এভাবে ২০১১ সালে নদীর সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়। ছবি: আজকের পক্রিকা

ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষা ও বৃত্তাকার নৌপথের জন্য ১০ হাজার সীমানা পিলার স্থাপন করা হচ্ছে। রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বিষয়ক প্রকল্পটি আগামী জুলাই থেকে শুরু হবে। শেষ হবে ২০২২ সালের ৩০ জুন।

পিলার স্থাপন বিষয়ে ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে দুই বছর। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ৫০ কিলোমিটার এলাকায় ওয়াকওয়ে, তিনটি ইকোপার্ক ও ২০টি জেটি নির্মাণ করা হবে।

বিগত ২৯ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে। কামরাঙ্গীরচর, ছাতামসজিদ, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল, কিল্লার মোড়, শ্মশানঘাট এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

এভাবে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উচ্ছেদের পর পিলারগুলো স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ( বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর এম. মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, ‘নদী দূষণ ও দখলদার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। দখলদার যত শক্তিশালী হোক না কেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। চারটি নদীর তীর উচ্ছেদ করে সীমানা পুনরায় নির্ধারণ করা হবে। এর জন্য ১০ হাজার সীমানা পিলার স্থাপন করা হবে।’

এর আগে ২০১১ সালে চার নদীতে সীমানা নির্ধারণের জন্য ৯ হাজার ৫৭৭টি পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ পিলার নিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকায় পুনরায় এই ১০ হাজার পিলার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে নদীর জায়গা দখল করে পুনরায় গড়ে তোলা হয় টিনের ঘর, আধাপাকা, পাকা বহুতল ভবন, বিভিন্ন স’মিল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই উচ্ছেদ অভিযানে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

নদীর পাড় ঘেষে এই ধরনের ওয়াকওয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত

নৌ-মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকার চারদিকের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য ২০০৯ সালে আদালত নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার আলোকে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পিডব্লিউডি’র মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে নদীর পাড়ে সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা মেট্টোপলিটন এলাকায় বিস্তৃত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ বিষয়পুরো প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে যোগান দেয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ের ৩৫ দশমিক ৫১ কিলোমিটারই নির্মিত হবে নদীর নিতু তীরভূমিতে। ১০ দশমিক ২৭ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে নদীর উঁচু তীরভূমিতে। ৫ দশমিক ৯২ কিলোমিটার নদীর তীরভূমিতে কলামের ওপর ওয়াকওয়ে (হাঁটার রাস্তা) নির্মাণ করা হবে।

এছাড়া দশমিক ৩০ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার সেতু নির্মাণ করা হবে। ৪৪ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার তীররক্ষা কাজ করা হবে। ১ কিলোমিটার ওয়াল নির্মাণ করা হবে। ১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বেড়াসহ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে। ৩টি ইকো-পার্ক নির্মাণ করা হবে। ১৯টি জেটি নির্মাণ করা হবে এবং ১ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার স্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বৃত্তকার নৌপথ খননের প্রকল্প নেয়া হয় ২০০০ সালে। দুই দফা খনন কাজ শেষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এই প্রকল্পের কাজ। ৯০ দশমিক ৪৪ কোটি ব্যয়ে ১১০ কিলোমিটার নৌপথ খনন করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই নৌপথটি।

এছাড়া নদীর উপরে নির্মিত সড়ক ও রেলপথে ১০টি সেতুর উচ্চতা কম থাকায় এর নিচ দিয়ে পণ্য ও যাত্রীবাহী কোন নৌযান চলাচল করতে পারে না। বৃত্তকার এই নৌপথের মধ্যে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ-সদরঘাট পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর নৌপথ।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম-পরিচালক একেএম আরিফউদ্দিন বলেন, ‘ঢাকার চারপাশের বৃত্তকার নৌপথ উদ্ধারে নদী দখলদার বিরুদ্ধে এই অভিযান করা হচ্ছে। যত বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অবৈধ স্থাপনা হোক, গুঁড়িয়ে দেয়া হবে’।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকাল থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে আবার। সেদিন বুড়িগঙ্গার বাকি অংশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। বসিলা, নদীর আদি চ্যানেল, কেরাণীগঞ্জের পাশ দিয়ে এবার অভিযান হবে বলে আরিফউদ্দিন জানান।

আজকের পত্রিকা/আরবি/এমএইচএস