ঝুলে আছে হাসির মতো কিছু একটা। (তন্ময় তখনো মোনালিসাকে দেখেনি। যখন দেখেছে তখনো মনে হয়েছে- সেদিন সে যা দেখেছিল তার কাছে মোনালিসা কিছুই নয়!) প্রস্তরমূর্তির মতো জমে যায় সে। নারীটি একপা দুপা করে ওর দিকে আসে। ঠোঁটটা যেন সামান্য কাঁপে। তারপর অকস্মাৎ ঘুরে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। গোলাকার পৃথিবী নিয়ে তন্ময়ের মনে মজ্জাগত যে-ভয়টা ছিল শিশুকাল থেকে সেটাই যেন সত্যে পরিণত হলো। আচমকা সে ছিটকে পড়লো পৃথিবী থেকে। গ্রামের পুকুরে প্রথমবার সাঁতার শিখতে গিয়ে পায়ের নিচে মাটি খুঁজে না পেয়ে তার যে অনুভূতি হয়েছিল- এবারের অনুভূতি তার চেয়েও ভয়াবহ।

চারপাশে জলের মতো তরল অন্ধকার। একেই সম্ভবত ‘মহাশূন্য’ বলেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমে প্রচণ্ড ভয় পেলেও অচিরেই তন্ময় বুঝতে পারে তার শরীরটা ওজনশূন্য হয়ে গেছে। অতএব, ডুবে যাওয়ার ভয় নেই। এটা নিশ্চিত হওয়ার পর কিছুটা নির্বিকারভাবে ডানার মতো হাতপা ছড়িয়ে সে ভাসতে থাকে। একা একা। আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে! ঠিক তখনই আবিষ্কার করে, আরও একজন জেগে আছে অন্ধকারের এ মহাসমুদ্রে। বড় মায়াময় তার রূপ। পৃথিবী থেকে কতোবার তাকে দেখেছে। ডেকেছেও ‘আয় আয় চাঁদ মামা’ বলে। কিন্তু এমন একাত্মতা আর কখনো অনুভব করেনি সুদূরের নিঃসঙ্গ এ নক্ষত্রটির প্রতি। সে বিভোর হয়ে তাকে দেখে। তখনই বেজে ওঠে শাড়ি-চুড়ি আর বেলির সেই ত্রিমুখী সংগীত। ধ্যানভ্রষ্ট ঋষির মতো মুহূর্তে সে পতিত হয় মর্ত্যে।

তন্ময় নিজেকে আবিষ্কার করে তাদের একতলা বাড়ির ছাদের ওপর। চাঁদের মায়াময় আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। রাত কতো হবে কে জানে! তাকে ঘিরে আবর্তিত হয় অশ্রুতপূর্ব সেই সংগীতের সম্মোহন। আচমকা গভীর গভীরতর দীর্ঘশ্বাসের মতো ধেয়ে আসা এক ঝলক বাতাস এলোমেলো করে দেয় তার আজানুলম্বিত চুল। তন্ময়ের ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু জগৎ সংসারের সঙ্গে তার যোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। লুপ্ত হয়ে গেছে জাগতিক সব বোধ। সে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে ছাদের ওপর। চাঁদের সঙ্গে কী যেন একটা জরুরি বোঝাপড়ার ভাবনা পেয়ে বসে তাকে। তখনই বেলিফুলের সুঘ্রাণ শুভ্র একটি চাদরের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে তাকে। তন্ময় এই ভেবে আনন্দিত হয় যে জানালার পাশে তার লাগানো বেলি চারাটি কখন যেন ছাদে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। পরক্ষণে মনে খটকা লাগে। এখন তো বেলি ফোটার কথা নয়! অবাক বিস্ময়ে সে দেখে আস্ত চাঁদটি দুবাহু প্রসারিত করে ঝুঁকে আছে তার ওপর। চাঁদের চোখ ধাঁধানো বুক জুড়ে ফুটে আছে অদ্ভুত সুন্দর দুটি বেলি ফুল।
দিনগুলো ছিল বড্ডো ভারী। তন্ময় রাত্রির জন্যে অপেক্ষা করতো। চাঁদ সেটা জানতো। সেও নিজেকে উজাড় করে দিত। অমাবস্যা বাগড়া না দিলে তারা হয়তো অনন্তকাল এভাবেই মহাশূন্যে ভেসে বেড়াতো। কিন্তু অমাবস্যা ঠিকই ওত পেতেছিল। তন্ময় না হয় বেলি ফুলের ঘ্রাণে বিভোর হয়েছিল, কিন্তু বেলির তো জানার কথা অমাবস্যার কথা। অবশ্য এও তো সত্য যে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে মানুষ যতই বাহাদুরি ফলাক- ফুলেদের মনের খবর বোঝা তো আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। তন্ময় এই ভেবে বিস্মিত হয় যে বেলির ব্যাপারটা না হয় আলাদা, কিন্তু চাঁদ কেন সাবধান করলো না? সে তো জানে তার আয়ুর সীমাবদ্ধতার কথা!

