দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আলাদা হয়ে যাওয়াই উত্তম। ছবি: সংগৃহীত

বিয়ে একটি পারিবারিক বন্ধন। এই বন্ধনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী একসাথে সংসার শুরু করেন। কিন্তু সংসার জীবন সব সময় সুখের হয় না। বদ অভ্যাস, মতের অমিল, মানসিক-শারীরিক নির্যাতন, পরকীয়া কিংবা আরও নানা কারণেও সংসারে জটিলতা সৃষ্টি হয়। তখন একসাথে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠে। এমনও হয় একজন আরেকজনকে একাধিকবার সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আলাদা হয়ে যাওয়াই উত্তম। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে নানা মানুষের নানা ধারণা রয়েছে। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে জেনে নিন সঠিক তথ্যগুলো-

নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে আমাদের অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ভুল ধারণা

প্রথমেই ভুল ধারণাগুলো সম্পর্কে জেনে নিন। অনেকেরই ধারণা মুখে মুখে তিন বার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে বা একসাথে ‘বায়েন তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই তালাক হয়ে যায়। ধারণাটা সঠিক নয়। এমনকি, মুখে উচ্চারণ ব্যতিত লিখিতভাবে তালাক দিলেও তা সাথে সাথে কার্যকরী হয় না।

কিন্তু আইন না জানার কারণে নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে আমাদের অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, শুধুমাত্র একটি নোটিশ দিলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন তিন মাসে তিনটি তালাকের নোটিশ পাঠাতে হবে। তা না হলে তালাক কার্যকর হবে না। অনেক আইনজীবী এবং কাজী আছেন, যারা প্রতিমাসে একটি করে তালাকের নোটিশ অর্থাৎ তিন মাসে তিনটি তালাকের নোটিশ প্রেরণ করে তালাক কার্যকর করেন।

১৯৭৪ সালের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মুখে তালাক দিয়ে নোটিশ না পাঠালে উপধারা ১-এর বিধান লঙ্ঘন হবে। এ কারণে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

অনেকে মনে করেন, স্বামী তালাক দিলে শুধুমাত্র দেনমোহর দিতে হয়। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দেনমোহরের সঙ্গে তালাকের কোনো সম্পর্ক নেই। স্বামী বা স্ত্রী যেই তালাক দেন না কেন, দেনমোহর অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। দেনমোহর পরিশোধের বিকল্প কিছু নেই। শুধু স্ত্রী যদি মাফ করে দেন, সেক্ষেত্রে মাফ হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দেনমোহর একটি ঋণ। তালাকের পরবর্তী সময়ের দেনমোহর পরিশোধের আগে যদি স্বামীর মৃত্যু হয়, তবে স্বামীর জমাকৃত নগদ টাকা কিংবা প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকে স্বামীর স্বজনদের দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

মুসলিম আইন অনুযায়ী একজন পূর্ণ বয়স্ক এবং সুস্থ মস্তিস্কের স্বামী যে কোনো সময় কোনো প্রকার কারণ ছাড়াই তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর ক্ষমতা একচ্ছত্র, কিন্তু এজন্য আইনের বিধান মেনেই তা করতে হবে। বিধান না মানা শস্তিযোগ্য অপরাধ।

স্ত্রী যে সব কারনে তালাক দিতে পারেন

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী কী কী কারণে স্বামীকে তালাক দিতে পারে তা উল্লেখ করা হয়েছে –

১। যদি চার বছর পর্যন্ত স্বামী নিরুদ্দেশ থাকেন

২। দুই বছর স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হন

৩। স্বামীর সাত বৎসর কিংবা তার চেয়েও বেশি কারাদণ্ডাদেশ হলে

৪। স্বামী কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট সময় ধরে (তিন বছর) দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে

৫। বিয়ের সময় স্বামী পুরুষত্বহীন থাকলে

৬। স্বামী যদি দুই বছর পাগল থাকে অথবা কোনো গুরুতর ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকে্ন

৭। স্বামীর ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতার কারণেও স্ত্রী তালাক দিতে পারেন।

নোটিশ

তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামুলক। ছবি: সংগৃহীত

১। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ (১) ধারায় বলা হয়ে, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তিনি যে কোনো পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর যথা শিগগির সম্ভব চেয়ারম্যানকে (স্থানীয় ইউনিয়ন/পৌর চেয়ারম্যান/প্রশাসক) লিখিতভাবে নোটিশ দিবেন এবং স্ত্রীকে উক্ত নোটিশের একটি অনুলিপি (নকল) প্রদান করবেন।

