নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক মহিউদ্দীন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

ক’দিন আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক নাট্যজন এস. এম. হারুন-অর-রশীদ নাট্যকার সংঘের সদস্যদের একটি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা বেশ কয়েকজন নাট্যকার সানন্দে বিটিভি কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন আমাদের চোখে-মুখে ছিল উৎসবের আমেজ। কারো কারো গায়ে ছিল নতুন জামা-জুতো, ছিল ঠোঁটের কোণে প্রত্যাশার হাসি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আমন্ত্রণ তো যেনতেন কথা নয়! আমরা সেটা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। ফলে দারুণ উপভোগ্য ছিল দিনটি।

একঝাঁক তরুণ নাট্যকারের কাণ্ডারি হিসেবে ছিলেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ, মাসুম রেজা, মান্নান হীরাসহ দেশের প্রথিতযশা নাট্যকারগণ।জানা মতে, বিটিভির মহাপরিচালক কর্তৃক আয়োজিত এ ধরনের অনুষ্ঠান- এটাই প্রথম। অর্থাৎ টেলিভিশন নাটক নিয়ে নাট্যকারদের সাথে এর আগে কোনো ডিজি এভাবে, এতটা অন্তরঙ্গ হয়ে কথা বলেননি। সেদিক থেকে এটি আমাদের জন্য অনেক গৌরব ও সম্মানের। এক কথায়- অনেক বড় প্রাপ্তি।

সেদিন ডিজি মহোদয় আমাদেরকে ভীষণ আপন করে নিয়েছেন। আমাদের প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখে বারবার মনে হয়েছে তিনি শুধু ডিজি নন, তিনি আমাদের সহকর্মী, বড় ভাই। তাঁর কাছে বিটিভির নাটককেন্দ্রিক যে পরিকল্পনার কথা শুনেছি, তাতে আমরা দারুণ আশাবাদী হয়ে উঠেছি। হয়ে উঠেছি ভীষণ অনুপ্রাণিত। তিনি খানিকটা অভিযোগের সুরে বলেছেন, আমরা কেন নিয়মিত বিটিভি’র জন্য নাটক লিখছি না? কেন বিটিভি ভবনে যাচ্ছি না? বিটিভি তো আমাদেরই প্রতিষ্ঠান। আরও বলেছেন, আমরা যেন এখন থেকে বিটিভির জন্য ভালো ভালো নাটক লিখি। তিনি নাটককে দর্শকমুখী করতে চান। ফিরিয়ে আনতে চান সোনালী দিনের মতো দর্শকের অংশগ্রহণ। পেতে চান তাঁদের সাড়া। পাশাপাশি ভিনদেশি গল্পের টান থেকে সরিয়ে আনতে চান দর্শকদের।নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগ প্রসংশার দাবি রাখে। আমরাও চাই, বাংলাদেশের টিভি নাটকের হালচাল বদলে যাক।

কর্মশালায় নাট্যকারদের পাশাপাশি আরো উপস্থিত ছিলেন বিটিভির নাট্য প্রযোজকসহ নাটক বিভাগের সকল কর্মকর্তা ও কলাকৌশলিবৃন্দ। এ যেন ফ্রি-ল্যান্সার নাট্যকারদের সঙ্গে বিটিভির নাটক বিভাগের বর্ণিল এক সম্পর্কের সূচনা। বিশেষ করে বিটিভির মহাপরিচালক আমাদেরকে যে সম্মান আর আতিথেয়তা দিয়েছেন তা ছিল নজিরবিহীন। যা আগে কখনো হয়নি, কেউ কল্পনাও করেনি। কেমন দেখতে চাই টেলিভিশন নাটক- এ বিষয়টিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বক্তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন বিশদভাবে। উঠে এসেছে বিটিভির সেইসব নাটকের কথা যেসব নাটকের জন্য বাংলাদেশের মানুষ একসময় সন্ধ্যা হতেই অপেক্ষা করতেন টিভি সেটের সামনে। ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘সংসপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’সহ বহু নাটকের নাম এসেছে উদাহরণ হিসেবে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের নাটক না দেখে দেখছেন ভারতীয় চ্যানেলের নাটক। তাঁরা অনেকটাই বাংলাদেশের টিভিবিমুখ হয়ে পড়েছেন।