অমাবস্যা কখন কীভাবে হানা দিয়েছিল তন্ময়ের মনে নেই। শুধু মনে আছে জাদুকরী একটি হাতের ছোঁয়া লেগেছিল তার হাতে। তারপর তিনের সংগীত। তারপর তার ঝুলকালিতে ভরা বিবর্ণ ফ্ল্যাটটিতে একদিন পূর্ণচাঁদ ঢুকে পড়েছিল। তার বুক ছিল বেলি ফুলের ঘ্রাণময়। তন্ময়ের তুচ্ছ জীবনটা হাঁসের পালকের মতো সানন্দে তাতে ভেসে গিয়েছিল। এ নিয়ে বিন্দুমাত্র খেদ নেই তার মধ্যে। সে পুনর্জন্মে বিশ্বাসী নয়, তবু যতবার তার জন্ম হবে ততবারই সে শুধু এটুকুই দয়া ভিক্ষা করবে জীবনের কাছে। অমাবস্যা যে আসছে তার তিলমাত্র পূর্বাভাসও ছিল না তন্ময়ের কাছে। ফুলেরা সম্ভবত আগেভাগেই অনেক কিছু আঁচ করতে পারে। তাই যদি না হবে অমাবস্যার ঠিক আগের রাতে বেলির শুভ্রতা কেন রক্তবর্ণ ধারণ করবে? চাঁদের স্নিগ্ধতাকে ছাপিয়ে উঠবে সর্বগ্রাসী উষ্ণ রক্তের গর্জন?

অবশ্য অমাবস্যা নিয়েও একটা বড়সড় গোল বেঁধে গিয়েছিল। মনোবিদ এক বছর ধরে তন্ময়কে কেবল একটাই প্রশ্ন করেছিল- খোলাচুলের মেয়েটি মানে বেলি কি প্রতিরাতে আপনাকে ছাদে নিয়ে যেত? তন্ময় বরাবরই সেই একই উত্তর দিয়েছে: সেখানে কোনো মেয়ে ছিল না। সেটি ছিল বেলি ফুলের ঘ্রাণময় একটি চাঁদ…। মনোবিদ হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। অতিথিরা যখন নতুন বাসা ভাড়া করে চলে যায় যথারীতি অমাবস্যাও তাদের পিছু নিয়েছিল। সে খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল অল্প কদিন পরেই। এ নিয়ে নানা কানাঘুষা হলেও প্রকৃত অপরাধী কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে গিয়েছিল। নয়তো তন্ময়ের মা কেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন: ‘ডাইনিটা আমার কচি ছেলেটার সর্বনাশ করল, সহজসরল ভাইটারেও পথে বসালো! কবরের মাটিও তাকে লানত দেবে!’