বাংলাদেশের অন্যতম অহঙ্কার জামদানি শিল্প। মোগল আমলের আগ থেকেই জামদানি তৈরি করা হলেও এদের পৃষ্ঠপোষকতায় জামদানি শাড়ির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ঢাকাইয়া জামদানি সবার কাছে হয়ে ওঠে সমাদৃত ও জনপ্রিয়।

এ দেশের তাঁতীদের অসামান্য দক্ষতা এবং নিপুণতায় শতশত বছর ধরে তৈরি কারুকার্যময় জামদানি বিশেষ করে ঢাকাইয়া জামদানির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। সব বয়সী নারীর কাছে রয়েছে জামদানি শাড়ির চাহিদা। এ কারণে জামদানি শাড়ির বেচাকেনা সারা বছরই চলে সমানভাবে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার গোড়াপত্তনের আগেই নারায়ণগঞ্জে জামদানি শাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছিল। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালী নারীদের অতিপরিচিত। মসলিনের ওপর নক্সা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। বর্তমানে জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকেই বোঝানো হয়।

সোনালি যুগের এই অতীতকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শীর্ষক পাঁচ সপ্তাহব্যাপী জামদানি উৎসব। চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত।

এ উৎসবটি উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিল এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়নের প্রেসিডেন্ট ড. গাদা হিজাউয়ি-কাদুমি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম।

প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী। তবে প্রতি রবিবার থাকবে সাপ্তাহিক ছুটি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে www.jamdanifestival.com ওয়েবসাইটে।

উৎসবে প্রদর্শনীর জন্য আনা হয়েছে জামদানি কারিগরদের উত্তরাধিকারদের মাধ্যমে নতুন করে তৈরি জামদানি শাড়ি। এক্ষেত্রে ঐহিত্যবাহী জামদানি সংগ্রহ করে, সেভাবেই কাজ করা হয়েছে। প্রদর্শনীর জন্য এভাবে তৈরি ৮০টি শাড়ির জন্য সময় লেগেছে ৬৪০ সপ্তাহ। এসব শাড়ি তৈরিতে ৪৫ জন ওস্তাদ তাঁতী ও ৫৬ জন সাগরেদ তাঁতী কাজ করেছেন। প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে আড়ং, অরন্য, কুমুদীনি হ্যান্ডিক্রাফটস ও টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির।

উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে তাঁত বুনন প্রক্রিয়ায় কার্পাশ তুলার সুতা দিয়ে মসলিন নামে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো। মসলিনের উপর যে জ্যামিতিক নকশাদার বা বুটিদার বস্ত্র বোনা হতো, তারই নাম জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়ি বোঝানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমৃদ্ধ ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, ঘাগরা, রুমাল, পর্দা, টেবিল ক্লথ সবই জামদানির আওতায় পড়ে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি নকশার কুর্তা ও শেরওয়ানির ব্যবহার ছিল। মুগল আমলের শেষের দিকে নেপালে ব্যবহৃত আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্য বিশেষ ধরনের জামদানি কাপড় তৈরি হতো।

জামদানির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন ধরণের মতবাদ রয়েছে। একটি মত অনুসারে ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ফার্সিতে ‘জামা’ অর্থ ‘কাপড়’ এবং ‘দানা’ অর্থ ‘বুটি’, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়।

এ কারণে মনে করা হয় মুসলমানেরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করেন। আরেকটি মতে, ফারসিতে ‘জাম’ অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ এবং ‘দানি’ অর্থ পেয়ালা। জাম পরিবেশনকারী ইরানী সাকীর পরনের মসলিন থেকে জামদানি নামের উৎপত্তি ঘটেছে।