কেন এমন হলো? প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। উত্তরও দিয়েছেন তাঁদের কেউ কেউ। অনেকে নিজেদের দায়ও স্বীকার করেছেন ।যুগ বদলেছে। সময়ের সাথে সাথে সবকিছুর মতো নাটকের ধরনও পাল্টে গেছে। আগে একটিমাত্র চ্যানেল ছিল। এখন ত্রিশের বেশি। আগে ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখা যেত না। এখন হাতের মুঠোয় ইন্ডিয়ান চ্যানেলসহ পৃথিবীর অনেক চ্যানেল। দর্শক রিমোট টিপে এক সেকেন্ডের মধ্যে চলে যেতে পারেন এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে। ফলে এমন গল্পের নাটক দেখাতে হবে যাতে দর্শক সহজে অন্য চ্যানেলে চলে যেতে না পারেন। ভিজুয়ালাইজেশন, সাউন্ড, লাইট, মিউজিক সবখানেই থাকতে হবে অন্তত আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি। না-হলে টিকে থাকা যাবে না। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের দর্শক যথেষ্ট দেশপ্রেমী। তাঁরা নিজের দেশের আলো-হাওয়ায় তৈরি দেশীয় তারকাদের দ্বারা অভিনীত সাহিত্যনির্ভর মূলধারার নাটক দেখতে সবসময়ই ভীষণ আগ্রহী।

এখন প্রশ্ন হলো, কেমন গল্প হওয়া চাই টিভি নাটকের প্রেক্ষাপট? পরকীয়া? অসম বয়সের প্রেম? ভালগার? এডিকশন?- না। প্রত্যেকটা দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। কৃষ্টিকালচার থাকে। সেটা নিয়েই কাজ করতে হয়। ফলে জাতি হিসেবে আমরা যেমন, ঠিক সে ধরনের গল্পের মাধ্যমেই দর্শককে ধরে রাখা সম্ভব। কেননা দর্শক কখনো শিল্প-সংস্কৃতির রুচি তৈরি করেন না। তাঁরা রুচি নির্বাচন করেন মাত্র। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিত যুগোপযোগী ভালো গল্প নিয়ে কাজ করা। টিভি নাটকে অতিমাত্রায় বিজ্ঞাপন প্রচার করা বিষফোঁড়ার মতো একটি ব্যাধি। এই বিজ্ঞাপনের কারণেই অধিকাংশ দর্শক রিমোট টিপে অন্য চ্যানেলে চলে যান। এছাড়াও রয়েছে দায়সারা গোছের কিছু কাজ যেমন- শুধুমাত্র কপোত-কপোতিদের গল্প, অজানা কারণে দেশের বাইরে শুটিং করা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে মার্কেটিঙের মানুষের আধিপত্য- এসবই টিভি নাটকে ধ্বস নামার কারণ বলে মনে করেন অনেকে। যা অপ্রত্যাশিত এবং অনভিপ্রেত।

অন্যদিকে, কর্পোরেট বাণিজ্যের প্যাচে পড়ে নাটক হয়ে পড়েছে নাস্তানাবুঁদ। আজকাল অনেকেই টিভি নাটককে কনটেন্ট বলতে শুরু করেছেন। এই শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে সৃজনশীলতা পরিপন্থী। সাংস্কৃতিক প্রজন্মকে সাহিত্যবিমুখ করে দিতে পারে এই একটিমাত্র শব্দ। কোনো পণ্য বিষয়ক কনটেন্ট বা ওয়েব কনটেন্ট আর টিভি নাটক যেহেতু ভিন্ন বিষয় সেহেতু এগুলোকে একই নামে অভিহিত করার অর্থ হলো টিভি নাটককে সাহিত্যের গণ্ডি থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু টিভি নাটক অবশ্যই গল্প-কবিতার মতোই সাহিত্যর একটি শাখা। মনে রাখা জরুরি, একটি গল্প কাউকে খুশি করার জন্য সৃষ্টি হয় না। বিষয়টি একেবারেই প্রাকৃতিক। যেমন ফুল আপনা-আপনি ফুটে ওঠে। সুবাস ছড়ায়।

টিভি নাটক যতই বিজ্ঞাপন নির্ভর শিল্পমাধ্যম হোক না কেন, এতে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের সমস্ত গুণাগুণ রয়েছে। সেটা মনে রেখেই আমাদের কাজ করা দরকার। এটা সত্যি যে, বাংলাদেশের সিনেমার চেয়ে টেলিভিশন ইন্ড্রাস্টি বড়। বর্তমানে শত শত মানুষ টেলিভিশনের সাথে জড়িত। ফলে টিভি নাটক এখন শুধু আর শখের কাজটি নয়। একদিকে হাস্যরসের নামে শুরু হয়েছে সাহিত্যবিবর্জিত ও বাস্তবতাহীন ভাঁড়ামিপূর্ণ নাটক অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের অত্যাচার- এসব কারণে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে সৃষ্টিশীল অনেক মানুষের কাজের পথ  হয়ে যাবে। যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য একেবারেই কাম্য নয়। সর্বোপরি এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিটিভি মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রিয় হারুন ভাইয়ের কথায় আমরা সেরকমই আশান্বিত হয়েছি। হয়তো অতি দ্রুত টিভি নাটক ঘুরে দাঁড়াবে আপন মহিমায়। ফিরে আসবে সুদিন। এক্ষেত্রে বিটিভি আমাদের নতুন আশার আলো।

লেখক: মহিউদ্দীন আহমেদ
নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক

আজকের পত্রিকা/সিফাত