ডেঙ্গু রোগে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গু জ্বর একটি এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় রোগ। সাধারণত মে মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর মাস, বিশেষ করে গরম ও বর্ষার সময় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

১৭৮০ সালে প্রথম ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এই রোগের সংক্রমণ মশার মাধ্যমে হয়, তা জানা যায় ১৯০৫ সালে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যে এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত অবশ্য ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়নি। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত যে, চারটি পৃথক ধরনের ভাইরাস (টাইপ : ১-৪) ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী।

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে খুব ভয়াবহ একটি তথ্য আছে। আমরা কমবেশি সবাই জানি এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয়। শীতে সাধারণত লার্ভা অবস্থায় এই মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতে সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত মশা বিস্তার লাভ করে। ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাসবাহিত ‘এডিস ইজিপ্টাই’ নামক মশার কামড়ে হয়ে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়।

রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ। ছবি : সংগৃহীত

১) রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য জ্বর শুরু হওয়ার আগের ধাপে দু-একদিন শরীরে ম্যাজম্যাজ ভাব ও মাথাব্যথা।

২) ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর এবং সেই সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। শরীরে বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়।

৩) জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের সময় সারা শরীরে লালচে দানা বা দাগ দেখা যায়। যাকে বলা হয় স্কিন র‍্যাশ, যা অনেকটা অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো।

৪) এসময় শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়। যেমন: চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত থেকে, কফের সঙ্গে, রক্ত বমি, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের মধ্যে ও চোখের বাইরে রক্ত পড়তে পারে।

৫) মেয়েদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেক দিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে পারে।

এছাড়া তীব্রতার দিক থেকে ডেঙ্গুকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করছে

প্রথম পর্যায় : ব্যথাসহ জ্বর।

দ্বিতীয় পর্যায় : প্রথম পর্যায়ের লক্ষণসহ চামড়ার নিচে, মাড়ি ও পাকস্থলী থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ।

তৃতীয় পর্যায় : দ্বিতীয় পর্যায়সহ রক্তপ্রবাহে সমস্যা বা সারকুলেটরি ফেইলিওর।

চতুর্থ পর্যায় : তৃতীয় পর্যায়সহ রোগী শকে থাকে, যখন তার রক্তচাপ ও পালস পরিমাপ করা যায় না। এটি প্রধানত শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তবে অনেক সময় বড়দের মধ্যে এটি মহামারীর সময় দেখা যায়।

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা

রোগীকে চিকিৎসার সময় মশারি ব্যবহার করুন। ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গু রোগের তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্যারাসিটামল সেবনে রোগের প্রচণ্ড ব্যথার উপশম ঘটে। অ্যাসপিরিন পরিহার করা উচিত। প্রয়োজনে শরীরের তরলের ঘাটতি স্যালাইন দ্বারা পূরণ ও রক্ত সঞ্চালন করা হয়। এছাড়া কিছু উপসর্গ পেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই ভালো। যেমন: শরীরের যেকোনো অংশে রক্তপাত হলে, প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

এছাড়া বাড়িতে রোগীর পরিচর্যার সময় কিছু বিষয়ে যত্ন নিতে হবে। যেমন :

১) সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।

২) যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল-জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

৩) খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।

৪) জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল-জাতীয় ব্যথার ওষুধই যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক-জাতীয় ব্যথার ওষুধ কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

৫) জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।

প্রতিরোধ

ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বচ্ছতা অভিযান জরুরী। ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায়, বড় বড়, সুন্দর সুন্দর দালান কোঠায় এরা বসবাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এরা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/