বিশ্বব্যাপী ক্যাসিনোর জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি : সংগৃহীত

বাংলায় জুয়া খেলা বা জুয়ার আসরের পরিচিত মার্জিত শব্দ হচ্ছে ক্যাসিনো। যদিও সব ক্যাসিনোতেই জুয়া খেলা হয় না। যেমন- ক্যালিফোর্নিয়ার শান্তা কাতালিনা দ্বীপের কাতালিনা ক্যাসিনোতে কখনো জুয়া খেলা হয়নি কারণ যখন এটা নির্মাণ করা হয়, সে সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। এছাড়া কোপেনহেগেন ক্যাসিনো একটি থিয়েটার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কাতালিনা ক্যাসিনো। ছবি : সংগৃহীত

ক্যাসিনো ইতালীয় ভাষার একটি শব্দ যা ‘ক্যাসা’ অর্থাৎ ঘর থেকে এসেছে। ক্যাসিনো বলতে ছোট ভিলা, গ্রীষ্মকালীন ঘর কিংবা সামাজিক ক্লাবকে বোঝানো হতো। ১৯ শতকের দিকে ক্যাসিনো বলতে এমনসব ভবনকে বোঝানো হতো যেখানে আনন্দদায়ক কাজকর্ম হতো, যেমন নগরের সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানে নাচ, গান, জুয়া ও ক্রীড়ার ব্যবস্থা থাকতো। আধুনিক দিনে ইতালিতে বিভিন্ন অর্থে তারা ক্যাসিনো ব্যবহার করে। যেমন পতিতালয় ও শব্দপূর্ণ পরিবেশ।

খরিদ্দারেরা ক্যাসিনো গেমস দ্বারা জুয়া খেলে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বা দক্ষতারও প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ গেমস গাণিতিকভাবে এমনভাবে বিন্যাস করা থাকে যে প্রায়শই খেলোয়ারদের চেয়ে বাড়িগুলো সুবিধা পেয়ে থাকে। এই সুবিধাকে ‘হাউজ এজ’ বলা হয়ে থাকে। পোকারের মতো খেলাগুলো যেখানে একজন খেলোয়াড় অপর খেলোয়ারের সাথে খেলে সেখানে বাড়িগুলো রেক নামে কমিশন নিয়ে থাকে। স্লট মেশিন বা ভিডিও লটারি মেশিন ক্যাসিনোর অন্যতম জনপ্রিয় জুয়া খেলা।

স্লট মেশিন। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বব্যাপী ক্যাসিনোর জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিছু সংখ্যক মুসলিম দেশ এবং চীনের মূল ভূখণ্ড ছাড়া বিশ্বের সকল উল্লেখযোগ্য পর্যটন নির্ভর দেশগুলোতে ক্যাসিনোর ব্যবস্থা রয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিভিন্ন দেশে ক্যাসিনো ব্যবস্যার কিছু চিত্র।

যুক্তরাষ্ট্র

লাস ভেগাস। ছবি : সংগৃহীত

ক্যাসিনো ব্যবস্যায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে এশিয়া। তারপরেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। শুধুমাত্র মার্কিন বাণিজ্যিক ক্যাসিনোগুলো ২০১৭ সালেই আয় করেছে ৪১.২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু বাণিজ্যিক ভাবে পরিচালিত ৪৬০টি ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে রয়েছে ৩৬০টি ক্যাসিনো। তবে বিশ্বের প্রথম সারির ক্যাসিনোগুলোর মধ্যে রয়েছে লাস ভেগাসের বেল্লাজিও ক্যাসিনো। যেখানে রয়েছে বিশাল পোকার রুম, হাই টেবিল লিমিট সুবিধা এবং ২ হাজার ৩০০ স্লট মেশিন থাকায় প্রফেশনাল জুয়াড়িরা এই ক্যাসিনোতে বেশি ভিড় জমান। এখানে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ডলার থেকে ৮ হাজার ডলার পর্যন্ত জুয়ার বাজি ধরার সযোগ রয়েছে। মাঝে মাঝে বাজি ১০ লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।

লাস ভেগাসের বেল্লাজিও ক্যাসিনো। ছবি : সংগৃহীত

সব মিলিয়ে ১৯৫৪ টি ক্যাসিনো চালু আছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ৯ লাখের উপর স্লট মেশিন রয়েছে৷ ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আর বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলার আয়ের যোগান দেয় সেখানকার এই শিল্প৷

