গোটা বিশ্ব এখন করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত। এখন সাধারণ জ্বর কাশি হলেই অনেকে ধরে নিচ্ছেন যেন তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু বিষয়টা এমন না। সাধারণ ফ্লু ও করোনার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য। কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে এবং এর চিকিৎসাই বা কী এসব বিষয়ে জানাচ্ছেন  ডা. একেএম ফজলুল হক সিদ্দিকী। তিনি বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের বিভাগীয় মেম্বার ও কলামিস্ট।

দেশের ঋতু পরিবর্তনের কারণে বর্তমান সময়ে প্রায় সবারই কমবেশি জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা হচ্ছে। তবে করোনার প্রাইমারি লক্ষণ যেহেতু মৃদু জ্বর, শুকনো কাশি, গলাব্যথা তাই সামান্য অসুস্থ হলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু সব জ্বর-সর্দি, কাশিই করোনা নয়। সর্দি, জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা সিজনাল ভাইরাল ফ্লুয়েরও লক্ষণ। এই সময় গরমে-ঘামে বা মৌসুমি বৃষ্টিতে ভিজলে যা হয়ে থাকে।
তবে ঠাণ্ডা লেগে সর্দি, কাশি হলে তাতে কফ উঠে আসে, যাকে আমরা ওয়েট কাফ বলি। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে তা কিন্তু শুকনো কাশি, গলা ব্যথা, গলা শুকিয়ে যাওয়া এবং কষ্টকর কাশি। সেকেন্ডারি পর্যায়ে উচ্চ জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তবে করোনা শুধুমাত্র কাশির তফাতেই বোঝা যাবে এমন তথ্য এখনও বিশদ ভাবে প্রমাণিত হয়নি। ড্রাই কাফ আরও বহু কারণে হতে পারে যেমন, যাদের ফুসফুসে ক্রনিক সমস্যা রয়েছে (COPD), কার্ডিয়াক এজমা, পালমোনারি ইনসাফিশিয়েনসি, ক্রুপ কাফ এবং যারা চেইন স্মোকার বা অতিরিক্ত ধূমপান করেন তারাও সারা বছরই শুকনো কাশিতে ভোগেন।

করোনায় আক্রান্ত হলে পর্যায়ক্রমে জ্বর-শুস্ক সর্দি, শুস্ক কাশির সঙ্গে থাকবে গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দারুণ দুর্বলতা এবং কিছুক্ষেত্রে পাতলা পায়খানা। যেহেতু এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে তাই অনেকেই নিউমোনিয়ার সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলছেন। কিন্তু করোনা সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা জিনিষ। অত্যধিক দুর্বলতা, উচ্চ জ্বর, শুস্ক কাশিসহ শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট লাগলেই অবিলম্বে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

সিজনাল সমস্যা মনেকরে অবহেলা বা লুকিয়ে রাখবেন না। সমস্যা হলে আর তা ফেলে রাখলেই যেকোনো জটিলতা বাড়ে। করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ শুধুমাত্র কফ (সোয়াব) পরীক্ষা দিয়েই হয়। যত্রতত্র থুতু, কফ ফেলবেন না। হাঁচি, কাশি এবং সর্দিতে রুমাল বা ট্যিসু ব্যবহার করুন। ব্যবহারের পর তা নির্দিষ্টস্থানে ফেলুন। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হলেই মৃত্যু আসন্ন এমনটা একেবারেই ঠিক নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠা সম্ভব। প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসাবে ঘনঘন কুসুম তরল পান, উষ্ণ ভাপ নাকে নেয়া, গরম জলে লবন মিশিয়ে গড়গড়া করা, ঠাণ্ডা ও ফ্রিজের খাবার পরিহার, এসির বাতাস পরিহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মানলে অনেকক্ষেত্রে করোনার সংক্রমণ হ্রাস করা সম্ভব এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক ব্যায়াম, সপ্তাহে পাঁচদিন বিশ মিনিট সময় উন্মুক্ত ত্বকে প্রখর রৌদ্র লাগানোসহ পর্যাপ্ত ঘুম যাওয়া অপরিহার্য।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা হিসাবে হোমিওপ্যাথি একটি নির্ভরশীল ও যুগান্তকারী চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. স্যামুয়েল হ্যানিমান প্রায় দুইশো বছর পূর্বে এজাতীয় নতুন নতুন ভাইরাস, ব্যক্টিরিয়া, প্যারাসাইট ঘটিত বিভিন্ন প্রাণঘাতী মহামারির চিকিৎসায় সফলতার প্রমাণ এবং কিভাবে এগুলির লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হবে সে সম্পর্কে তার অমূল্য গ্রন্থ অর্গাননে ধারণা দিয়ে গেছেন।

বর্তমানে বৈশ্বিক প্রাণঘাতী মহামারি করোনায় সংক্রমিত হলে আমরা দুটি ধাপে ভাগ করে লক্ষণ ভিত্তিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দিতে পারি। প্রাথমিক পর্যায়ে মৃদু জ্বর, শুস্ক সর্দি, নাক জ্যাম, শুস্ক কাশি সহ গলাব্যথায় লক্ষণ অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক ওষুধ Bryonia alb, Justicea adatoda, Drosera, Hepar sulp, Marc sol, Marc Iod, Arsenic Iod, Kali Bich প্রভৃতি হতে সর্বোত্তম সদৃশ ওষুধ দিয়ে দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা দিতে পারি। চূড়ান্ত পর্যায়ে লান্ক তথা ফুসফুস আক্রান্ত হলে রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বর, শুস্ক কষ্টকর কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ভারীবোধ, অস্থিরতা, মৃত্যুভয়, তীব্র দুর্বলতা, নাড়ি ক্ষীণ, অক্সিজেনের অভাববোধ, হাত পা অবশবোধ, রক্তচাপে ছন্দবৈকল্য প্রভৃতি দেখা দিলে রোগীকে হসপিটালাইজেশন করার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ Antim tart, Camphora, Carbo veg, Arsenic alb, Aconit nap, Spongia tosta, Sambucus, Phosphorus, Cuprum Ars, Natrum Sulp প্রভৃতি থেকে সর্বোত্তম সদৃশ ওষুধ প্রয়োগ করে আশু মৃত্যু পথযাত্রী রোগীকে বাঁচানো সম্ভব ইনশাআল্লাহ।

  • 109
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    109
    Shares