ছবি: আজকের পত্রিকা

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সঙ্গে আমার পরিচয় বেশিদিনের নয়। ২১শে পদক পাবার পর জগন্নাথ হল অ্যালামনাই এসোসিয়েশন কর্তৃক প্রদত্ত অনুষ্ঠানে তিনিও আমার সঙ্গে একমঞ্চে ছিলেন। তখনই পরিচয়। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান রাজনীতিক ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর জন্ম ১৯৪৮ সালে উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।

১৯৬২ সালে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তখন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনীতির হাতেখড়ি! তিনি ছোটবেলা থেকে ছাত্রলীগ করে ধাপে ধাপে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে এম.এ. এবং পরে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় ১৯৭১ সালের ২৮মে তার বাবাকে পাকবাহিনী হত্যা করে। তবু রাজনীতির পথেই তার এগিয়ে চলা! আজো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অকুতোভয় একজন সৈনিক হিসেবে আনুগত্যের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বরগুনা-১ সংসদীয় আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৯ সালে তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রীও ছিলেন। বর্তমানে তিনি দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত বলেই তিনি টানা ২৬ বছর বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুহত্যার প্রতিবাদকারী হিসেবে তিন বছর এবং ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আরো এক বছর তিনি কারাভোগ করেন। অথচ তারই হাতে গড়া কিছু রাজনীতিক ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ও তার ছেলে সুনাম দেবনাথের সঙ্গে নয়নবন্ডের পরিচয়ের সূত্র ধরে এখন ক্রমাগত অপপ্রচার চালাচ্ছে। মুখে মুখে যেমন, তেমনি পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়াতে শুরু হয়েছে এই অপ্রপচার।

বরগুনার অনেকেই জানেন, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর প্রতি স্থানীয় আওয়ামী লীগের কারো কারো ঈর্ষা আছে। তিনি সকলকে নিয়ে চলতে চাইলেরও বিভীষণরা হামলে পড়েছে ধীরেন্দ্র দেবনাথ ও তার ছেলে সুনাম দেবনাথের ওপর। এবার যখন ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তখন ঐসব ঈর্ষাকাতর লোকজন এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সামনেই সাম্প্রদায়িক শ্লোগান তুলে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য দাবি জানায় বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার অনড় মনোভাবের কারণে তারা হালে পানি পায়নি। ফলে তারা যে কোনো উপায়ে শম্ভুকে শায়েস্তা করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, এর পেছনে বরগুনা ছাত্রলীগের সভাপতি জুনায়েদ আদনান পলকের পৃষ্ঠাপোষকতা যেমন আছে, তেমনই নয়নবন্ডদের গডফাদার হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে তার নাম সামনে চলে আসায় রিফাতহত্যাকাণ্ডের পরই তিনি দেশ থেকে পালিয়েছেন বলে অনেকের ধারণা। জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে এককাট্টা হওয়ার পেছনে আরো যাদের নাম সামনে চলে এসেছে, তাদের মধ্যে রিফাতের হত্যাকারী রিফাত ফরাজী এবং নিশান ফরাজীর বাবার ভায়রা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন এবং গাড়ি চুরির মামলায় দীর্ঘদিন জেলখাটা নাম-ভাড়ানো মশিউর রহমান শিহাবের নামও আছে।

এসবের পেছনে অর্থের জোগানদাতা হিসেবেও শিহাবের নাম এসেছে। কিন্তু কেন তারা শম্ভু এবং তার ছেলে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে এতোটা হিংস্র হয়ে উঠেছে? সেটা কি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমন কোনো কাজ করেছেন, যা বরগুনার রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে? যদি তাই হয়, তা হলে একটি প্রশ্ন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি বরগুনার কোনো খবরই রাখেন না? ধীরেন্দ্র দেবনাথ যদি এতো খারাপ লোকই হবেন, তা হলে পাঁচবার তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দিলেন কেন? শম্ভু যে এলাকা থেকে বারবার জিতে এসেছেন, সেটি কিন্তু সংখ্যালঘু এলাকা নয়, সেখানে বেশিরভাগ ভোটারই মুসলিম! তিনি এতো খারাপ হলে কী করে বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোট পেয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন? আসলে বরগুনায় কারা এবং কেন শম্ভুর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন, তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

রিফাতের প্রকৃত খুনিদের আড়াল করার যে কোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না! রিফাতকে কেন হত্যা করা হলো, কে হত্যা করলো, তা খুঁজে বের করা হোক। এই ঘটনায় সুনাম দেবনাথের সংশ্লিষ্টতার কোনো ডকুমেন্টারি এভিডেন্স যদি থাকে, তাও প্রকাশ করা হোক। এ ব্যাপারে বরগুনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীও দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। এসব যাচাই করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বও তাদের। কিন্তু এতোদিন ধরে তারা হয় রহস্যময় কারণে চুপ করে ছিলেন; অথবা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে দিনরাত্রি পরিশ্রম করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কর্মীদের প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নাম ভাঙিয়ে যারা দলের মধ্যে কলহ তৈরি এবং চাঁদাবাজি, মাস্তানি, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনায় লিপ্ত থেকে শেখ হাসিনার হাতকে দুর্বল করছে, তারা আসলে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও দলের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এঁদের ছুড়ে ফেলা জরুরি। জেলার সভাপতি হিসেবে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুরও এ-ব্যাপারে ভূমিকা রাখা জরুরি বলে মনে করি। নেত্রীর কাছে সকল ঘটনা তুলে ধরে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্বও তার।

এখনি সময়, নয়ন বন্ড ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের যারা ছত্রছায়া দিয়েছেন ও দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এইসব আগাছাকে যদি মূলসুদ্ধ উপড়ে ফেলা না যায়, তা হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যও তা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তাই সময় থাকতে নেত্রী এদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, এটাই সকলের প্রত্যশা।

লেখক: অসীম সাহা
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়