ভ্যানেতিয়ান, ম্যাকাও, চীন

বিশ্বের বৃহত্তম ক্যাসিনো হচ্ছে ম্যাকাওয়ের ভ্যানেতিয়ান। ছবি : সংগৃহীত 

বিশ্বের বৃহত্তম ক্যাসিনো হচ্ছে ম্যাকাওয়ের ভ্যানেতিয়ান। ৫ লাখ ৩০ হাজার বর্গফুট ক্যাসিনো ফ্লোর রয়েছে এখানে। আকর্ষণীয় এই ক্যাসিনোটি ভেতর এবং বাহির দুদিক থেকেই দেখতে অপরূপ। ক্যাসিনোর মার্বেল পাথরে তৈরি লবি আর নান্দনিক আলোকসজ্জার মুগ্ধতায় ছুটে আসে জুয়াড়িরা। ক্যাসিনোটির প্রতিটি খেলার স্পট ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি। ৮৭০টি টেবিল ও ৩ হাজারের বেশি স্লট মেশিনসহ খেলার বিশাল সংগ্রহ রয়েছে এই ক্যাসিনোয়। যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের যোগ্য প্রতিদ্বন্ধী এই ক্যাসিনোটি। ম্যাকাওয়ের মাত্র অর্ধশত ক্যাসিনোই এখানকার সরকারের ৮০ ভাগ রাজস্বের যোগান দেয়৷

কানাডা

ক্যাসিনো নায়াগ্রা, অন্টারিও। ছবি : সংগৃহীত

সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যাসিনো আছে কানাডাতে৷ জনগণকে ক্যাসিনোর মালিকানা আর পরিচালনার প্রথম অনুমতি দিয়েছে উদারমনা দেশটি৷ তাতে সেখানে মোট ক্যাসিনোর সংখ্যা ২১৯ টিতে দাঁড়িয়েছে৷ সবচেয়ে বেশি ৭৩ টি আছে অন্টারিওতে৷ এরপর তালিকায় আছে আলবার্টা আর ব্রিটিশ কলম্বিয়া৷ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশটির ৭৬ ভাগ মানুষই কোনো না কোনো জুয়া খেলার সঙ্গে জড়িত। বছরে সাড়ে ১৫ বিলয়ন ডলার লেনদেন হয় এর মাধ্যমে৷

মেক্সিকো

রিভেরা হোটেল এন্ড ক্যাসিনো, মেক্সিকো। ছবি : সংগৃহীত

উত্তর আমেরিকার আরেক দেশ মেক্সিকোতে রয়েছে ২০৬ টি ক্যসিনো৷ গেম পরিচালনায় এর কোনোটিরই নিজস্ব কোনো প্রোগ্রাম নেই, পুরোটাই কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত৷ মেক্সিকোর ক্যাসিনো শিল্পের বড় অংশটাই কোডারে, বিগ বোলা আর ইমোশন— এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের দখলে।

ফ্রান্স

দ্যা ক্যাসিনো, ডে মন্টে কারলো ফ্রান্স। ছবি : সংগৃহীত

উত্তর আমেরিকার দেশ বাদে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্যাসিনো ফ্রান্সে৷আর এখানেই দেখা মিলবে বিশ্বের পুরোনো সব ক্যাসিনোর। খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও এসব ক্যাসিনোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বেশি। যেমন- ১৯১২ সালে চালু হওয়া ক্যাসিনো ব্যারিয়ো দাভিলা৷ সব মিলিয়ে ১৮১ টি ক্যাসিনো চালু আছে ফ্রান্সে৷

ইংল্যান্ড

হিপ্পোড্রোম ক্যাসিনো, লন্ডন। ছবি : সংগৃহীত

রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে রাজপথ, বাজি যদি জুয়ার মধ্যে পড়ে তাহলে ব্রিটিশদের চেয়ে এগিয়ে আর কেউ নেই৷ শুধু লন্ডনেই হাজারের উপর বেটিং শপ আছে৷ ২০ লাখের বেশি ব্রিটিশ অনলাইনে জুয়া খেলে৷ এর বাইরে মেফেয়ার আর পিকাডিলির মতো খ্যাতনামা ক্যাসিনোতো আছেই৷ সব মিলিয়ে এখানে ক্যাসিনোর সংখ্যা ১৫৮৷

দক্ষিণ এশিয়া

ভারতে গ্রান্ড সেভেন ক্যাসিনো, গোয়া। ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১টি ক্যাসিনো আছে ভারতে৷ গোয়ার পানাজি, গ্যাংটক, মুম্বাইসহ মোট ১১ টি শহরে সেগুলোর অবস্থান৷ ৫ টি ক্যাসিনো আছে শ্রীলঙ্কায়, যার সবগুলোই রাজধানী কলম্বোয়৷ এছাড়া ১১ টি ক্যাসিনো আছে নেপালে আর ৫ টি মিয়ানমারে৷

মুসলিম অধ্যুষিত দেশ

মিশরের সোনেসটা হোটেল টাওয়ার এন্ড ক্যাসিনো। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের অনেক মুসলমান প্রধান দেশেও বৈধ ক্যাসিনো আছে৷ যেমন- মিশরে রয়েছে ১৭টি, যার ১৪ টি শুধু রাজধানী কায়রোতেই৷ ৯ টি আছে তুরস্কে৷ আফ্রিকার মরক্কোতে আছে ৭টি৷ এ ছাড়াও মধ্যাপ্রাচ্যের আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, আরব আমিরাত আর এশিয়ার মালয়েশিয়াতেও ক্যাসিনোর অনুমোদন আছে৷

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/সিফাত