মাহমুদ উল্লাহ্‌
বিজনেস করেসপন্ডেন্ট

ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও কেইপ ভার্দে প্রধানমন্ত্রী হোসে ইউলিসেস দ্য পিনা কোরেইরা এ সিলভা। ছবি: ড. মুহাম্মদ ইউনুস ফাউন্ডেশন

কেইপ ভার্দের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে তৃতীয় ‘সিভি (কেইপ ভার্দে) নেক্সট’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘প্রাইম মিনিস্টারিয়াল লেকচার’ প্রদান করতে আমন্ত্রণ জানান। দেশটির রাজধানী প্রাইয়ায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনটি ছিল দেশটির পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তৃতীয় আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী সম্মেলন। প্রফেসর ইউনূস ২২-২৪ মে ২০১৯ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা উপকূল থেকে ৫৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে অগ্নুৎপাত থেকে সৃষ্ট ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেইপ ভার্দের সর্বমোট আয়তন ৪,০০০ বর্গকিলোমিটারের সামান্য বেশি। পঞ্চদশ শতকে পর্তুগীজ অভিযাত্রীরা দেশটি আবিষ্কার ও সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে কোনো জনবসতি ছিল না। ভারত অভিমুখে একটি নৌ-পথ খুঁজে বের করতে পর্তুগীজদের জন্য কেইপ ভার্দে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। পরবর্তীতে আফ্রিকার পুরো পশ্চিম উপকুলজুড়ে দাস ব্যবসার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় কেপ ভার্দে।

১৯৭৫ সালে কেইপ ভার্দে পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। দেশটির ৫ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বাস করে এর মূল ভূমি সান্টিয়াগোতে। রাজধানী প্রাইয়াও এখানেই অবস্থিত। প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি পর্যটক দেশটি ভ্রমণ করে থাকে যাদের কারো কারো দ্বীপগুলিতে স্থায়ী ঘর-বাড়িও রয়েছে। আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যখানে অবস্থিত হওয়ায় ইউরোপ থেকে ব্রাজিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে চলাচলের ক্ষেত্রে কেইপ ভার্দে ভ্রমণ ও মালামাল পরিবহনের জন্য একটি চমৎকার নৌ পয়েন্ট। আটলান্টিকের মাঝখানে অবস্থিত হলেও দেশটি টর্নেডো, সাইক্লোন বা সুনামি থেকে মুক্ত। টর্নেডোগুলো কেপ ভার্দের চতুর্দিকে সৃষ্টি হলেও সেগুলো ক্যারিবিয়ান বা ফ্লোরিডা উপকূলের দিকে চলে যায় যেখানে পৌঁছানোর আগে এগুলো শক্তিশালী ও বিধ্বংসী রূপ নেয়।

এ বছরের ‘সিভি (কেইপ ভার্দে) নেক্সট’ সম্মেলন নগরীর কেন্দ্রীয় কৃষি মার্কেটের একেবারে মাঝখানে উন্মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় যাতে ফল ও মাছ বিক্রেতা নারীসহ সকলে এতে অংশ নিতে পারেন। বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষজ্ঞরা এই ফোরামে যোগ দেন। ফোরামে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রফেসর ইউনূসের আলোচনা ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। মন্ত্রিপরিষদের অধিকাংশ সদস্য এই দু’জনের মধ্যকার মতো ও অভিজ্ঞতা বিনিময় মনোযোগ দিয়ে শোনেন ও উপভোগ করেন। একজন সঞ্চালক কর্তৃক উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ৯০ মিনিটের এই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রফেসর ইউনূস খোলামেলা মতবিনিময় করেন।

প্রধানমন্ত্রী হোসে ইউলিসেস দ্য পিনা কোরেইরা এ সিলভা (৫৭) একজন ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ যিনি ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর পূর্বে তিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী ছিলেন। আলোচনাকালে প্রফেসর ইউনূস প্রধানমন্ত্রীকে একটি ক্ষুদ্রঋণ তহবিল গঠন করতে পরামর্শ দেন। দেশটির সকল ব্যাংকের অংশগ্রহণে গঠিত এই তহবিলটি থেকে ‘উপযুক্ত’ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করা হবে। উপযুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বলতে তিনি বোঝান সেসব প্রতিষ্ঠানকে যারা দরিদ্রদের জন্য কাজ করবে, উঁচু হারে সুদ ধার্য করে মালিকদেরকে ধনী বানাতে নয়। এই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে হবে সামাজিক ব্যবসা হিসেবে যারা দারিদ্র বিমোচন ও নারীদেরকে উদ্যোক্তায় পরিণত করার লক্ষ্যে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করবে। প্রফেসর ইউনূস আরো বলেন যে, এই ক্ষুদ্রঋণ তহবিল গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রফেসর ইউনূস দরিদ্রদের জন্য ‘সামাজিক ব্যবসা ব্যাংক’ তৈরির লক্ষ্যে ব্যাংকিং লাইসেন্স দেবারও পরামর্শ দেন। তিনি কেপ ভার্দের বর্তমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যারা দারিদ্র বিমোচনের পরিবর্তে উঁচু হারে সুদ ধার্য করে টাকা কামানোর ব্যবসায়ে নিয়োজিত। তিনি বলেন যে, সরকারের উচিত হবে ব্যাংকিং লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেয়া।

তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে সকল ব্যাংকিং লাইসেন্সকে হতে হবে শর্তাধীন, যাতে এই নীতির অধীনে গঠিত সকল ব্যাংক তাদের নিজ নিজ সামাজিক ব্যবসা সাবসিডিয়ারী গঠনে বাধ্য হয় যার লক্ষ্য হবে শুধুমাত্র ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ক্ষুদ্রঋণ সরবরাহ করা। প্রফেসর ইউনূস আরো পরামর্শ দেন যে, সরকার কোনো কোম্পানিকে নির্মাণ বা সরবরাহ চুক্তি দেবার সময়ে সেই সব কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেবে যারা সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সামাজিক ব্যবসা সাবসিডিয়ারি গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রফেসর ইউনূস তরুণদের বেকারত্বের সমস্যা নিয়ে ও দেশটির প্রতিভাবান তরুণদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে চলে যাবার সমস্যা নিয়েও আলোচনা করেন।

প্রফেসর ইউনূস বলেন যে, ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করবে যখন আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স পৃথিবীর অধিকাংশ কাজ দখল করে নেবে। তরুণদের সমস্যার প্রকৃত সমাধান চাকরি নয়, তরুণদেরকে উদ্যোক্তায় পরিণত করতে হবে। এর পূর্বে প্রফেসর ইউনূস দেশটির প্রেসিডেন্ট জর্জ কার্লোস দ্য আলমেইদা ফনসেকার সাথে সাক্ষাৎ করেন। প্রেসিডেন্ট ফনসেকা একজন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক যিনি ২০১১ সাল থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট। তারা প্রফেসর ইউনূসের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং কেইপ ভার্দের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তার সফরের সময়ে প্রফেসর ইউনূস দেশটির ৬টি ক্ষুদ্রঋণ সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ড পরিদর্শন করেন ও তাদের ঋণীদের সাথে কথা বলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ড. জেসিনতো সান্তোস যিনি দুই বার প্রাইয়ার মেয়র ছিলেন। ড. সান্তোস একজন জনপ্রিয় ও নিবেদিতপ্রাণ ক্ষুদ্রঋণ সংগঠক।

কেইপ ভার্দের ক্ষুদ্রঋণ সংগঠনগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের এই প্রেসিডেন্ট বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিগুলোর অগ্রগতি সম্বন্ধে ভালোভাবে ওয়াকেফহাল। তিনি ক্ষুদ্রঋণের উপর একটি বই লিখেছেন এবং আরো একটি বই লিখছেন সামাজিক ব্যবসার উপর। কেইপ ভার্দের সাধারণ মানুষ ও নীতি-নির্ধারকগণ ক্ষুদ্রঋণের সাথে মোটামুটি পরিচিত।

কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী জানান যে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পর্তুগালে ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন। কেইপ ভার্দে অবস্থানকালে প্রফেসর ইউনূস সিভিল সোসাইটি নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। তিনি ব্যাংকারদের নিয়ে আয়োজিত একটি পৃথক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। প্রফেসর ইউনূসের এসব বৈঠক, বক্তৃতা ও সফরের ফলে সামাজিক ব্যবসা সম্বন্ধে দেশটিতে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

সিদ্ধান্ত হয় যে, কেইপ ভার্দে সরকার একটি ‘জাতীয় ক্ষুদ্রঋণ তহবিল’ গঠনে উদ্যোগ নেবে। তহবিলটির কাঠামো ও পরিচালনাগত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার পূর্বে প্রফেসর ইউনূসের পরামর্শ নেয়া হবে। আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, সামাজিক ব্যবসা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নিতে কেইপ ভার্দে থেকে একটি প্রতিনিধিদল এ বছরের জুন মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় “সামাজিক ব্যবসা দিবস”-এ যোগদান করবে এবং কেইপ ভার্দের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার” প্রতিষ্ঠা করা হবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ‘সোশ্যাল বিজনেস ফোরাম’ স্পন্সর করতে সম্মত হন। বিগত বছরগুলোর মতো বেশ কয়েকটি দেশ এ বছরও এই ফোরাম স্পন্সর করছে।

আজকের পত্রিকা/এমইউ