গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। ছবি : সংগৃহীত

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য গোল্লাছুট, বদন, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, হাডুডু, ঘোড়াদৌড়ের মতো লাঠিখেলাও খুব জনপ্রিয়। সেই ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কালেভদ্রে দু-এক জায়গায় এখন লাঠিখেলার দেখা মেলে। সেই লাঠিখেলা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি মাসুদ পারভেজ রুবেল।

মুসলিম বা হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো বিশেষ তিথি-পার্বণে মেলা বসবে-সেখানে নাগরদোলা ঘুরবে, আর লাঠিখেলা হবে না, তা তো হয় না। হ্যাঁ, এক সময়ের কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দক্ষিণ ইছাকুড়িসহ পাশের উপজেলাগুলোতে বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে এই লাঠিখেলা। কথা হচ্ছিল কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার দক্ষিণ ইছাকুড়ি গ্রামের কয়েকজন লাঠিয়ালের সাথে। তারা জানান, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলাটি এখনো বেশ জনপ্রিয় হলেও হারিয়ে যাওয়ার পথে। মানুষ ভুলতে বসেছে এ খেলা।

বাংলার ঐতিহ্যের অংশ লাঠিখেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ আছে। কিন্তু নতুন করে কোনো সংগঠন বা দল তৈরি হচ্ছে না লাঠিখেলার। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা। ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচানাচি। অন্য দিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যে খেলা হয় তার নাম লাঠিখেলা।

লাঠিখেলা খেলতে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। জেলার রৌমারী উপজেলার দক্ষিণ ইছাকুড়ি গ্রামের মো: আবু তাহের, ছামছুল আলম, ফজলে করিম, মোজাফফর হোসেন, সবুজ মিয়া, জেলাল হোসেন, শাহাজামালসহ কয়েকজন লাঠিয়াল জানান, পুরনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অর্থাভাবে এ খেলার প্রসার ঘটাতে পারছেন না।

এক সময়ে রৌমারী উপজেলার লাঠিয়াল চারজন। ছবি : মাসুদ পারভেজ রুবেল।

তারা জানান, এ খেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট। মূলত ঢাকের বাজনা, মার্শাল আর্ট আর লাঠি এই দুইয়ের সংমিশ্রণ। লাঠি খেলা অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, তবে প্রায় তৈলাক্ত হয়। প্রত্যেক খেলোয়াড় তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করেন। শুধুমাত্র বলিষ্ঠ যুবকেরাই এই খেলায় অংশ নিতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে যুবক, বৃদ্ধ পুরুষেরাই লাঠি খেলায় অংশ নিয়ে থাকেন।

লাঠিখেলার আসরে লাঠির পাশাপাশি যন্ত্র হিসেবে ঢোলক, কর্নেট, ঝুমঝুমি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় এবং সঙ্গীতের পাশাপাশি চুড়ি নৃত্য দেখানো হয়। এ খেলা বিষয়ে প্রবীণ লোক জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ লাঠি খেলা আজ বিলুপ্ত প্রায়। আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের লাঠিখেলা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম সড়কি খেলা, ফড়ে খেলা, ডাকাত খেলা, বানুটি খেলা, গ্রুপ যুদ্ধ, নরি বারী খেলা এবং দা খেলা (ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপহাস যুদ্ধ) খেলা ইত্যাদি।

গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব-বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, চড়ক পূজা, মহরম, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। বিগত দশকেও গ্রামাঞ্চলের লাঠি খেলা বেশ আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিল এ খেলাটি।

এক সময়ে রৌমারী উপজেলার লাঠিয়াল তিনজন। ছবি : মাসুদ পারভেজ রুবেল।

দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন এ খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এ লাঠিখেলা দেখা গেলেও তা খুবই সীমিত।

লাঠিখেলাপ্রেমী দর্শকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, লাঠিখেলা গ্রামাঞ্চলের মানুষের নির্মল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। লাঠিখেলায় শুধু লাঠি দিয়ে খেলাই হয় না, সঙ্গে প্রদর্শন করা হয় নানা রকম শারীরিক কসরত। যেসব বাঙালি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, গ্রামীণ খেলাধুলা কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি লাঠিখেলা।

এ খেলাটি দিনদিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়ার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোনো নতুন খেলোয়াড়। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে লাঠিখেলাকে টিকিয়ে রাখার দাবি সবার।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব/