বিদেশ গমনের জন্য ইমিগ্রেশন ভিসা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী পদ্ধতি। আর এ কারণেই এই পদ্ধতিটি বেশ জটিল ও সময় সাপেক্ষ বটে। যেসব দেশে ইমিগ্রেশন ভিসার জন্য সরাসরি আবেদন করা যায় তাদের মধ্যে কানাডা, আস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইতালি ও আমেরিকা অন্যতম।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে এসব দেশে ভিসার জন্য সরাসরি আবেদন করা যেতে পারে। এসব আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন বিভাগ স্থানীয় হাইকমিশন বা দূতাবাসে যাচাই বাছাই শেষে নির্বাচিত হলে দূতাবাসে তাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সন্তোষজনক সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষিতে প্রার্থীকে বিস্তারিত ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করতে বলা হয়।

সবশেষে প্রার্থীর মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়।  এতে ফলাফল অনুকূল হলেই কেবল তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে স্থায়ী বসবাসের (Permanent residency) সুযোগ করে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রার্থী শুধু নিজেই নয় বরং পুরো পরিবারকে নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিতে পারেন। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ১-২ বছর সময় লেগে যেতে পারে।

ইমিগ্রেশন ভিসার জন্য যে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয় সেগুলো নিম্নরূপ :

প্রাথমিক আবেদনঃ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলে নির্ধারিত ফি প্রদানপূর্বক বিস্তারিত আবেদন। সাক্ষাৎকার (সাধারণত ১০-১২ মাস পরে) সাক্ষাৎকার সন্তোষজনক হলে মেডিকেল রিপোর্ট, পাসপোর্টসহ ইমিগ্রেশন ফি জমা দিতে হয়। কাগজপত্রে কোনো ভুল ধরা না পড়লে দূতাবাস গ্রিন সিগনাল দেবে প্রার্থীকে। প্রার্থী তখন এয়ার টিকেট বুকিং দিয়ে বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন।

বিদেশে পৌঁছানোর ৩-৬ মাস পর প্রার্থী পোষ্যদের জন্য স্পন্সর করতে পারেন। অস্ট্রেলিয়া/ কানাডা/ নিউজিল্যান্ড এই দেশগুলোতে ইমিগ্রেশনের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করতে আগ্রহী ব্যক্তিকে তার বয়স, শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদির উপরে ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জন করতে হয় যা এসব দেশ কর্তৃক নির্ধারিত করা আছে।

যদি একজন ব্যক্তি ন্যূনতম পয়েন্ট অর্জন করে ইমিগ্রেশন আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতা লাভ করেন, তবে তিনি সরাসরি নির্ধারিত ঠিকানায় প্রাথমিক আবেদনপত্র প্রেরণ করবেন এবং উত্তরের জন্য অপেক্ষা করবেন। প্রার্থী যদি হ্যাঁ বোধক উত্তর পান তবে তিনি ভিসার মূল আবেদনপত্র সঠিকভাবে পূরণ করে নিকটস্থ হাইকমিশনে জমা দেবেন।

দরখাস্তের সাথে অবশ্যই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি ও ফটো ইত্যাদি সংযুক্ত করতে হবে। অতঃপর আবেদনপত্রের সিরিয়াল অনুসারে সাক্ষাৎকারের জন্য ১ থেকে ২ বছর পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হতে পারে। প্রার্থীর সিরিয়াল চলে আসলে সংশ্লিষ্ট হাইকমিশন থেকে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রার্থীর কাছে আবেদনপত্র বা Invitation Letter প্রেরণ করা হয়। সাক্ষাৎকার পর্ব দূতাবাসের ইমিগ্রেশন অফিসারের সাথে সাক্ষাৎকার পর্ব ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে একজন ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে অনেক ক্ষমতা দেয়া থাকে। ইনি যেসব বিষয়ের উপর ভিত্তি করে প্রার্থীর যোগ্যতা নিরূপণ করেন সে বিষয়গুলোতে প্রার্থীকে অবশ্যই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।

ইমিগ্রেশণ অফিসারের সাথে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে কিছু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচে দেয়া হলো:

১। শালীনতাপূর্ণ মার্জিত পোশাক পরতে হবে। চুল, দাঁড়ির ছাঁট রুচিসম্মতভাবে হতে হবে। চোখের চাহনি এবং অভিব্যক্তিতে আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।