নকশা অনুযায়ী জামদানীর নানা নাম হয়ে থাকে, যেমন- তেরছা, জলপাড়, পান্না হাজার, করোলা, দুবলাজাল, সাবুরগা, বলিহার, শাপলা ফুল, আঙ্গুরলতা, ময়ূরপ্যাচপাড়, বাঘনলি, কলমিলতা, চন্দ্রপাড়, ঝুমকা, বুটিদার, ঝালর, ময়ূরপাখা, পুইলতা, কল্কাপাড়, কচুপাতা, প্রজাপতি, জুঁইবুটি, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবাফুল ইত্যাদি।

ঐতিহাসিক বর্ণনা, শ্লোক প্রভৃতি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় দুকূল বস্ত্র থেকে মসলিন এবং মসলিনে নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হত। মূলতঃ বাংলাদেশের ঢাকা জেলাতেই মসলিন চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ি, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ি প্রভৃতি এলাকা মসলিনের জন্য সুবিখ্যাত ছিল। ইউরোপীয়, ইরানী, আর্মেনিয়ান, মুগল, পাঠান প্রভৃতি বণিকেরা মসলিন ও জামদানি ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানেরাও এই শিল্প বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ বলা হয় মুঘল আমলকে। এ সময় দেশে-বিদেশে মসলিন, জামদানির চাহিদা বাড়তে থাকে এবং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। আঠারো শতকে ইংরেজ দলিল থেকে জানা যায় মলমল খাস ও সরকার-ই-আলি নামের মসলিন সংগ্রহ করার জন্য দারোগা-ই-মলমল পদবীর উচ্চ পর্যায়ের রাজ কর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন।

প্রতিটি তাঁতখানায় একটি দপ্তর ছিল এবং এখানে দক্ষ তাঁতি, নারদিয়া, রিপুকার প্রভৃতি কারীগরদের নিবন্ধন করে রাখা হতো। দারোগার প্রধান কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি তৈরির বিভিন্ন পদক্ষেপে লক্ষ্য রাখা। তৎকালীন সময়ে ঢাকা থেকে প্রায় এক লক্ষ টাকা মূল্যমানের মলমল-খাস মোঘল দরবারে রপ্তানি করা হতো।

১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দিল্লীর বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগৎ শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়। এছাড়া ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ প্রায় নয় লাখ টাকার মসলিন কেনে। তবে আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে মসলিন রপ্তানি অনেকাংশে হ্রাস পায়।

১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে। এদের নিযুক্ত গোমস্তারা নিজেদের স্বার্থে তাঁতিদের উপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁতীরা কম মূল্যে কাপড় বিক্রি করতে রাজী না হলে তাদের মারধোর করা হতো। অবশ্য তাঁতীদের উপর অত্যাচার ঠেকাতে কোম্পানি আইন প্রণয়ন করেছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার ডেমরায় জামদানি পল্লীর তাঁতিদের আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়। তবে মেধা ও পারিশ্রমিকের অভাবের কারণে তাঁতীরা আর এ পেশায় আসতে চাইছেন না। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার অচল তাঁতগুলো প্রাচীন গৌরবগাঁথার নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়িরও একই দশা।

বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে জামদানি পল্লী স্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জামদানির চাহিদা এখনো আগের মতোই রয়েছে। বর্তমান বাজারে জামদানির উচ্চমূল্য ও বিপুল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের এই শিল্পে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে।

জামদানির পুনরুজ্জীবনের পথে প্রধান অন্তরায় হলো দক্ষ ও আগ্রহী তাঁতশিল্পীর অভাব। এই শ্রম নিবিড় হস্তশিল্পে উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত না করা গেলে তাঁতিরা আগ্রহী হবে না। জামদানি শাড়ির আগের সব বিখ্যাত ও অবিস্মরণীয় নকশা ও বুননের অনেকগুলোই বর্তমানে বিলুপ্ত। নবীন কারিগররা অধিকাংশ নকশা সম্পর্কে অবহিত নয়। আদি জামদানির নকশা ও বুনন কৌশল নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানান্তর একটি চ্যালেঞ্জ।

আজকের পত্রিকা/সিফাত