২। কই আইনের ৭ (২) ধারা অনুযায়ী, যদি কোন ব্যক্তি নোটিশ প্রদানের এই বিধান লঙ্ঘন করেন, তবে তিনি এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডনীয় হবেন।

৩। ৭ (৪) ধারা অনুযায়ী, নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে পুনর্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে একটি সালিশী পরিষদ গঠন করবেন এবং উক্ত সালিসী পরিষদ এই জাতীয় পুনর্মিলনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

৪। ৭ (৩) ধারা অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ প্রদানের তারিখ হতে নব্বই দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যকরী হবে না। কিন্তু, তালাক ঘোষণার সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন, তাহলে ৭(৫) ধারা অনুযায়ী গর্ভাবস্থা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।

তালাক নোটিশ প্রদানের পর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব

তালাকের নোটিশ যে পক্ষ থেকেই দেওয়া হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা মেয়র নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষের মনোনীত প্রতিনিধিকে নিয়ে বসবেন। উভয় পক্ষকে লিখিত নোটিশ পাঠিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করবেন। প্রথম নোটিশে কোনো পক্ষ হাজির না হলে পরবর্তী ২ মাসে আরও দুটি নোটিশ পাঠাবেন। সমঝোতার চেষ্টা সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাজ হলো আপসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে না সফল, তা লিপিবদ্ধ করা।

নিবন্ধন

যে পক্ষই তালাক প্রদান করুক না কেন, তালাক কার্যকরের পর তালাকটি যে কাজির মাধ্যমে নোটিশ সম্পন্ন করা হয়েছে, সে কাজি অফিসে নিবন্ধন করাতে হবে। তালাক নিবন্ধন করা আইনত বাধ্যতামূলক। কোনো কারণে তালাক নিবন্ধন অস্বীকার করলে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল করার বিধান আছে।

স্ত্রীর ভরণপোষণ

  • স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। স্ত্রীও ভরণপোষণ পেতে হকদার।
  • স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে অভ্যাসগতভাবে খারাপ ব্যবহার করেন, গৃহত্যাগের নির্দেশ দেন, তাড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে থাকেন অথবা তাদের মধ্যেকার আচার-আচরণ এ রকম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এটা নিরসন করা সম্ভব নয় বা স্বামীর গৃহে থাকলে আরও অসুবিধা এবং বিরোধের জন্ম দিবে, সে অবস্থায় স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে বসবাস না করেও খোরপোষ দাবি করতে পারেন।
  • স্ত্রী তার আশু দেনমোহর দাবি করলে উক্ত দেনমোহর স্বামী পরিশোধ না করলে, স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে পৃথক বসবাস করতে থাকলেও স্বামী তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।

সন্তানের ভরণপোষণ

রাষ্টীয় আইন অনুসারে পিতাই সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্টীয় আইন অনুসারে পিতাই সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক। তাই সন্তানের ভরণপোষণের সমস্ত দায়-দায়িত্ব হচ্ছে বাবার।

  • সন্তান সাবালক না হওয়া পর্যন্ত পিতা তার সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
  • তালাক বা বিচ্ছেদের পর সন্তান যদি মায়ের কাছে থাকে, তবুও বাবাই ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
  • যদি কোনো সাবালক সন্তান অসুস্থতার জন্য কিংবা পঙ্গুত্বের জন্য রোজগার করতে না পারেন, তবে বাবা তাকে আজীবন ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।
  • পিতা-মাতা গরীব বা দৈহিকভাবে অসমর্থ হলে দাদার অবস্থা সচ্ছল হলে ওই সকল ছেলে-মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব দাদার উপর ন্যস্ত হবে।
  • সন্তানদের অভিভাবক বাবা, মা সন্তানের জিম্মাদার ও হেফাজতকারী হিসাবে ভুমিকা পালন করবেন।
  • মা সন্তানের লালন পালনকারী। মায়ের দায়িত্ব সন্তানদের দেখাশুনা করা। সন্তানেরা মায়ের কাছে থাকবে এবং বাবা সমস্ত খরচ বহন করবেন।
  • মুসলিম আইনে বাবা তার দায়িত্ব পালন না করলে অভিভাবকত্বের দাবি করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পার হবার পরও সন্তানেরা মায়ের কাছে থাকতে পারবে।

আজকের পত্রিকা/রিয়া/সিফাত