২। স্বাভাবিক স্বতঃস্ফুর্ত ভদ্রোচিত আচরণ করতে হবে। যেমন: হাসিমুখে গুড মর্নিং বা গুড আফটারনুন বলে কথা শুরু করতে হবে। ইংরেজি ভাষায় শুদ্ধভাবে ও সংক্ষিপ্ত আকারে কথোপকথন চালাতে হবে। প্রশ্নদাতার কোনো প্রশ্ন না বুঝতে পারলে সবিনয়ে বলতে হবে। pardon me বা excuse me, Would you please repeat the question? এর মানে হচ্ছে আমি আপনার প্রশ্নটি বুঝিনি, আপনি কি দয়া করে পুনরায় বলবেন। প্রশ্নের উত্তর স্পস্ট ও যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়াই বাঞ্চনীয়। মনে রাখতে হবে প্রশ্নটি না বুঝে কখনোই ভুল উত্তর দেয়া যাবে না। প্রশ্নকর্তার accent বুঝতে সমস্যা হলে বলতে হবে Would you please say that again? এটাই বিদেশি রেওয়াজ এবং প্রশ্নের সাথে Would you please বলে অনুরোধ করা এবং অনুরোধ মানলে Thank you বলে কৃতজ্ঞতা জানানো বাঞ্চনীয়।

৩। প্রশ্নকর্তা বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে প্রার্থীর মানসিক দৃঢ়তা সম্পর্ক নিশ্চিত হতে চাইবেন। তাই তিনি যে ধরনের প্রশ্নই করুন না কেন কোনো অবস্থাতেই উত্তেজিত হওয়া চলবে না, বরং ঠাণ্ডা মাথায় হাসিমুখে তার প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিতে হবে। আর সর্বদাই আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আর কখনোই এমন মনোভাব প্রদর্শন করা যাবে না যে আপনি তাদের অনুকম্প প্রার্থনা করছেন বরং আপনার কথাবার্তায় যেন তাদের মনে হয় যে এই ব্যক্তিটি তাদের দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। শুধু সেক্ষেত্রেই আপনি সফলভাবে সাক্ষাৎকার পর্বে উত্তীর্ণ হতে পারেন।

৪। চাহিবা মাত্র যেন কর্তৃপক্ষকে যে কোনো ধরনের কাগজপত্র প্রদর্শন করতে পারেন এজন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, ফিস ইত্যাদি গুছিয়ে রাখতে হবে।

ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ভ্রমণ (Private and Business trip) ব্যক্তিগত ভ্রমণ ভিসা (Tourist’s Visa) প্রাপ্তি সংক্রান্ত তথ্যগুলো নিম্নরূপ: (যাদের ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি)

উচ্চ পদস্থ সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পার্লামেন্ট সদস্য, সচিব, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তি ও সংগঠক প্রমুখ।

প্রবাসী আত্মীয় স্বজন দ্বারা আমন্ত্রিত এবং স্পন্সরকৃত আপনজন (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে ইত্যাদি)।

শিক্ষা সফরে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষণার্থী।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও (NGO) বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও বিদেশ ভ্রমণের ভিসা পাওয়া সহজ। তবে ঐসব বিষয়ে ভিসা প্রার্থীদের বিশেষ কিছু কৌশলগত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

প্রশ্নগুলো এ রকম হবে:

সে দেশে কেন যাবেন এবং খরচ কে বহন করবে?

সে দেশে গিয়ে ফিরে আসবেন তার নিশ্চয়তা কি?

আগে কখনও সে দেশে বা অন্য কোনো দেশে এ ধরনের কাজে গিয়েছেন কি না?

প্রার্থী প্রকৃতপক্ষে  কি পদমর্যাদায় আছেন, তার আয় কত-এ সবকিছুর প্রমাণ দাখিল করতে হবে। প্রার্থীর গাড়ি, বাড়ি, টেলিফোন, মোবাইল, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি আর্থিক স্বচ্ছলতার স্বচ্ছ বিবরণ দিতে হবে অর্থাৎ ভিসা অফিসারের মনে আস্থা আনতে হবে যে আমার দেশে আমি যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত ও স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। কাজেই আপনার দেশে গিয়ে ফিরে না আসার কোনো কারণ আমার নেই।

কাজেই ভিসা প্রার্থীরা আগেই যদি উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে সম্যক অবহিত থাকেন এবং যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাহলে সাক্ষাৎকার পর্বে অংশ নেয়া তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায় এবং ভিসা প্রাপ্তির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

আজকের পত্রিকা/মির/জেবি