মাত্র ৪৩ বছরের জীবন সঞ্জীব চৌধুরীর তাতেই ফুল ফুটিয়েছেন অগণন। তার না থাকা স্বত্ত্বেও এই ফুল সৌরভ ছড়াচ্ছে এখনও।গায়ক, কবি, লেখক, গীতিকার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী সঞ্জীব চৌধুরীর আজ মৃত্যু দিন।

২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর রাত ১২.১০মিনিটে অ্যাপোলো হাসপাতালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা যান সঞ্জীব চৌধুরী।
১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে জন্ম সঞ্জীব চৌধুরীর।নয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম।পিতা স্বর্গত ননীগোপাল চৌধুরী এবং মাতা প্রভাষিণী চৌধুরী।

ছাত্র জীবনে মেধাবী সঞ্জীব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হন তবে পরে সেই বিভাগ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেন। সঞ্জীব চৌধুরী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকের শুরুর দিকে পেশাগতভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন।প্রথমেই দৈনিক উত্তরণে কাজ করা শুরু করে পরবর্তীতে ‘আজকের কাগজ’, ‘ভোরের কাগজ’, ‘যায়যায় দিন’ প্রভৃতি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেন তিনি।

ভোরের কাগজে কাজ করার সময় সঞ্জীব চৌধুরী ফিচার লেখা শুরু করেন।১৯৮৩ সালে একুশে বই মেলায় তিনি ‘মৈনাক’ নামে একটি লিটলম্যাগাজিন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।
শিল্পী বাপ্পা মজুমদার ও সঞ্জীব চৌধুরী ১৯৯৫ সালে ‘দলছুট’ ব্যান্ড গঠন করেন।দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ‘হৃদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনাবিহার’, ‘টুকরোকথা’, ‘আয় আমন্ত্রণ’ নামে আরো কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়েছে এই ব্যান্ড থেকে।
‘স্বপ্নবাজি’ ছিলোসঞ্জীব চৌধুরীর একক অ্যালবাম।২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘টুকরোকথা’ অ্যালবামটি সঞ্জীবের মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধার্থে প্রকাশ পায়।এতে তার লেখা কবিতাগুলোর সংকলন ছিল।এছাড়া ‘আয় আমন্ত্রণ’ হচ্ছে ব্যান্ডটির ষষ্ঠ অ্যালবাম।

২০১০ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর সঞ্জীব চৌধুরীর ৪৭তম জন্মদিনে ‘সঞ্জীব উৎসব’ পালনের মধ্য দিয়ে এই অ্যালবামটি প্রকাশ পায়।এই অ্যালবামের ‘নতজানু’ নামে সর্ব শেষ গানটি সঞ্জীব চৌধুরীর নিজের লেখা।
গানের পাশাপাশি এই সৃষ্টিশীল মানুষটি কবিতা লিখতেন।বেশকিছু ছোটগল্পও লিখেছিলেনতিনি।তার লেখা গল্পগ্রন্থ ‘রাশপ্রিন্ট’ আশিরদশকে বাংলাএকাডেমী কর্তৃক সেরা গল্পগ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়।২০১০ সালের একুশে বইমেলায় মোট৪৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কবিতা’।
সঞ্জীব চৌধুরীর রাজনৈতিক বোধ ছিল তীব্র।স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন।বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত হন এবং এক সময়ে এর সাংস্কৃতিক সম্পাদকও নির্বাচিত হন।নেতৃত্ব দেন ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক দলকে।

১৯৮৫ তে তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্বরশ্রুতি’তে যুক্ত হন এবং তার হাতেই গড়ে ওঠে স্বরশ্রুতির গণসংগীতের স্কোয়াড।নেতৃত্ব দেন স্বরশ্রুতির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে।নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয়তমদের একজন।
গানে অনেক ধরণের নিরীক্ষা করেছেন সঞ্জীব চৌধুরী।বাংলাদেশের লোকসংগীত ও সুফি গানের প্রতি তার ছিল এক অন্যরকম টান।সিলেটের মরমী কবি ও গায়ক হাসন রাজার গান ছিলসঞ্জীবের খুব প্রিয়।বাউল শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’গানটি তার কণ্ঠেই বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীত অনুরাগী সঞ্জীব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উভয় সংগীতের সাথেই ছিলেন পরিচিত।তার প্রিয় গায়ক ছিলেন বব ডিলান, পিংক ফ্লয়েড, অ্যালস্টুয়ার্ট।

সঞ্জীব চৌধুরীর যাদুকরী কণ্ঠে ‘আমি তোমাকেই বলে দেবো’, ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’, ‘হাতের উপর হাতের পরশ’, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘তোমার ভাঁজখোলো আনন্দদেখাও’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘নৌকাভ্রমণ’, ‘হৃদয়ের দাবি’, ‘কোনমেস্তিরি’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’সহ আরো বহু গান কয়েক প্রজন্ম ধরে শুনে আসছে বাংলা ভাষীরা।

মানব কল্যাণে ব্রতী সঞ্জীব চৌধুরী সংস্কারবোধের ঘেরাটোপে আটকে থাকেননি কখনই।তাই মৃত্যুর পর চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য রেখে গেলেন শেষ অবদান- তার দেহটি।আজও ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার দেহাংশ চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ুয়া ছাত্রদের জ্ঞান চর্চায় ব্যবহার হচ্ছে।
দৈহিক না থাকায় সঞ্জীব চৌধুরীর কিছু আসে যায় না।তিনি চিরঞ্জীব।মানুষের উল্লাস আর একাকী মুহূর্তে তিনিই সহায়